ভারতবর্ষ থেকে ৪৫ লাখ কোটি ডলার চুরি করে ব্রিটেন
ভারতবর্ষ থেকে ৪৫ লাখ কোটি ডলার চুরি করে ব্রিটেন

ব্রিটেনের পক্ষ থেকে বলা হতো ভারতীয় উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন তাদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। এখান থেকে তারা উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক সুবিধা তো পায়নি, উপরন্তু এটি তাদের খরচের একটি খাত হিসেবেই ছিল। ব্রিটেনের এ বক্তব্যের মাধ্যমে এই উপমহাদেশের প্রতি তাদের অনুগ্রহ করার একটি ভাব ছিল।

কিন্তু কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে অর্থনীতিবিদ উষা পটনায়েকের সদ্য প্রকাশিত একটি গবেষণা ওই মিথের ওপর বড় ধরনের একটি আঘাত হেনেছে। কারণ তাতে কর ও বাণিজ্য সম্পর্কিত দুই শতাধিক নথির উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত এ সময়ে ব্রিটেন ভারতবর্ষ থেকে প্রায় ৪৫ লাখ কোটি ডলার লুট করে নিয়ে যায় যা বর্তমানে ব্রিটেনের মোট জিডিপির ১৭ গুণ।

কিভাবে এ চুরি করা হয়?
মূলত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের কূটবুদ্ধির ফলেই এটি সম্ভব হয়েছিল। প্রথম দিকে তারা স্বাভাবিকভাবে ভারতের উৎপাদকদের কাছ থেকে রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে পণ্য কিনত। কিন্তু ১৭৬৫ সালের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পুরো ভারতবর্ষের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়ার পর তাদের পদ্ধতি পাল্টে যায়। তারা ভারতবাসীদের কাছ থেকে কর নিত, আবার সেই করের টাকা দিয়ে ভারতে বসবাসরত ব্রিটিশরা ভারতীয়দের কাছ থেকে পণ্য কিনত। এর ফলে তারা আসলে ভারতবাসীদের কাছ থেকে ফ্রিতেই পণ্য নিত। এটি বড় আকারের চুরি হলেও যেহেতু কর আদায়কারী ও পণ্যক্রয়কারী গ্রুপ ভিন্ন ভিন্ন ছিল, তাই কেউ বিষয়টি ধরতে পারেনি।

চুরি করা এসব পণ্যের কিছু ব্রিটেনেই ব্যবহৃত হতো। আর বেশির ভাগই অন্যত্র পুনঃরফতানি করা হতো। ব্রিটেনের শিল্পায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য লোহা, আলকাতরা ও কাঠ ইত্যাদির ক্ষেত্রে ইউরোপে অর্থপ্রবাহ বজায় রাখতে সেখানে পুনঃরফতানির বিষয়টি অনুমোদন করে দেশটি। বস্তুত ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের একটি বড় অংশ ভারতবর্ষ থেকে নেয়া চুরির ওপরই নির্ভরশীল ছিল। এভাবে চুরি করা, সেই পণ্য অন্যত্র বিক্রি ইত্যাদির মাধ্যমে তারা শুধু পণ্যের ১০০% মূল্যই পকেটে ভরতো তা নয়, উপরন্তু তার মুনাফাও গ্রাস করত।


১৮৪৭ সালে ব্রিটেনের রাজা ভারতবর্ষের দায়িত্ব নেয়ার পর তারা কর ও বাণিজ্যের নতুন একটি পদ্ধতি চালু করে। তাতে বলা হয়, ভারত থেকে কেউ কিছু কিনতে চাইলে তাকে শেষ পর্যন্ত লন্ডনেই লেনদেন শেষ করতে হবে। কারণ আমদানিকারক দেশ বা প্রতিষ্ঠানকে দায় শোধ করতে হতো কাউন্সিল বিলের মাধ্যমে, যা কেবল ব্রিটিশ রাজাই ইস্যু করতেন এবং লন্ডন থেকে স্বর্ণ বা রূপার বিনিময়ে তা কিনতে হতো। আমদানিকারকেরা ভারতে সেই কাউন্সিল বিল দিয়েই পণ্য কিনত।

