সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রের ইসলামবিদ্বেষীতার মুখোশ উন্মোচন – ২






সাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রের ইসলামবিদ্বেষীতার মুখোশ উন্মোচন  ২  


রবীন্দ্রনাথ ছিল সন্ত্রাসী , উগ্রহিন্দু শিবাজীর ভক্ত
আত্মগোপনকারী মারাঠী সন্ত্রাসী, খুন, হত্যা আর লুণ্ঠনকারী শিবাজীকে দেবতুল্য করে শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় পালিত রবীন্দ্র ঠগের শিবাজী উৎসব কবিতা এ প্রয়াসেরই অংশ।
 ১.হিন্দু সমাজের নতুন প্রজন্মের কাছে কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী, সন্ত্রাসী যবন, ম্লেচ্ছ শিবাজীকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হলো শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় পালিত রবীন্দ্র ঠগের প্রতিনিধি কবিতা। এই যবন, ম্লেচ্ছ রামদাস ছিল মুসলিমবিদ্বেষী চিন্তার অগ্রপুরুষ। শিবাজী তার কাছ থেকে মুসলিমবিদ্বেষী দীক্ষা গ্রহণ করে।
২.যবন, ম্লেচ্ছ এবং শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় পালিত রবীন্দ্র ঠগের শিবাজী উৎসব (১৯০৪) কবিতাটি যখন রচনা করে তখন সে কবি হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে কলকাতার যবন, ম্লেচ্ছ হিন্দু মহলেও সে সমাদৃত। ঈসায়ী ঊনিশ শতকের শেষ এবং বিশ শতকের শুরুর পর্বে রবীন্দ্র ঠগের চিন্তা ও কর্মের ধারাবাহিকতার সাথে কবিতাটির মর্মার্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
৩. মহারাষ্ট্রের বালগঙ্গাধর তিলক ১৮৯৫ সালের ১৫ এপ্রিল সেখানে সন্ত্রাসী শিবাজী উৎসবের প্রতিষ্ঠা করে। তিলক সন্ত্রাসী শিবাজী উৎসব প্রতিষ্ঠা করেছিল উগ্র হিন্দু জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িকতা প্রচার ও প্রসারের জন্য। ক্রমে সন্ত্রাসী শিবাজী উৎসবের অনুকরণে চালু হয় গণপতি পূজা। ইতঃপূর্বে ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গোরক্ষনী সভা ওই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।
৪. মহারাষ্ট্রের সন্ত্রাসী শিবাজী উৎসবের অনুকরণে সখারাম গণেশ দেউস্করের প্রচেষ্টায় কলকাতায় শিবাজী উৎসব প্রচলিত হয় ১৯০২ সালের অক্টোবর মাসে। দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর দিনে বীরাষ্টমী উৎসব প্রচলন হয়। সে ১৯০৩ সালের ১০ মে শিবাজী উৎসবের অনুকরণে প্রতাপাদিত্য উৎসব প্রচলন করে এবং একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রবর্তন করে উদয়াদিত্য উৎসব।
৫. কলকাতার বাইরে থাকার কারণে যবন, মেøচ্ছ রবীন্দ্র ঠগ সন্ত্রাসী শিবাজী উৎসবের অনুকরণে প্রবর্তিত এই তিনটি উৎসবে উপস্থিত ছিল না। কিন্তু ফসলী সন ১২ আশ্বিন, ১৩১০ (২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯০৩) দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর দিনে ২৬ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে জানকীনাথ ঘোষালের বাড়িতে যে বীরাষ্টমী উৎসব অনুষ্ঠিত হয় রবীন্দ্রনাথ তাতে সক্রিয়ভাবে যোগ দেয়।
প্রদত্ত এই তথ্যগুলো থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে যবন, ম্লেচ্ছ এবং শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় পালিত রবীন্দ্রের আনুকূল্যতায় ও উৎসাহ-উদ্দীপনায় কট্টর মুসলিমবিরোধী, সাম্প্রদায়িক শিবাজী উৎসব কলকাতার উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত যবন,  ম্লেচ্ছ হিন্দু মহলে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। 
এতে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, মারাঠা থেকে আগত বাংলায় শিবাজী উৎসবের প্রবর্তক সখারাম গণেশ দেউস্করের সাথে শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় পালিত রবীন্দ্রের সম্পর্কটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের মধ্যে একটা আর্থিক লেনদেনের সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। এজন্যই কুখ্যাত যবন ম্লেচ্ছ সখারামের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল শিবাজী মহত্ত্ব লিখে বিনামূল্যে জনসাধারণের মাঝে বিতরণ করা।
