বসনিয়ার যুদ্ধে যোগ দিয়ে যেভাবে বাংলাদেশ ‘অভিযুক্ত’ এবং অবরুদ্ধ হয়েছিলো
বসনিয়ার যুদ্ধে যোগ দিয়ে যেভাবে বাংলাদেশ ‘অভিযুক্ত’ এবং অবরুদ্ধ হয়েছিলো

বসনিয়ার যুদ্ধের কথা আমরা অনেকেই জানি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এটিই ছিলো বিশ্বের প্রথম বড় সামরিক সংঘাত। এই সংঘাতের প্রায় পুরোটা জুড়েই বসনিয়াক মুসলিমদের গণহত্যা ঠাঁসা থাকলেও এর মূলে ছিলো একটি নোংরা ভূরাজনৈতিক খেলা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা অক্ষ কতৃক সাবেক সোভিয়েত সাম্রাজ্যের আঙ্গিনা বলকান উপদ্বীপে প্রবেশের চেষ্টার বিভিন্নমুখী তৎপরতার বহিঃপ্রকাশ ছিলো বলকান যুদ্ধ। সেই খেলায়ও যেমন মুসলিমরা ঢালে পরিণত হয়েছিলো, তার দুই দশক পর আরাকানেও হুবহু একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে দুটিতেই বাংলাদেশ জড়িত হয়েছে।
.
এরমধ্যে বসনিয়ায় জড়িত হওয়াটা বিস্ময়ের উদ্রেককারী হলেও সত্যি হচ্ছে, বাংলাদেশ কেবল জড়িতই হয়নি, একটা সময় পর্যন্ত হানাদার সার্ব মিলিটারী, এমনকি পশ্চিমা মিডিয়া পর্যন্তও সন্দেহ করেছে যে, জাতিসংঘের পতাকা নিয়ে গেলেও বাংলাদেশ ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে সার্বদের বিরুদ্ধে বসনিয়ার বাহিনীকে সাহায্য করে একটি শহরে তিন বছর ধরে চলা সার্ব অবরোধ ব্যহত করেছে! এর জন্য ১২০০ সৈন্যের বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টকে তীব্র গোলাগুলিতে প্রায় দশ সপ্তাহের অবরোধে আটকে থাকতে হয়, এবং মারাত্মক রসদ ও সরঞ্জাম সংকটে ভুগতে হয়!
.
বস্তুত, বসনিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ন্যাটো দেশগুলো সীমিত মাত্রায় শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করছিলো। তবে ১৯৯৩ নাগাদ যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো বসনিয়া থেকে সরে পড়তে থাকে। তখন আমেরিকা ধর্মীয় অনুভূতির সুবিধা কাজে লাগাতে মুসলিম দেশগুলো থেকে জাতিসংঘের আওতায় শান্তিরক্ষী বসনিয়ায় পাঠানোর চেষ্টা শুরু করে। ১৯৯৩ সালে এমনই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি কন্টিনজেন্ট বসনিয়ায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। বাংলাদেশ আর্মির কয়েকজন অফিসার রেকোনাইসেন্স মিশনে তখন বসনিয়ার আশেপাশে ঘুরেও আসেন।
.
কিন্তু বসনিয়ায় তৃতীয় কোন মুসলিম দেশ থেকে সেনা পাঠানোর বিষয়টি এতো সরল ছিলোনা। খোদ ইউরোপীয় দেশগুলোই বলকানের মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে অন্য কোন মুসলিম দেশের সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেখতে রাজী ছিলোনা। ঐতিহাসিক ভীতি ছাড়া এর পেছনে কোন বাস্তব কারণ ছিলো বলে মনে হয়না।

প্রাথমিক বাঁধায় বাংলাদেশ থেকে সেনা বসনিয়ায় পাঠানো যায়নি। যে ব্যাটালিয়নটিকে বসনিয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিলো, তাকে পরে কুয়েতে পাঠানো হয়।
.
১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি বসনিয়ার পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে পড়লে এবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কোন প্রস্তাব উত্থাপন না করেই বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া থেকে সৈন্য পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। বাংলাদেশকে মাত্র ৪৫ দিনের নোটিশে একটি মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন প্রস্তুত করতে বলা হয়।