ভারতীয়রা যখন সেই বিল ক্যাশ করতে চাইতো তখন তাদের তা ক্যাশ করে দেয়া হতো করের রুপি দিয়েই, যা তাদের কাছ থেকেই কর আকারে নেয়া হয়েছিল। ফলে আসলে তাদের কোনো অর্থ দেয়া হতো না। তাদের সাথে কেবল প্রতারণাই করা হতো। ফলে সে স্বর্ণ বা রৌপ্য আসলে ভারতীয়দের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল, তা শেষ পর্যন্ত লন্ডনে গিয়েই জমা হতো।
এ অবস্থার সাধারণ জবাব দিতে গিয়ে কোনো কোনো সময় ব্রিটেনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ভারত ব্রিটেনের নিকট দায়বদ্ধ ছিল। কিন্তু আসলে ঘটনা ছিল তার উল্টো। ভারতবর্ষ থেকে এভাবে অর্থ লন্ডনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারণেই ভারতীয়রা ব্রিটেন থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এ অপ্রয়োজনীয় ঋণ দিতে পেরে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী হয়।

ভারতবর্ষ থেকে নেয়া এসব অর্থ তারা বিভিন্ন আক্রমণ, অভিযান, শত্রুপক্ষকে ঠেকানোর কাজেও ব্যবহার করত। ১৮৪০ সালে চীনের আক্রমণ, ১৮৫৭ সলে ভারতে বিদ্রোহ দমনসহ প্রত্যেক ক্ষেত্রে এ খাত থেকেই অর্থ খরচ করা হয়েছে। এ ছাড়া যেকোনো যুদ্ধের ক্ষেত্রেই ভারতের করদাতাদের কর দিতে বাধ্য করা হতো। পটনায়েক এ বিষয়ে বলেন, ভারতের সীমান্তের বাইরে ব্রিটেনের যেকোনো যুদ্ধে পুরোপুরি বা অধিকাংশেই ভারত থেকে আহরিত রাজস্বই ছিল তাদের ভরসা। আবার ইউরোপে পুঁজিবাদ বিস্তারে খরচসহ বিভিন্ন দেশে শিল্পায়নে এসব উপনিবেশের অর্থই ব্যবহৃত হতো। পটনায়েক ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত সময়কে চার ভাগে ভাগ করে দেখেছেন, এভাবে ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটেন যে অর্থ নিয়ে গেছে, তার পরিমাণ ৪৪ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার।

যদি ভারতবর্ষ তাদের নিজেদের কর ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অর্থগুলো নিজেদের উন্নয়নে ব্যয় করতে পারত, যেমনটি করেছে জাপান, তাহলে এ অঞ্চলের ইতিহাস অন্যরকম হতো পারত। দারিদ্র্য, কষ্ট দূর করে হয়তো পরিণত হতো পারত অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে।

কিন্তু ব্রিটিশরা ওই বিষয়গুলো এখনো স্বীকার করতে চায় না। বরং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছিলেন, ব্রিটিশদের এ শাসন ছিল ভারতবাসীদের জন্য একটি নিঃখরচার সাহায্য। অথচ ২০১৪ সালে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গিয়েছিল, ৫০ শতাংশের বেশি ব্রিটিশ মনে করে এসব উপনিবেশবাদ উপনিবেশগুলোর জন্য কল্যাণকর ছিল।