আর শিবাজী মহত্ত্ব মানেই হলো মুসলিম বিরোধিতা এবং চরম সাম্প্রদায়িকতা। বঙ্গভঙ্গের আবহাওয়া যখন বাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয়কে আন্দোলিত করছে। দেশের দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে বঙ্গভঙ্গের পটভূমিতে ক্রমাগত যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, বাংলার কথিত হিন্দু জমিদার ও মধ্যবিত্ত সমাজ যেভাবে মুসলিমবিদ্বেষী হয়ে উঠছিল শিবাজী উৎসব তার মাত্রাকে আরো তীব্রতর করেছিল।
সন্ত্রাসী শিবাজী উৎসবের মূল মন্ত্র ছিল চরম মুসলিমবিদ্বেষ, সন্ত্রাস এবং সাম্প্রদায়িকতা। বস্তুত এই সন্ত্রাসী শিবাজী উৎসবের সূত্র ধরেই বাংলায় সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির এবং সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি স্থাপিত হয়। এর ফলশ্রুতিতে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান পরস্পর বিপরীত পথে ধাবিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এটা অনস্বীকার্য যে, এই সন্ত্রাস আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দায়ভার পুরোপুরিভাবে বর্তায় যবন, ম্লেচ্ছ হিন্দু জমিদার আর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উপর। সন্ত্রাসী শিবাজী উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে সমগ্র বাংলায় যখন মুসলিমবিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজনীতির ভূমি নির্মাণ করা হয় তখন সাথে সাথে বাঙালি মুসলিম সমাজকে অর্থে বিত্তে, শিক্ষায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে পিছিয়ে দেয়া হয়।
সন্ত্রাসবাদী চেতনা ও ধ্যান-ধারণার শিবাজী উৎসব সম্পর্কে গিরিরাজা শঙ্কর রায় চৌধুরী লিখেছে, তিলক প্রবর্তিত (সন্ত্রাসবাদী চেতনার) শিবাজী উৎসবে কবিতা, গল্প-উপন্যাস, গান ও নাটকে সে চেতনারই নানাভাবে প্রকাশ ঘটে। সে তরঙ্গ বাংলাদেশেও আসিয়া লাগিয়াছিল। সখারাম গণেশ দেউস্কর সম্ভবত ১৯০২ সালে মারাঠার এই বীরপূজা বাংলাদেশে প্রবর্তিত করে। তদবধি মহাসমারোহে কয়েকবার কলিকাতা ও মফস্বলে (সন্ত্রাসবাদী চেতনার) শিবাজী উৎসবের সাম্বাৎসরিক অধিবেশন হইয়াছিল। (শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পালিত) রবীন্দ্র, বিপিনচন্দ্র প্রভৃতি সকলেই এই উৎসবে যোগদান করিয়াছিল। (শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পালিত) রবীন্দ্রের (সন্ত্রাসবাদী চেতনার) শিবাজী উৎসব সম্বন্ধে কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে অমর হইয়াছে। (সূত্র- গিরিরাজা শঙ্কর রায় চৌধুরী, অরবিন্দু ও বাংলার স্বদেশী যুগ, নবভারত পাবলিশার্স, কোলকাতা, পৃঃ ২৭৩)
ভারতে হিন্দুদের মধ্যে সতিদাহ নামক নির্মম ও বর্বর প্রথা প্রচলিত ছিল। যার কারণে বিধবা হিন্দু নারীদেরকে মৃত স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারতো বর্বর অসভ্য জংলি হিন্দুরা। কিন্তু বিধবা হিন্দু নারীদেরকে এই বর্বতা থেকে বাঁচানো নিয়ে কবিতা বা প্রবন্ধ না লিখলেও শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত মেøচ্ছ অস্পৃশ্য যবন রবীন্দ্র ঠগের নজর পড়ে তাদের গো-দেবতা বাঁচানোর দিকে। ওই সময় গো-দেবতা বাঁচানোর মিশন নিয়ে ময়দানে নামে সন্ত্রাসী শিবাজীর অন্ধভক্ত মহারাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক নেতা বালগঙ্গাধর তিলক সে ১৮৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করে গোরক্ষিণী সভা গরু বাঁচাতে গিয়ে তখন ভারতজুড়ে শুরু হয় মুসলিম নিধনের দাঙ্গা। শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত মেøচ্ছ অস্পৃশ্য যবন, রবীন্দ্র ঠগ সে সন্ত্রাসবাদী বালগঙ্গাধর তিলকের এ মিশনে একাত্ম হয় এবং তার জমিদারী এলাকায় গরু কুরবানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই হলো- শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত হিন্দু বাঙালি কবি রবীন্দ্র ঠগের রেনেসাঁ ও চেতনা।