মেকানাইজড ইনফ্যান্ট্রির প্রধান উপাদান এপিসি। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ আজকের মতো ভুরিভুরি এপিসির মালিক ছিলোনা। এছাড়াও বলকানের তীব্র ও আদ্রতায় পূর্ণ শীতে যুদ্ধ দূরে থাক, থাকার অভিজ্ঞতাও বাংলাদেশী সৈন্যদের ছিলোনা।
.
এই সমস্যা নিরসনে সোভিয়েত আমলে স্লোভাকিয়ায় চালু হওয়া সাবেক পূর্ব জার্মান সেনাবাহিনীর একটি ওয়ারহাউস থেকে রসদ, শীতের কাপড় এবং অস্ত্রের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।

১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশী কন্টিনজেন্ট প্রথম বসনিয়ায় প্রবেশ করে। এই কন্টিনজেন্টে ছিলো একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, এবং একটি করে ওয়ার্কশপ, লজিস্টিকস সাপোর্ট, মেডিকেল ও সিগনাল ডিটাচমেন্ট। কর্নেল সেলিম আখতারের নেতৃত্বাধীন ১২০০ লোকবলের এই কন্টিনজেন্টের উপর দেয়া হয়
.
১৯৯২ সাল থেকে সার্বিয়ার অবরোধের সম্মুখীন হওয়া বিহাচ শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব। বিহাচ মূলত চারিদিকে খ্রীষ্টান অধ্যুষিত একটি ছোট্ট মুসলিম ছিটমহল। এখানে বসনিয়ানরা স্বভাবতই চাপে ছিলো এবং সার্বরা অবরোধ কষছিলো। বিহাচে কিছুদিন আগেও একটি ফরাসী ব্যাটালিয়ন ছিলো, যারা আর এখানে থাকতে চাচ্ছিলো না। তারা উইথড্র করার পর যুদ্ধ আর অবরোধে পস্ত বিহাচে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

💣 বাংলাদেশী ফোর্স গমনে হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে গেলো 💣
তিন বছর অবরুদ্ধ থাকার পর বসনিয়ান বাহিনী সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সার্বদের উপর তীব্র আক্রমণ হানে। এই হামলায় সার্বরা পরাজিত হয়। বিহাচের আশেপাশে বেশ কিছু সার্ব জমি বসনিয়ানরা কেবল দখলই করেনি, তাদের তীব্র হামলার মুখে পলায়নপর সার্বদের ফেলে যাওয়া হাতিয়ারসম্ভারও তারা দখলে নিয়ে নেয়।
.
এই ঘটনার পর সার্ব বাহিনী ধরে নেয় তাদের এহেন বিপর্যয়ের পেছনে বাংলাদেশ থেকে সদ্য আগত বাহিনীর ভূমিকা আছে, যাদের সকলেই মুসলিম। এমনকি এই সময়ে জাতিসংঘের নিয়োগকৃত পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরাও সন্দেহ করতে শুরু করে, বাংলাদেশ আর্মির উপস্থিতিই বসনিয়ান বাহিনীকে সার্বদের উপর হামলা করে তাদের খেদিয়ে দিতে সহায়তা করেছে। পশ্চিমা মিডিয়াও সেসময় বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের বিরুদ্ধে নেতিবাচক খবর প্রচার শুরু করেছিলো বলে ফোর্স কমান্ডার বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সেলিম আখতার জানান।
.
যাহোক, বিপর্যয়ের শিকার হবার পর সার্ব বাহিনীর নতুন লক্ষ্যবস্তু হয় বাংলাদেশী কন্টিনজেন্ট। সার্বরা প্রথমে বাংলাদেশীদের উপর তীব্র অবরোধ আরোপ করে। এমনকি হেলিকপ্টারেও খাদ্য ও রসদ সরবরাহের পথও রূদ্ধ হয়ে যায়।