তবে সত্য হচ্ছে, ব্রিটিশদের ২০০ বছরের ভারত শাসনে মাথাপিছু আয় বাড়েনি, গড় আয়ু বাড়েনি। বরং দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ লোক মারা গিয়েছিল। তাই পটনায়েক বলেন, ব্রিটেন ভারতের উন্নয়ন ঘটায়নি, বরং ভারতবর্ষই ব্রিটেনকে উন্নত করেছে। তাহলে এখন ব্রিটেনের কী করা উচিত? ক্ষমা চাওয়া। অবশ্যই। আর ক্ষতিপূরণ দান? সম্ভবত পুরো ব্রিটেনেরও সেই অর্থ পরিশোধ করার সামর্থ্য নেই। সূত্র : আলজাজিরা
মানসা মুসা: সর্বকালের সেরা ধনী যে মুসলিম শাসক
মানসা মুসা: সর্বকালের সেরা ধনী যে মুসলিম শাসক
কিছুদিন আগে প্রকাশিত ফোর্বস বিলিয়নিয়ারের তালিকায় সেরা ধনী হয়েছে আমাজোনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। ১৩১ বিলিয়ন (১৩ হাজার ১০০ কোটি) ডলার সম্পদের মালিক বোজোস আধুনিক সময়ের সেরা ধনী।

তবে সর্বকালের সেরা ধনীর সম্পদের কাছাকাছিও সে নেই।

সেই খেতাবের মালিক মানসা মুসা, ১৪ শতকে পশ্চিম আফ্রিকার এই মুসলিম শাসক এতটাই ধনী ছিলেন যে তার দানশীলতার কারণে একটি পুরো দেশের অর্থনীতিতে পর্যন্ত ধস নেমেছিল।

"মুসার সম্পদের যে শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে আসলে তিনি যে কতটা সম্পদশালী এবং ক্ষমতাশালী ছিলেন তা ধারণা করাও কঠিন,"- বিবিসিকে বলে রুডলফ বুচ ওয়ার, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

"কারো পক্ষে যতটা বর্ণনা করা সম্ভব তার চেয়েও ধনী ছিলেন মানসা মুসা,"- ২০১৫ সালে মানি ডট কমের জন্য লেখে জ্যাকব ডেভিডসন।

২০১২ সালে একটি মার্কিন ওয়েবসাইট, সেলিব্রিটি নেট ওর্থ তাঁর মোট সম্পদের মূল্য ৪০ হাজার কোটি ডলার বলে একটি ধারণা দেয়। তবে অর্থনীতির ইতিহাসবিদরা একমত যে সংখ্যা দিয়ে তাঁর সম্পদের কোন সঠিক ধারণা দেয়া একরকম অসম্ভব।

স্বর্ণের রাজা
১২৮০ সালে একটি শাসক পরিবারেই জন্ম মানসা মুসার। তিনি ক্ষমতায় আসার আগে মালি সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন তাঁর ভাই মানসা আবু-বকর। ১৩১২ খ্রিস্টাব্দে আবু-বকর সিংহাসন ত্যাগ করে একটি অভিযানে বের হন।

চতুর্দশ শতকের সিরীয় ইতিহাসবিদ শিহাব আল-উমারির বর্ণনা অনুযায়ী, আটলান্টিক মহাসাগর এবং তার ওপারে কী আছে তা নিয়ে মারাত্মক কৌতুহলী ছিলেন আবু-বকর। বলা হয় ২ হাজার জাহাজ এবং হাজার-হাজার পুরুষ, নারী এবং দাস-দাসী নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি জমান তিনি, এবং এরপর আর কখনো ফিরে আসেননি।


প্রয়াত মার্কিন ইতিহাসবিদ আইভান ভ্যান সারটিমার মতো অনেকেই মনে করে আবু-বকর শেষপর্যন্ত দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছুতে পেরেছিলেন। যদিও এর কোন প্রমাণ নেই।

যাইহোক, উত্তরাধিকার সূত্রে ভাইয়ের ফেলে যাওয়া রাজত্বের শাসনভার নেন মানসা মুসা।

তাঁর শাসনামলে মালি রাজত্বের আকার বাড়তে থাকে। তিনি তার রাজত্বে আরো ২৪ টি শহর যুক্ত করেন, যার একটি ছিল টিম্বাকটু।