ঐতিহাসিক নীরদ সি চৌধুরী তাই লিখেছে, রামমোহন থেকে রবীন্দ্র পর্যন্ত সকলেই জীবনব্যাপী সাধনা করেছে একটি মাত্র সমন্বয় সাধনের, আর সে সমন্বয়টি হিন্দু ও ইউরোপীয় চিন্তাধারার। সম্মানিত ইসলামী ভাবধারা ও ট্রাডিশন তাদের চেতনাবৃত্তকে কখনো স্পর্শ করেনি।
শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত যবন মেচ্ছ অস্পৃশ্য রবীন্দ্র ঠগকে তাই সন্ত্রাসী শিবাজীকে হিরোরূপে পেশ করতে হয়েছে। শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত যবন মেচ্ছ অস্পৃশ্য রবীন্দ্র ঠগ তার শিবাজী উৎসব কবিতায় সন্ত্রাসী শিবাজীর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে লিখেছে,
হে রাজ-তপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা
বিধর ভা-ারে
সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল কভু তার এক কণা
পারে হরিবারে?
তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশ-লক্ষ্মীর পূজাঘরে
সে সত্য সাধন,
কে জানিত, হয়ে গেছে চির যুগ-যুগান্তর ওরে
ভারতের ধন।
এই হলো- শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত রবীন্দ্র ঠগের সন্ত্রাসী শিবাজীর প্রতি ভক্তিবোধ। এই হলো- শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত রবীন্দ্রের কলুষিত মানস ও সন্ত্রাসবাদী চেতনা! তবে এটি শুধু শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত রবীন্দ্র ঠগের একার চেতনাগত সমস্যা নয়, এটিই মূল সঙ্কট ছিল হিন্দুত্ববাদী রেনেসাঁর সব কর্ণধারদের।
এখন দেখা যাক, শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত যবন রবীন্দ্র ঠগ সে যাকে হে রাজস্বী বীর বলে মুগ্ধ মনে কবিতা লিখেছে তার প্রকৃত পরিচয়টি কি? শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত রবীন্দ্রের মানস চেতনাকে বুঝতে হলে তার ভাবগুরু সন্ত্রাসী শিবাজীকেও বুঝতে হবে।
এতে বুঝা যাবে শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত রবীন্দ্রের ভূঁইফোঁড় ভক্তদের রাজনৈতিক এজেন্ডাও। প্রশ্ন হলো- সে কি আদৌ বীর ছিলো? নাকি প্রতারক ধোঁকাবাজ সন্ত্রাসী ছিল? মূলত, দস্যু শিবাজীর পরিচয় হলো- মোঘল সম্রাট হযরত আওরঙ্গজেব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে সে ব্যস্ত রেখেছিল মারাঠা অঞ্চলে লুকিয়ে থেকে অতর্কিত চোরাগুপ্তা হামলার মধ্য দিয়ে। সম্মুখ সমরে আসার সামর্থ্য তার ছিল না। যুদ্ধে একবার পরাজিত ও বন্দি হওয়ার পর ফন্দি করে লুকিয়ে পালিয়েছিল। আরেকবার সম্রাট হযরত আওরঙ্গজেব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার সেনাপতি আফজাল খাঁর নেতৃত্বে ১০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনীকে তার বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। যুদ্ধের বদলে আলোচনায় ডেকে আফজাল খাঁকে সে হত্যা করে। সেটি ছিল কাপুরুষিত হত্যা। সে সময় আফজাল খাঁ তাকে সম্মানিত ইসলামী উদারতায় আলিঙ্গনে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। সে মুহূর্তে সন্ত্রাসী শিবাজীর বাঁ হাতে লুকানো বাঘের নখ দিয়ে আফজাল খাঁর দেহ ছিন্ন করে।
অথচ এ নিরেট কাপুরুষতা ছলনা ধোঁকাবাজীকে বীরতুল্য গণ্য করেছে শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত যবন রবীন্দ্র ঠগ, যা নিয়ে বিশাল এক কবিতাও সে লিখেছে। এ হলো রবীন্দ্র ঠগের বিবেচনা ও মানবতার মান! রবীন্দ্র ঠগ বরং সেসব ঐতিহাসিকদেরও নিন্দা করেছে, যাদের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী শিবাজী ছিলো এক বর্বর জংলি দস্যু। শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত যবন মেøচ্ছ অস্পৃশ্য রবীন্দ্র ঠগ সে ঔসব ঐতিহাসিকদেরকে মিথ্যাময়ী বলেছে এবং তাদেরকে বিদ্রƒপ করে লিখেছে,
বিদেশীর ইতিবৃত্ত দস্যু বলে করে পরিহাস
অট্টহাস্য রবে
তব পুণ্য চেষ্টা যত তস্করের নিষ্ফল প্রয়াস
এই জানে সবে।
অয়ি ইতিবৃত্ত কথা, ক্ষান্ত করো মুখর ভাষণ
ওগো মিথ্যাময়ী,
তোমার লিখন- পরে বিধাতার অব্যর্থ লিখন
হবে আজি জয়ী।
যাহা মরিবার নহে তাহারে কেমনে চাপা দিবে
তব ব্যঙ্গ বাণী
যে তপস্যা সত্য তারে কেহ বাধা দিবে না ত্রিদিবে
নিশ্চয় সে জানি।