এরইমধ্যে ডিসেম্বরে সার্বরা এন্টি ট্যাংক মিসাইল সহ বাংলাদেশী সেনাদের উপর হামলা করলে ইসমাইল নামে একজন সৈনিক শহীদ হন এবং আরো তিন সৈনিক আহত হয়।
.
এদিকে বাংলাদেশী সৈন্যদের বিহাচে অবরুদ্ধ ও হামলার সম্মুখীন হবার ঘটনায় বাংলাদেশে ব্যাপক উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়। ঢাকায় সেনা সদর থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা এবং অবরুদ্ধ বাংলাদেশী ফোর্স কমান্ডারকে প্রয়োজনীয় নসিহত দেয়ার কাজ চলতে থাকে। এমনকি বাংলাদেশী বাহিনীকে দ্রুত উদ্ধারের দাবী জানিয়ে রাস্তায় বিক্ষোভের আয়োজনও করা হয়।
.
তখন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অভিযান ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার ফজলুর রহমান। তিনি কর্নেল সেলিম আখতারের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার পাশাপাশি ঢাকাস্থ মার্কিন ও সৌদি মিলিটারী অ্যাটাশের সাথে যুক্ত থাকেন। আমেরিকা ও সৌদি আরবের মাধ্যমে ন্যাটো ও ওআইসির মাধ্যমে বাংলাদেশী সৈন্যদের অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে বাংলাদেশ। এই প্রক্রিয়ার উপর এপি একটি প্রতিবেদন করে, যার ভিডিও ফুটেজ এখানে দিলাম- https://youtu.be/c80r5IoJRa8
..
প্রায় দশ সপ্তাহ অবরোধে বাংলাদেশী সৈন্যরা উচ্চতর সাহস ও দৃঢ়তার নজির স্থাপন করে। তারা খাদ্য ও রসদ সংকটে কাবু হয়ে পড়লেও সার্বদের তাদের উপর চেপে বসতে দিচ্ছিলো না। একবার এক তরুণ ক্যাপ্টেন তার এপিসির টিম নিয়ে বসনিয়ান পজিশনের কাছে অবস্থান নিতে গেলে সার্বরা তীব্র আক্রমণ চালায়। তবে তারপরও ওই বাংলাদেশী ক্যাপ্টেন স্বীয় অবস্থান ত্যাগ করেননি। সাধারণত কোন ভাড়াটে মিশনে এমন দৃঢ়তা দেখা যায়না।
.
অবরোধ শেষ হয় ন্যাটো বিমান হামলার ঘনঘটার মাধ্যমে। ন্যাটো প্রথমে ব্যাপক বিমান হামলার প্রস্তাব করলেও বাংলাদেশের প্রস্তাবে বিহাচে নির্বিচার বোমা হামলার বদলে কেবল সার্ব অবস্থান লক্ষ্য করে এয়ার স্ট্রাইক করে ন্যাটো। এতে করে বিহাচের মুসলিম অধিবাসী এবং বসনিয়ান সৈন্যরা অপ্রয়োজনীয় রক্তক্ষরণ থেকে রক্ষা পায়। একই সাথে হানাদার সার্বদের মনোবলে চিড় ধরায় ওই বিমান হামলা। যা কয়েকমাস পর বিহাচ থেকে চার বছর ধরে চলা সার্ব অবরোধের সমাপ্তি নিশ্চিত করে।



অতঃপর এমন অনেক গর্ব করার মতো বিষয়ের মতো বিহাচ অবরোধের শেষ দিনগুলোতে বাংলাদেশের ভূমিকাও লোকান্তরে হারিয়ে গেছে…।
প্রাচীনতম ৫ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র
বায়তুল হিকমাহ 

প্রাচীনতম ৫ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র

১. বায়তুল হিকমাহ 
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সাড়া জাগানো ও প্রভাবশালী জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র বায়তুল হিকমাহ বা জ্ঞানের ভাণ্ডার। একটি অনুবাদকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ক্রমেই তা উচ্চতর গবেষণাকেন্দ্রশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মানমন্দিরে পরিণত হয়। আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ বাগদাদে তা প্রতিষ্ঠা করেন।

আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মানসুর গ্রিক জ্ঞান ও দর্শনের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তাঁর নির্দেশে চিকিৎসা,জ্যোতির্বিদ্যাপ্রকৌশল ও সাহিত্যের বইগুলো অনুবাদ করা হয়। তিনি রাজপ্রাসাদে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। হারুনুর রশিদ খলিফা হওয়ার পর তা সাধারণ পাঠকআলেম ও শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। নিজেও বৃদ্ধি করেন সংগ্রহশালা।