তাঁর রাজত্ব বিস্তৃত ছিল ২,০০০ মাইলজুড়ে, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে বর্তমান নিজার, সেনেগাল, মৌরিতানিয়া, মালি, বুর্কিনা ফাসো, গাম্বিয়া, গিনি-বিসাউ, গিনি এবং আইভোরি কোস্টের বড় অংশ ছিল তার রাজত্বে।
এই বিশাল সাম্রাজ্যের সাথে তাঁর আয়ত্ত্বে আসে মূল্যবান খনিজ সম্পদ- বিশেষ করে স্বর্ণ এবং লবণ।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামের হিসেবে মানসা মুসার শাসনামলে তৎকালীন বিশ্বে যে পরিমাণ স্বর্ণের মজুত ছিল তার অর্ধেকই ছিল মালিতে।আর তার সবটারই মালিক ছিলেন মানসা মুসা।

"শাসক হিসেবে মধ্যযুগের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটির প্রায় অফুরান যোগান ছিল মানসা মুসার,"- বিবিসিকে বলে ক্যাথলিন বিকফোর্ড বারজক, নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আফ্রিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ।
"বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো তার সাম্রাজ্যে স্বর্ণ এবং অন্যান্য পণ্যের ব্যবসা করতো, সেই বাণিজ্য থেকে আরো সম্পদশালী হয়ে ওঠেন মানসা মুসা"।

মক্কা শরীফের উদ্দেশ্যে মানসা মুসা
মালি সাম্রাজ্যে স্বর্ণের বিশাল মজুত থাকলেও, এই রাজত্ব বহির্বিশ্বে অতটা পরিচিত ছিল না।
তবে ধর্মপ্রাণ মুসলিম মানসা মুসা যখন সাহারা মরু এবং মিশর পার হয়ে মক্কায় হ্জ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখনি সেই অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করলো।
মানসা মুসার মক্কা যাত্রা তাকে এবং মালিকে মানচিত্রে স্থান করে দেয় - ১৩৭৫ সালের কাতালান অ্যাটলাস মানচিত্রের

বলা হয় ৬০,০০০ মানুষের একটি দল নিয়ে মালি ত্যাগ করেন মুসা।

তার সেই দলে ছিলেন সম্পূর্ণ মন্ত্রী পরিষদ, কর্মকর্তারা, সৈনিক, কবি, ব্যবসায়ী, উটচালক এবং ১২,০০০ দাস-দাসী। একইসাথে খাবারের জন্য ছিলো ছাগল এবং ভেড়ার এক বিশাল বহর।

মরুর বুক দিয়ে যেন একটি শহর চলছিল।

যে শহরের এমনকি একজন দাসের গায়েও স্বর্ণখচিত পারস্যের সিল্কের জামা। শহরের সাথে চলছিল শত-শত উটের আরেকটি বহর, যার প্রতিটির পিঠে শত-শত সের খাঁটি স্বর্ণ।
দেখার মত দৃশ্য ছিল সেটি।

সেই দেখার মত মানুষ পাওয়া গেল যখন পুরো ক্যারাভানটি কায়রোতে পৌঁছুল।

কায়রোর স্বর্ণধস
কায়রোতে মানসা মুসার ভ্রমণ সেখানকার বাসিন্দাদের মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে তাঁর ভ্রমণের ১২ বছর পর যখন আল-উমারি শহরটিতে যান, তখনো মানুষের মুখে মুখে ছিল মানসা মুসার স্তুতিবাক্য।

কায়রোতে তিন মাস অবস্থানের সময় তিনি যে হারে মানুষকে স্বর্ণ দান করেছেন তাতে পরবর্তী ১০ বছর ঐ পুরো অঞ্চলে স্বর্ণের দাম তলানিতে গিয়ে পৌঁছায়, অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্মার্টঅ্যাসেট ডট কমের এক হিসেবে, মানসা মুসার মক্কা যাত্রার ফলে স্বর্ণের যে অবমূল্যায়ন হয় তাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে তৎকালীন সময়ে ১৫০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল।

ফেরার পথে আবারো মিশর পার হন মানসা মুসা। অনেকের মতে যেসময় দেশটির অর্থনীতিকে সাহায্য করার চেষ্টা করেন তিনি। চড়া সুদে তিনি বেশকিছু স্বর্ণ ধার করে সেগুলো তিনি বাজার থেকে তুলে নেন। আবার অনেকে বলেন, তিনি এত বেশি খরচ করেন যে তাঁর স্বর্ণ শেষ হয়ে যায়।