তাই তো ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার সে শরাব ও পতিতালয়ের পয়সায় লালিত-পলিত যবন মেøচ্ছ অস্পৃশ্য রবীন্দ্র ঠগ প্রসঙ্গে লিখেছে- হিন্দু জাতীয়তা জ্ঞান বহু হিন্দু লেখকের চিত্তে বাসা বেঁধেছিল, যদিও স্বজ্ঞানে তাদের অনেকেই কখনোই এর উপস্থিতি স্বীকার করবে না। এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ভারতের রবীন্দ্র; যার পৃথিবীখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবিকতাকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কিছুতেই সুসংগত করা যায় না। তবুও বাস্তব সত্য এই যে, তার কবিতাসমূহ শুধুমাত্র শিখ, রাজপুত ও মারাঠাকুলের বীরবৃন্দের গৌরব ও মাহাত্ম্যেই অনুপ্রাণিত হয়েছে, কোনোও মুসলিম বীরের মহিমা কীর্তনে সে কখনো একচ্ছত্রও লেখেনি। যদিও তাদের অসংখ্যই ভারতে আবির্ভূত হয়েছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় ঊনিশ শতকী বাংলার জাতীয়তা জ্ঞানের উৎসমূল কোথায় ছিল।

শিবাজী নামক ভারতীয় কথিত জাতীয় বীরের নামের সাথে কম বেশি সবাই পরিচিত   শিবাজী ভোঁসলে অথবা ছত্রপতি শিবাজী [১৬৩০১৬৮০], হল মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। সে ছিল চরম ব্রাহ্মণবাদী এবং মুসলিম বিদ্বেষী।

অষ্টাদশ শতাব্দীর লুটতরাজপ্রিয় অশ্বারোহী মারাঠা সৈন্যদলের নাম বর্গি বাংলাদেশের পশ্চিমের নানান স্থানে প্রতি বছর প্রায় নিয়মকরেই একটা নির্দিষ্ট সময় (১৭৪১ ১৭৫১) পর্যন্ত মারাঠাদের কিছু সংঘবদ্ধ লুটেরা এদেশে এসে লুটপাট করতো, সৃষ্টি করতো বিশৃঙ্খলার। লুট করে নিতো ক্ষেতের ফসল। ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিতো, হত্যা করতো নিরীহ মানুষ। এইসব লুটেরাদেরকেই বাংলার মানুষজন বর্গী বলে ডাকতো। বর্গিহানা এই সময় একপ্রকার বাৎসরিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।