খলিফা মামুন বায়তুল হিকমাহকে পূর্ণতা দান করেন। তিনি রোমপারস্য ও ভারতবর্ষ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান,ইতিহাস ও সাহিত্যের দুর্লভ বই সংগ্রহ করে অনুবাদ ও তার ভিত্তিতে গবেষণার নির্দেশ দেন। খলিফা মামুন নিজেও বায়তুল হিকমার দৈনন্দিন কাজে অংশ নিতেন। তাঁর আমলে বায়তুল হিকমায় জ্যোতির্বিদ্যাদর্শন,চিকিৎসা ও সাহিত্যের ওপর অসংখ্য বই অনূদিত ও রচিত হয়।

খলিফা মামুনের যুগকেই বায়তুল হিকমার স্বর্ণযুগ বলা হয়। তবে তার পরও বায়তুল হিকমার কার্যক্রম অব্যাহত। ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলীয় শাসক হালাকু খান বাগদাদ দখল করার পর বায়তুল হিকমা ধ্বংস করে। তার সংগ্রহগুলো দজলা নদীতে নিক্ষেপ করে। অবশ্য অবরোধের আগেই নাসিরুদ্দিন তুসি চার লাখ বই সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হন।

হালাকু খান বায়তুল হিকমার বই নদীতে ফেলেই থামেনিবরং তাতে অগ্নিসংযোগও করে। এতে বায়তুল হিকমার মূল্যবান সংগ্রহশালা ধ্বংস হয়ে যায়। কথিত আছেবায়তুল হিকমা ও অন্যান্য পাঠাগারের বইয়ের কালিতে তখন দজলা-ফোরাতের পানি কালো হয়ে যায়।

বায়তুল হিকমার কার্যক্রম কয়েক ভাগে বিভক্ত ছিল। যেমন :
১. অনুবাদকেন্দ্র। বিভিন্ন ভাষা থেকে বইগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হতো। ইউহান্না বিন মাসাউয়্যা,জিবরিল বিন বাগতিশু ও হুনাইন বিন ইসহাক ছিলেন অনুবাদকেন্দ্রের অন্যতম অনুবাদক।
২. পাঠাগার। সংগৃহীতঅনূদিত ও রচিত বইগুলো সংরক্ষণ করাই ছিল তার মূল কাজ।
৩. মাদরাসা। শিক্ষার্থীদের পাঠদানবুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও বিতর্কের আয়োজনগবেষণাকাজ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল মাদরাসা।
৪. মানমন্দির। জ্যোতির্বিদ্যার ওপর উচ্চ গবেষণার জন্য এটি নির্মাণ করা হয়।

বায়তুল হিকমার অন্যতম অংশ ছিল মানমন্দির ও মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র। এটিই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মানমন্দির ও মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র। খলিফা মামুনের নির্দেশে ২১৪ হিজরিতে এই মানমন্দিরের নির্মাণকাজ শেষ হয়। খলিফা মামুন দামেস্কেও অনুরূপ একটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। গ্রিক মানমন্দিরের আদলে তা নির্মাণ করা হয় এবং গ্রিক মানমন্দিরে ব্যবহৃত উপকরণ বায়তুল হিকমায় স্থাপন করা হয়। ইয়াহইয়া ইবনে আবি মানসুরআব্বাস জাওহারিসিন্দ বিন আলীআবু সাহাল ফজলমুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমি প্রমুখ গবেষককে মানমন্দিরে নিয়োগ দেওয়া হয়।

মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চায় বায়তুল হিকমা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। অবশ্য ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চিন্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করাসাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি এবং মুসলিম জাতির মধ্যে আদর্শিক উপদল ও উপদলীয় কোন্দলের পথ তৈরির জন্যও বায়তুল হিকমাকে দায়ী করা হয়। বায়তুল হিকমার কার্যক্রমের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করেন খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ। তবে তারপর হালাকু খানের হাতে ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ৩২ জন খলিফার সবাই বায়তুল হিকমার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।


২. কারাউইন পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়
উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ কোনটিতা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় যে মরক্কোর কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে পৃথিবীতে আরো একাধিক উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে শিক্ষার যে কাঠামোকে বোঝানো হয়তা প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় মরক্কোর ফেজ নগরীতে। ফাতিমা নামের একজন মুসলিম নারী বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনন্য গৌরব অর্জন করেন।

জাতিসংঘের শিক্ষাবিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে এবং মুসলিম প্রতিষ্ঠিত কারাউইনকে পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।