লন্ডনের স্কুল অফ আফ্রিকান এবং ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের লুসি ডুরান বলেন, মালির চারণকবি, যারা কিনা গানের সুরে ইতিহাস বর্ণনা করতেন, তারা মানসা মুসার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।


"তিনি মালির এত বেশি স্বর্ণ দান-খয়রাত করেন যে তারা (চারণকবিরা) তাদের গানে মানসা মুসার প্রশংসা করেন না। কারণ তারা মনে করেন, তিনি দেশটির সম্পদ বিদেশের মাটিতে নষ্ট করেছেন"।

হৃদয়ে ছিল শিক্ষা
মানসা মুসা তার মক্কা শরীফ গমনে যে প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণ খরচ করেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে তার এই অতি দানশীলতাই তাকে বিশ্বের নজরে এনে দেয়।

মানসা মুসা আক্ষরিক অর্থেই মালি এবং নিজেকে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে দেন। ১৩৭৫ সালের একটি কাতালান মানচিত্রে টিম্বাকটুর ওপরে একজন আফ্রিকান রাজাকে স্বর্ণের টুকরো হাতে বসে থাকার ছবি দেখা যায়। তিনিই মানসা মুসা।

দূর-দুরান্ত থেকে মানুষজন টিম্বাকটু দেখতে আসা শুরু করেন।

উনিশ শতকেও টিম্বাকটু ছিল কিংবদন্তীর হারিয়ে যাওয়া এক স্বর্ণের শহর। ভাগ্যান্বেষণে ইউরোপ থেকেও পরিব্রাজকেরা খোঁজ করতেন এই টিম্বাকটুর। আর এর পেছনে মূল কারণটিই ছিল ৫০০ বছর আগে মানসা মুসার সেই শাসনামল।

মক্কা থেকে বেশ কয়েকজন ইসলামী চিন্তাবিদকে সাথে নিয়ে আসেন মানসা মুসা। যাদের মধ্যে ছিলেন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সরাসরি বংশধর এবং একজন আন্দালুসিয়ান কবি ও স্থপতি আবু এস হক এস সাহেলি, যাকে কিনা বিখ্যাত জিংগারেবার মসজিদের নকশাকার হিসেবে ধারণা করা হয়।

মানসা মুসা সেই কবিকে পারিশ্রমিক হিসেবে ২০০ কেজি স্বর্ণ দিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। যার বর্তমান বাজারমূল্য ৮২ লক্ষ মার্কিন ডলার।

শিল্প এবং স্থাপনায় উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা দেন, স্কুল, লাইব্রেরি এবং মসজিদ তৈরিতে অর্থ দান করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই টিম্বাকটু হয়ে ওঠে শিক্ষার কেন্দ্র এবং সারাবিশ্ব থেকে মানুষজন সেখানে পড়তে আসা শুরু করে, যা পরবর্তীতে পরিচিত হয় সাংকোর বিশ্ববিদ্যালয় নামে।

ধনী সেই রাজাকে পশ্চিম আফ্রিকায় শিক্ষার প্রসারের অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও সেই সাম্রাজ্যের বাইরে তার সেই গল্প খুব কম মানুষই জানতে পেরেছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল বলেছিলে, "ইতিহাস লেখে বিজয়ীরা"।

১৩৩৭ সালে ৫৭ বছর বয়সে মানসা মুসার মৃত্যুর পর তার ছেলেরা আর সেই সাম্রাজ্য ধরে রাখতে পারেনি। ছোট রাজ্যগুলো একে একে বেরিয়ে যেতে থাকে এবং একসময় পুরো সাম্রাজ্য ধসে পড়ে।
১৩২৭ সালে জিংগারেবার মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন মানসা মুসা।
পরবর্তীতে ইউরোপিয়দের আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপন ছিল প্রতাপশালী সম্রাট মানসা মুসার কফিনের শেষ পেরেক।
"মধ্যযুগের ইতিহাসকে এখনো অনেকটা পশ্চিমা ইতিহাস হিসেবেই দেখা হয়,"- মানসা মুসার কাহিনী কেন এতটা প্রচারিত নয় তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলে ব্লক মিউজিয়ামের পরিচালক লিসা করিন গ্রাজিও।