মারাঠি ধনগর জাতীয় লোকেরা অভিযানে যাওয়ার সময় কেবলমাত্র একটি সাত হাত লম্বা কম্বল ও বর্শা নিয়ে বের হত। এই বর্শাকে মারাঠি ভাষায় বলা হত বরচি এই নাম থেকেই ধনগররা বারগির বা বর্গা ধনগর বা বর্গি নামে পরিচিত হয়। বর্গি শব্দটি মারাঠি বারগির শব্দের অপভ্রংশ। বারগির বলতে মারাঠা সাম্রাজ্যের সেই সব অশ্বারোহীদের বোঝাত। মারাঠা নেতা ছত্রপতি শিভাজী মারাঠী প্রশাসন কর্তৃক এদের ঘোড়া ও অস্ত্র সরবরাহ করা হত। মারাঠারা প্রধানত ভারতের মহারাষ্ট্রের অধিবাসী হলেও তারা ভারতবর্ষের গোয়া, গুজরাট, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও মধ্য প্রদেশেও বাস করত। সনাতন ধর্মের অনুসারী মারাঠারা মুগল আমলে ছিল ক্ষত্রিয় যোদ্ধা

সপ্তদশ ও অস্টাদশ শতকে বাংলার রেশমি কাপড়ের আড়ংগুলি (আড়ং শব্দটা ফারসি। আড়ং বলতে বড় আকারের বাজারকে বোঝায়) ছিল জমজমাট। বর্গী আক্রমনে আড়ংগুলি লোকশূন্য হয়ে পড়ে। বাংলার অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে থাকে। বাংলাজুড়ে খাদ্যশস্যের অভাব দেখা দেয়, ব্যবসা-বানিজ্য বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। তা সত্ত্বেও বর্গীরা খাজনা আদায় করতে থাকে এবং পুবের যশোর জেলা অবধি বর্গীদের খাজনা আদায় ক্রমেই সম্প্রসারিত হতে থাকে। বর্গীদের নির্মম অত্যাচারে বহু লোক ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করে গঙ্গার পূর্বাঞ্চলে ( বর্তমান বাংলাদেশে) চলে আসে। পূর্বাঞ্চলের বাঙালিরাও বর্গী লুন্ঠনের শিকার হয়।

তবে আমাদের শিবাজিকে চিনতে কোন ইতিহাসের বই পড়ার দরকার নেই। বাংলাদেশের ৩-৪ বছরের বাচ্চাও শিবাজিকে চেনে। শিবাজি মারা যাবার সারে তিনশত বছর পর আজও বাংলার প্রতিটি ঘরে শিবাজির ভয় দেখিয়ে শিশুদের কান্না থামানো হয় বা ঘুম পারানো হয়। শিবাজির দলকে অভিহিত করা হয় বর্গী বলে।আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছোট বেলায় শোনা সেই ছড়া,
খোকা ঘুমালো, পাড়া জুরালো
বর্গী এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে,
খাজনা দিবো কিসে

ঐতিহাসিক স্যুলিভ্যান এই শিবাজী সর্ম্পকে লিখেছে-
‘‘শিবাজী’’ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লুন্ঠক ও হন্তারক দস্যু। আর সে যাদের সংগঠিত করেছিল সেই মারাঠা জাতি ছিল এমন অপরাধপ্রবণ যে, মুহূর্তের মধ্যে তারা তাদের লাঙ্গলের ফলাকে তরবারিতে রুপান্তরিত করে এবং ঘোড়া ধার অথবা চুরি করে লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়তো।  যেখানেই তারা গিয়েছে সেখানেই কেবল ধ্বংস ও মৃত্যু রেখে এসেছে(দি প্রিনসেস অব ইনডিয়া, স্যার এডওয়ার্ড সুলিভ্যান, এডওয়ার্ড স্ট্যানফোর্ড, লন্ডন,১৮৭৫)

মিঃ হলওয়েল তার Interesting History/ Events Holl Well পুস্তুকে লিখেছে, ‘‘তার ভীষণতম ধ্বংসলীলা ও ক্রুরতম হিংসাত্মক কার্যে আনন্দ লাভ করতো। তারা ভুত গাছের বাগানে ঘোড়া ছুটিয়ে রেশম উৎপাদন একেবারে বন্ধ করে দেয়।দেশের সর্বত্র বিভীষিকায় ছায়া পড়েছে।গৃহস্থ কৃষক ও তাঁতীরা সকলেই গৃহভ্যাগ করে পলায়ন করেছে।আড়তগুলো পরিত্যক্ত, চাষের জমি অকর্ষিত।খাদ্যশস্য একেবারে অন্তর্হিত, ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে।’’ এই ছিল শিবাজী চরিত্রের প্রকৃত স্বরপ।

শিবাজির দল বাংলাতেও তাদের ডাকাতির কালো থাবা বাড়িয়ে দেয়। তবে বাংলায় তখন ছিলেন শায়েস্তা খাঁ। তিনি শিবাজির দলকে দমন করে বাংলাকে রক্ষা করেন। শিবাজির দলের বিরুদ্ধে অভিযান শেষে একরাতে শায়েস্তা খাঁ তার শয়নকক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বিশ্রামরত নিরস্ত্র শায়েস্তা খাঁ কে কাপুরুষের মতো অতর্কিতে আক্রমণ করল মারাঠা দস্যুসর্দার শিবাজী। শায়েস্তা খাঁ জানালা ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করেন। কিন্তু তার অল্পবয়স্ক পুত্র দুর্ঘটনাবশত ঘরেই থেকে যায়। তার নিষ্পাপ পুত্রকে শিবাজী একা পেয়ে খন্ড- খন্ড- করে কেটে পৈশাচিক ভাবে হত্যা করে। এই ঘটনাটি ঘটে ১৬৬ সালের এপ্রিল মাসে। [চেপে রাখা ইতিহাস, ১৭৯ পৃষ্ঠা]

শিবাজী যখন তার লুটপাট ও অত্যাচারের অতিষ্ঠ মানুষ সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে সাহায্য চায়। তখন তিনি ১০ হাজার সেনা নিযে সেনাপতি আফজল খাঁ কে পাঠিয়েছিলেন মারাঠা দস্যুদের দমনের জন্য। খবর পেয়ে শিবাজী বুঝতে পারে সম্মুখ যুদ্ধে পারা সম্ভব নয়। তাই সে ভিন্ন রাস্তা নেয়। সন্ধির প্রস্তাব নিয়ে শিবাজী গেলো আফজল খাঁর সাথে দেখা করতে। যুদ্ধক্ষেত্রে একটি নিয়ম হচ্ছে, সন্ধি করতে আসলে তাকে সম্মান করতে হবে, তার কোন অনিষ্ট করা যাবে না। সেনাপতি আফজল খাঁ শিবাজীকে সাদর সম্ভাষন জানালো। এ সময় দুজনে সৌজন্য মোলাকাতও করলো। কিন্তু মারাঠা দস্যু নেতা শিবাজী ছিলো ধোঁকাবাজ। সে আগেই তার পোষাকের নিচে বাঘনখ নামক একটি ধারালো অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছিলো, মোলাকাতের সময় সে হঠাৎ সেনাপতি আফজল খানের উপর আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে।

গো-ব্রাহ্মণ প্রতিপালক শিবাজী একটি গরুর জন্য কয়েকশত মুসলমানকে হত্যা করত।মুসলমান মেয়েরা মারাঠা বাহিনী কর্তৃক ধর্ষিতা হত। মুসলমানদের সম্পদ লুণ্ঠিত হতো।মোটকথা, মুসলমানদের ত্রাস ছিল এই শিবাজী।অবিভক্ত বাংলায় মুসলমান নিধনের জন্য শিবাজী উৎসব প্রবর্তিত হয়।
[উৎসঃ সরকার শাহাবুদ্দীন আহমদ,  ইতিহাসের নিরিখে রবীন্দ্র- নজরুল চরিত, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ, দ্বিতীয় সংস্করন, জুলাই ২০০২, ঢাকা পৃষ্ঠা ১০৩-১১৯]

সেই শিবাজিকে নিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ লিখল,
মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক কন্ঠে বলো
'জয়তু শিবাজি'
মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক সঙ্গে চলো
মহোৎসবে সাজি।
আজি এক সভাতলে ভারতের পশ্চিম-পুরব
দক্ষিণে ও বামে
একত্রে করুক ভোগ একসাথে একটি গৌরব
এক পুণ্য নামে।।
[শিবাজি উৎসব]