মরক্কোর ফেজ নগরীতে প্রাচীনতম এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। একজন ধনাঢ্য বিধবা নারী ফাতিমা আল ফিহরি তা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে কারাউইন নামে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তী সময়ে তার আঙিনায়ই গড়ে তোলা হয় একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাবিদ্যা থেকে শুরু করে ইতিহাস-ভূগোল ও জ্যোতির্বিদ্যার মতো বিষয়ে পাঠদান করা হতো। আরব-আফ্রিকা-ইউরোপের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করত।

১৯১৩-৫৬ সাল পর্যন্ত ঔপনিবেশিক আমলে ফ্রান্স পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ও সনদ বিতরণ বন্ধ করে দেয় এবং শিক্ষার্থীদের সব রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। ১৯৫৬ সালে মরক্কো স্বাধীনতা লাভ করার পর কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন বাদশা মুহাম্মদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতপদার্থরসায়নসহ বিভিন্ন বিজ্ঞান বিভাগ ও আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলেন। ১৯৫৭ সালে খোলা হয় নারীশিক্ষার্থী বিভাগ। ১৯৬৩ সালে কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে মরক্কোর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বর্তমানে কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১১০০ শিক্ষককর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন এবং প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন।


৩. সোনারগাঁয়ে উপমহাদেশের প্রথম হাদিসচর্চা কেন্দ্র

উচ্চশিক্ষার জন্য এখনো বিদেশমুখী বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। সেটা যেমন সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে সত্যতেমনি সত্য ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও। কিন্তু একটা সময় এমন ছিলযখন আমাদের দেশেই উচ্চশিক্ষার জন্য আসত দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীরা। তারা আসত হাদিসশাস্ত্রের উচ্চতর জ্ঞানার্জনের জন্য। কারণবাংলার জমিনেই প্রথম স্থাপিত হয় উপমহাদেশের প্রথম হাদিসচর্চা কেন্দ্র। প্রাচীন এই শিক্ষাকেন্দ্রটি গড়ে তুলেছিলেন শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা বুখারি আদ-দেহলভি আল হানাফি রহমতুল্লাহি আলাইহি। আনুমানিক ১২৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং একটি সমৃদ্ধ ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

শায়খ আবু তাওয়ামার জন্মস্থান নিয়ে দুটি মত পাওয়া যায়। কারো মতেতিনি পারস্যের বুখারা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। আর কারো মতেতাঁর জন্মভূমি ইয়েমেন। হাদিস,ফিকহসহ অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি ভূগোল,গণিতরসায়ন ও যুক্তিবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি দিল্লির সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনের অনুরোধে ১২৭০ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ৬৬৮ হিজরিতে ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসারে দিল্লি আগমন করেন। অতঃপর সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহর অনুরোধে বাংলায় আসেন।

গিয়াসুদ্দিন আজম শাহর সহযোগিতায় তিনি রাজধানী সোনাগাঁয়ে একটি বৃহৎ মাদরাসা ও সমৃদ্ধ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। উপমহাদেশের দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞানার্জনের জন্য ছুটে আসত। একসময় মাদরাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজারে।

শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা দীর্ঘ ২৩ বছর এই সোনারগাঁ মাদরাসায় অধ্যাপনা করেন। মাদরাসায় অধ্যাপনাকালে ছাত্রদের উদ্দেশে ফিকহ বিষয়ে তিনি যেসব বক্তৃতা দিয়েছেনসেগুলোর একটি ফারসি সংকলন এখনো পাওয়া যায়। নামায়ে হক’ নামের এই সংকলনটি ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে মুম্বাই থেকে এবং ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে কানপুর থেকে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তাঁর লিখিত পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ জাদুঘরের আর্কাইভ ভবনে রক্ষিত আছে বলে জানা যায়।

শায়খ আবু তাওয়ামা  ৭০০ হিজরি মোতাবেক ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁয়ে ইন্তেকাল করেন এবং বাংলার মাটিতেই তাঁকে দাফন করা হয়। তবে বর্তমানে সংরক্ষণের অভাবে উপমহাদেশের প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ হারিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঐতিহাসিক এই বিদ্যাপীঠের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করে ফেলা হয়