"কয়েক'শ বছর পরে না এসে, মানসা মুসার সময়ে মালি যখন সামরিক এবং অর্থনৈতিক শক্তিতে সবার শীর্ষে ছিল, তখন যদি ইউরোপিয়রা আফ্রিকায় আসতো- তাহলে হয়তো পুরো বিষয়টা অন্যরকম হতো," বলে মিস্টার ওয়ার।
বসনিয়ার যুদ্ধে যোগ দিয়ে যেভাবে বাংলাদেশ ‘অভিযুক্ত’ এবং অবরুদ্ধ হয়েছিলো
বসনিয়ার যুদ্ধে যোগ দিয়ে যেভাবে বাংলাদেশ ‘অভিযুক্ত’ এবং অবরুদ্ধ হয়েছিলো

বসনিয়ার যুদ্ধের কথা আমরা অনেকেই জানি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এটিই ছিলো বিশ্বের প্রথম বড় সামরিক সংঘাত। এই সংঘাতের প্রায় পুরোটা জুড়েই বসনিয়াক মুসলিমদের গণহত্যা ঠাঁসা থাকলেও এর মূলে ছিলো একটি নোংরা ভূরাজনৈতিক খেলা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা অক্ষ কতৃক সাবেক সোভিয়েত সাম্রাজ্যের আঙ্গিনা বলকান উপদ্বীপে প্রবেশের চেষ্টার বিভিন্নমুখী তৎপরতার বহিঃপ্রকাশ ছিলো বলকান যুদ্ধ। সেই খেলায়ও যেমন মুসলিমরা ঢালে পরিণত হয়েছিলো, তার দুই দশক পর আরাকানেও হুবহু একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে দুটিতেই বাংলাদেশ জড়িত হয়েছে।
.
এরমধ্যে বসনিয়ায় জড়িত হওয়াটা বিস্ময়ের উদ্রেককারী হলেও সত্যি হচ্ছে, বাংলাদেশ কেবল জড়িতই হয়নি, একটা সময় পর্যন্ত হানাদার সার্ব মিলিটারী, এমনকি পশ্চিমা মিডিয়া পর্যন্তও সন্দেহ করেছে যে, জাতিসংঘের পতাকা নিয়ে গেলেও বাংলাদেশ ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে সার্বদের বিরুদ্ধে বসনিয়ার বাহিনীকে সাহায্য করে একটি শহরে তিন বছর ধরে চলা সার্ব অবরোধ ব্যহত করেছে! এর জন্য ১২০০ সৈন্যের বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টকে তীব্র গোলাগুলিতে প্রায় দশ সপ্তাহের অবরোধে আটকে থাকতে হয়, এবং মারাত্মক রসদ ও সরঞ্জাম সংকটে ভুগতে হয়!
.
বস্তুত, বসনিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ন্যাটো দেশগুলো সীমিত মাত্রায় শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করছিলো। তবে ১৯৯৩ নাগাদ যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো বসনিয়া থেকে সরে পড়তে থাকে। তখন আমেরিকা ধর্মীয় অনুভূতির সুবিধা কাজে লাগাতে মুসলিম দেশগুলো থেকে জাতিসংঘের আওতায় শান্তিরক্ষী বসনিয়ায় পাঠানোর চেষ্টা শুরু করে। ১৯৯৩ সালে এমনই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি কন্টিনজেন্ট বসনিয়ায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। বাংলাদেশ আর্মির কয়েকজন অফিসার রেকোনাইসেন্স মিশনে তখন বসনিয়ার আশেপাশে ঘুরেও আসেন।
.
কিন্তু বসনিয়ায় তৃতীয় কোন মুসলিম দেশ থেকে সেনা পাঠানোর বিষয়টি এতো সরল ছিলোনা। খোদ ইউরোপীয় দেশগুলোই বলকানের মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে অন্য কোন মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেখতে রাজী ছিলোনা। ঐতিহাসিক ভীতি ছাড়া এর পেছনে কোন বাস্তব কারণ ছিলো বলে মনে হয়না।

প্রাথমিক বাঁধায় বাংলাদেশ থেকে সেনা বসনিয়ায় পাঠানো যায়নি। যে ব্যাটালিয়নটিকে বসনিয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিলো, তাকে পরে কুয়েতে পাঠানো হয়।
.
১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি বসনিয়ার পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে পড়লে এবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কোন প্রস্তাব উত্থাপন না করেই বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া থেকে সৈন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। বাংলাদেশকে মাত্র ৪৫ দিনের নোটিশে একটি মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন প্রস্তুত করতে বলা হয়।


মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রির প্রধান উপাদান এপিসি। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ আজকের মতো ভুরিভুরি এপিসির মালিক ছিলোনা। এছাড়াও বলকানের তীব্র ও আদ্রতায় পূর্ণ শীতে যুদ্ধ দূরে থাক, থাকার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশী সৈন্যদের ছিলোনা।
.
এই সমস্যা নিরসনে সোভিয়েত আমলে স্লোভাকিয়ায় চালু হওয়া সাবেক পূর্ব জার্মান সেনাবাহিনীর একটি ওয়ারহাউস থেকে রসদ, শীতের কাপড় এবং অস্ত্রের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।

১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশী কন্টিনজেন্ট প্রথম বসনিয়ায় প্রবেশ করে। এই কন্টিনজেন্টে ছিলো একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, এবং একটি করে ওয়ার্কশপ, লজিস্টিকস সাপোর্ট, মেডিকেল ও সিগনাল ডিটাচমেন্ট। কর্নেল সেলিম আখতারের নেতৃত্বাধীন ১২০০ লোকবলের এই কন্টিনজেন্টের উপর দেয়া হয়
.
১৯৯২ সাল থেকে সার্বিয়ার অবরোধের সম্মুখীন হওয়া বিহাচ শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব। বিহাচ মূলত চারিদিকে খ্রীষ্টান অধ্যুষিত একটি ছোট্ট মুসলিম ছিটমহল। এখানে বসনিয়ানরা স্বভাবতই চাপে ছিলো এবং সার্বরা অবরোধ কষছিলো। বিহাচে কিছুদিন আগেও একটি ফরাসী ব্যাটালিয়ন ছিলো, যারা আর এখানে থাকতে চাচ্ছিলো না। তারা উইথড্র করার পর যুদ্ধ আর অবরোধে পস্ত বিহাচে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

💣 বাংলাদেশী ফোর্স গমনে হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে গেলো 💣
তিন বছর অবরুদ্ধ থাকার পর বসনিয়ান বাহিনী সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সার্বদের উপর তীব্র আক্রমণ হানে। এই হামলায় সার্বরা পরাজিত হয়। বিহাচের আশেপাশে বেশ কিছু সার্ব জমি বসনিয়ানরা কেবল দখলই করেনি, তাদের তীব্র হামলার মুখে পলায়নপর সার্বদের ফেলে যাওয়া হাতিয়ারসম্ভারও তারা দখলে নিয়ে নেয়।
.
এই ঘটনার পর সার্ব বাহিনী ধরে নেয় তাদের এহেন বিপর্যয়ের পেছনে বাংলাদেশ থেকে সদ্য আগত বাহিনীর ভূমিকা আছে, যাদের সকলেই মুসলিম। এমনকি এই সময়ে জাতিসংঘের নিয়োগকৃত পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরাও সন্দেহ করতে শুরু করে, বাংলাদেশ আর্মির উপস্থিতিই বসনিয়ান বাহিনীকে সার্বদের উপর হামলা করে তাদের খেদিয়ে দিতে সহায়তা করেছে। পশ্চিমা মিডিয়াও সেসময় বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের বিরুদ্ধে নেতিবাচক খবর প্রচার শুরু করেছিলো বলে ফোর্স কমান্ডার বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সেলিম আখতার জানান।
.
যাহোক, বিপর্যয়ের শিকার হবার পর সার্ব বাহিনীর নতুন লক্ষ্যবস্তু হয় বাংলাদেশী কন্টিনজেন্ট। সার্বরা প্রথমে বাংলাদেশীদের উপর তীব্র অবরোধ আরোপ করে। এমনকি হেলিকপ্টারেও খাদ্য ও রসদ সরবরাহের পথও রূদ্ধ হয়ে যায়।

এরইমধ্যে ডিসেম্বরে সার্বরা এন্টি ট্যাংক মিসাইল সহ বাংলাদেশী সেনাদের উপর হামলা করলে ইসমাইল নামে একজন সৈনিক শহীদ হন এবং আরো তিন সৈনিক আহত হয়।
.
এদিকে বাংলাদেশী সৈন্যদের বিহাচে অবরুদ্ধ ও হামলার সম্মুখীন হবার ঘটনায় বাংলাদেশে ব্যাপক উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়। ঢাকায় সেনা সদর থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা এবং অবরুদ্ধ বাংলাদেশী ফোর্স কমান্ডারকে প্রয়োজনীয় নসিহত দেয়ার কাজ চলতে থাকে। এমনকি বাংলাদেশী বাহিনীকে দ্রুত উদ্ধারের দাবী জানিয়ে রাস্তায় বিক্ষোভের আয়োজনও করা হয়।
.
তখন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অভিযান ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার ফজলুর রহমান। তিনি কর্নেল সেলিম আখতারের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি ঢাকাস্থ মার্কিন ও সৌদি মিলিটারী অ্যাটাশের সাথে যুক্ত থাকেন। আমেরিকা ও সৌদি আরবের মাধ্যমে ন্যাটো ও ওআইসির মাধ্যমে বাংলাদেশী সৈন্যদের অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে বাংলাদেশ। এই প্রক্রিয়ার উপর এপি একটি প্রতিবেদন করে, যার ভিডিও ফুটেজ এখানে দিলাম- https://youtu.be/c80r5IoJRa8
..
প্রায় দশ সপ্তাহ অবরোধে বাংলাদেশী সৈন্যরা উচ্চতর সাহস ও দৃঢ়তার নজির স্থাপন করে। তারা খাদ্য ও রসদ সংকটে কাবু হয়ে পড়লেও সার্বদের তাদের উপর চেপে বসতে দিচ্ছিলো না। একবার এক তরুণ ক্যাপ্টেন তার এপিসির টিম নিয়ে বসনিয়ান পজিশনের কাছে অবস্থান নিতে গেলে সার্বরা তীব্র আক্রমণ চালায়। তবে তারপরও ওই বাংলাদেশী ক্যাপ্টেন স্বীয় অবস্থান ত্যাগ করেননি। সাধারণত কোন ভাড়াটে মিশনে এমন দৃঢ়তা দেখা যায়না।
.
অবরোধ শেষ হয় ন্যাটো বিমান হামলার ঘনঘটার মাধ্যমে। ন্যাটো প্রথমে ব্যাপক বিমান হামলার প্রস্তাব করলেও বাংলাদেশের প্রস্তাবে বিহাচে নির্বিচার বোমা হামলার বদলে কেবল সার্ব অবস্থান লক্ষ্য করে এয়ার স্ট্রাইক করে ন্যাটো। এতে করে বিহাচের মুসলিম অধিবাসী এবং বসনিয়ান সৈন্যরা অপ্রয়োজনীয় রক্তক্ষরণ থেকে রক্ষা পায়। একই সাথে হানাদার সার্বদের মনোবলে চিড় ধরায় ওই বিমান হামলা। যা কয়েকমাস পর বিহাচ থেকে চার বছর ধরে চলা সার্ব অবরোধের সমাপ্তি নিশ্চিত করে।



অতঃপর এমন অনেক গর্ব করার মতো বিষয়ের মতো বিহাচ অবরোধের শেষ দিনগুলোতে বাংলাদেশের ভূমিকাও লোকান্তরে হারিয়ে গেছে…।