৪. বাগদাদের বিখ্যাত নিজামিয়া মাদরাসা
ইসলামের ইতিহাসে প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠগুলোর অন্যতম বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসা। ইরানের সেলজুক বংশের শাসক উলুপ আরসালানের বিখ্যাত প্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামুল মুলক তুসি এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা। ৪৫৯ হিজরি মোতাবেক ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে নিজামিয়া মাদরাসার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। খাজা নিজামুল মুলক এই মাদরাসা নির্মাণে দুই লাখ স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করেন। ১০ জিলহজ ৪৫৯ হিজরি সনে নিজামিয়া মাদরাসা আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।

বাগদাদ নগরীর দজলা নদীর তীরে রুসাফা নামক স্থানে এই মাদরাসা স্থাপন করা হয়।

নিজামিয়া মাদরাসায় সমকালীন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হতো। খলিফারা এই মাদরাসাকে নিজেদের জন্য গর্ব মনে করতেন এবং যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরিশোধ করা হতো। ৫০৪ হিজরি মাদরাসায়ে নিজামিয়ার সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়। 

নিজামুল মুলক মাদরাসায়ে নিজামিয়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলেন। যেখানে ছাত্রদের আবাসনের সব ব্যবস্থা রাখা হয়। ছাত্রদের জন্য তৈরি করা হয় ছাত্রাবাসপৃথক পাঠকক্ষরান্নাঘরপানির হাউস ও কূপগুদামঘরপাঠাগার ও মসজিদ।

মূল শিক্ষা ভবনটি পবিত্র কাবাঘরের আদলে চতুর্ভুজ আকৃতিতে তৈরি করা হয়। মাঝখানে রাখা হয় বিস্তৃত উঠোন।

শত যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যেও মাদরাসায়ে নিজামিয়া টিকে ছিল শত শত বছর ধরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৪ সালে নিজামিয়া মাদরাসা পরিত্যক্ত হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সড়ক সম্প্রসারণের নামে ঐতিহাসিক এই বিদ্যাপীঠের শেষ স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করা হয়।

শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে নিজামিয়া মাদরাসার প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। নিজামুল মুলক মাদরাসায়ে নিজামিয়ার জন্য একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার গড়ে তোলেন। তাঁর আমলেই পাঠাগারে ১০ হাজারেরও বেশি দুর্লভ বইয়ের সংগ্রহ ছিল। ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলীয়রা বাগদাদ দখলের পর পাঠাগারটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।

৫. মিসরের হাজার বছরের আল-আজহার

মিসরের আল-আজহার পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। তবে প্রতিষ্ঠাকালে আল-আজহার কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না।

৯৭৫ সালে আল-আজহারকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। এখানে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি পাঠদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠাকালে আল আজহারের বিভাগ ছিল মাত্র পাঁচটি। সেগুলো হলোইসলামী ধর্মতত্ত্বআইন,আরবি ভাষা ও সাহিত্যজ্যোতির্বিজ্ঞানইসলামিক দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা।

১৯৬১ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসের আল-আজহারকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন। তিনি আল আজহারের পাঠ্যক্রমে হিসাববিজ্ঞানঅর্থনীতিবিজ্ঞানপ্রকৌশল ও কৃষির মতো আধুনিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেন। নারী শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেন।

বর্তমানে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৭টি অনুষদ রয়েছেযার ৪০টি মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য এবং ৪৭টি ছেলে শিক্ষার্থীদের জন্য। আল আজহারের ১৫ হাজার ১৫৫টি শ্রেণিকক্ষে ৩০ হাজার শিক্ষক পাঠদান করেন এবং পাঠ গ্রহণ করেন পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ২০ শতাংশই বিদেশি। বর্তমানে ১০২টি দেশের এক লাখ শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়নরত।

নিজস্ব ক্যাম্পাসের বাইরেও আল-আজহার মিসরের প্রায় চার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ লাখ। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের উপাধি প্রেসিডেন্ট। বর্তমান প্রেসিডেন্টের নাম ড. মোহাম্মদ হুসাইন মাহরাসাভি।

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে আল আজহারের রয়েছে সাতটি নিজস্ব হাসপাতাল। কায়রোর সবচেয়ে বড় বাগানের মালিকও আল-আজহার। ৩০ হাজার হেক্টর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বাগানে রয়েছে ৮০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ।