প্রাচীনতম ৫ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র
বায়তুল হিকমাহ 

প্রাচীনতম ৫ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র

১. বায়তুল হিকমাহ 
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সাড়া জাগানো ও প্রভাবশালী জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র বায়তুল হিকমাহ বা জ্ঞানের ভাণ্ডার। একটি অনুবাদকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ক্রমেই তা উচ্চতর গবেষণাকেন্দ্রশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মানমন্দিরে পরিণত হয়। আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ বাগদাদে তা প্রতিষ্ঠা করেন।

আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মানসুর গ্রিক জ্ঞান ও দর্শনের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তাঁর নির্দেশে চিকিৎসা,জ্যোতির্বিদ্যাপ্রকৌশল ও সাহিত্যের বইগুলো অনুবাদ করা হয়। তিনি রাজপ্রাসাদে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। হারুনুর রশিদ খলিফা হওয়ার পর তা সাধারণ পাঠকআলেম ও শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। নিজেও বৃদ্ধি করেন সংগ্রহশালা।

খলিফা মামুন বায়তুল হিকমাহকে পূর্ণতা দান করেন। তিনি রোমপারস্য ও ভারতবর্ষ থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান,ইতিহাস ও সাহিত্যের দুর্লভ বই সংগ্রহ করে অনুবাদ ও তার ভিত্তিতে গবেষণার নির্দেশ দেন। খলিফা মামুন নিজেও বায়তুল হিকমার দৈনন্দিন কাজে অংশ নিতেন। তাঁর আমলে বায়তুল হিকমায় জ্যোতির্বিদ্যাদর্শন,চিকিৎসা ও সাহিত্যের ওপর অসংখ্য বই অনূদিত ও রচিত হয়।

খলিফা মামুনের যুগকেই বায়তুল হিকমার স্বর্ণযুগ বলা হয়। তবে তার পরও বায়তুল হিকমার কার্যক্রম অব্যাহত। ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলীয় শাসক হালাকু খান বাগদাদ দখল করার পর বায়তুল হিকমা ধ্বংস করে। তার সংগ্রহগুলো দজলা নদীতে নিক্ষেপ করে। অবশ্য অবরোধের আগেই নাসিরুদ্দিন তুসি চার লাখ বই সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হন।

হালাকু খান বায়তুল হিকমার বই নদীতে ফেলেই থামেনিবরং তাতে অগ্নিসংযোগও করে। এতে বায়তুল হিকমার মূল্যবান সংগ্রহশালা ধ্বংস হয়ে যায়। কথিত আছেবায়তুল হিকমা ও অন্যান্য পাঠাগারের বইয়ের কালিতে তখন দজলা-ফোরাতের পানি কালো হয়ে যায়।

বায়তুল হিকমার কার্যক্রম কয়েক ভাগে বিভক্ত ছিল। যেমন :
১. অনুবাদকেন্দ্র। বিভিন্ন ভাষা থেকে বইগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হতো। ইউহান্না বিন মাসাউয়্যা,জিবরিল বিন বাগতিশু ও হুনাইন বিন ইসহাক ছিলেন অনুবাদকেন্দ্রের অন্যতম অনুবাদক।
২. পাঠাগার। সংগৃহীতঅনূদিত ও রচিত বইগুলো সংরক্ষণ করাই ছিল তার মূল কাজ।
৩. মাদরাসা। শিক্ষার্থীদের পাঠদানবুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও বিতর্কের আয়োজনগবেষণাকাজ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল মাদরাসা।
৪. মানমন্দির। জ্যোতির্বিদ্যার ওপর উচ্চ গবেষণার জন্য এটি নির্মাণ করা হয়।

বায়তুল হিকমার অন্যতম অংশ ছিল মানমন্দির ও মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র। এটিই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মানমন্দির ও মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র। খলিফা মামুনের নির্দেশে ২১৪ হিজরিতে এই মানমন্দিরের নির্মাণকাজ শেষ হয়। খলিফা মামুন দামেস্কেও অনুরূপ একটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। গ্রিক মানমন্দিরের আদলে তা নির্মাণ করা হয় এবং গ্রিক মানমন্দিরে ব্যবহৃত উপকরণ বায়তুল হিকমায় স্থাপন করা হয়। ইয়াহইয়া ইবনে আবি মানসুরআব্বাস জাওহারিসিন্দ বিন আলীআবু সাহাল ফজলমুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমি প্রমুখ গবেষককে মানমন্দিরে নিয়োগ দেওয়া হয়।

মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চায় বায়তুল হিকমা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। অবশ্য ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চিন্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করাসাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি এবং মুসলিম জাতির মধ্যে আদর্শিক উপদল ও উপদলীয় কোন্দলের পথ তৈরির জন্যও বায়তুল হিকমাকে দায়ী করা হয়। বায়তুল হিকমার কার্যক্রমের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করেন খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ। তবে তারপর হালাকু খানের হাতে ধ্বংস হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন ৩২ জন খলিফার সবাই বায়তুল হিকমার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।


২. কারাউইন পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়
উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ কোনটিতা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় যে মরক্কোর কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে পৃথিবীতে আরো একাধিক উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে শিক্ষার যে কাঠামোকে বোঝানো হয়তা প্রথম প্রতিষ্ঠা পায় মরক্কোর ফেজ নগরীতে। ফাতিমা নামের একজন মুসলিম নারী বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনন্য গৌরব অর্জন করেন।

জাতিসংঘের শিক্ষাবিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে এবং মুসলিম প্রতিষ্ঠিত কারাউইনকে পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।


মরক্কোর ফেজ নগরীতে প্রাচীনতম এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। একজন ধনাঢ্য বিধবা নারী ফাতিমা আল ফিহরি তা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে কারাউইন নামে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তী সময়ে তার আঙিনায়ই গড়ে তোলা হয় একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাবিদ্যা থেকে শুরু করে ইতিহাস-ভূগোল ও জ্যোতির্বিদ্যার মতো বিষয়ে পাঠদান করা হতো। আরব-আফ্রিকা-ইউরোপের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করত।

১৯১৩-৫৬ সাল পর্যন্ত ঔপনিবেশিক আমলে ফ্রান্স পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ও সনদ বিতরণ বন্ধ করে দেয় এবং শিক্ষার্থীদের সব রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। ১৯৫৬ সালে মরক্কো স্বাধীনতা লাভ করার পর কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন বাদশা মুহাম্মদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতপদার্থরসায়নসহ বিভিন্ন বিজ্ঞান বিভাগ ও আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলেন। ১৯৫৭ সালে খোলা হয় নারীশিক্ষার্থী বিভাগ। ১৯৬৩ সালে কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়কে মরক্কোর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বর্তমানে কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১১০০ শিক্ষককর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন এবং প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন।


৩. সোনারগাঁয়ে উপমহাদেশের প্রথম হাদিসচর্চা কেন্দ্র

উচ্চশিক্ষার জন্য এখনো বিদেশমুখী বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। সেটা যেমন সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে সত্যতেমনি সত্য ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও। কিন্তু একটা সময় এমন ছিলযখন আমাদের দেশেই উচ্চশিক্ষার জন্য আসত দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীরা। তারা আসত হাদিসশাস্ত্রের উচ্চতর জ্ঞানার্জনের জন্য। কারণবাংলার জমিনেই প্রথম স্থাপিত হয় উপমহাদেশের প্রথম হাদিসচর্চা কেন্দ্র। প্রাচীন এই শিক্ষাকেন্দ্রটি গড়ে তুলেছিলেন শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা বুখারি আদ-দেহলভি আল হানাফি রহমতুল্লাহি আলাইহি। আনুমানিক ১২৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং একটি সমৃদ্ধ ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

শায়খ আবু তাওয়ামার জন্মস্থান নিয়ে দুটি মত পাওয়া যায়। কারো মতেতিনি পারস্যের বুখারা অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। আর কারো মতেতাঁর জন্মভূমি ইয়েমেন। হাদিস,ফিকহসহ অন্যান্য ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি ভূগোল,গণিতরসায়ন ও যুক্তিবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি দিল্লির সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনের অনুরোধে ১২৭০ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ৬৬৮ হিজরিতে ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসারে দিল্লি আগমন করেন। অতঃপর সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহর অনুরোধে বাংলায় আসেন।

গিয়াসুদ্দিন আজম শাহর সহযোগিতায় তিনি রাজধানী সোনাগাঁয়ে একটি বৃহৎ মাদরাসা ও সমৃদ্ধ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। উপমহাদেশের দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞানার্জনের জন্য ছুটে আসত। একসময় মাদরাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজারে।

শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা দীর্ঘ ২৩ বছর এই সোনারগাঁ মাদরাসায় অধ্যাপনা করেন। মাদরাসায় অধ্যাপনাকালে ছাত্রদের উদ্দেশে ফিকহ বিষয়ে তিনি যেসব বক্তৃতা দিয়েছেনসেগুলোর একটি ফারসি সংকলন এখনো পাওয়া যায়। নামায়ে হক’ নামের এই সংকলনটি ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে মুম্বাই থেকে এবং ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে কানপুর থেকে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তাঁর লিখিত পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ জাদুঘরের আর্কাইভ ভবনে রক্ষিত আছে বলে জানা যায়।

শায়খ আবু তাওয়ামা  ৭০০ হিজরি মোতাবেক ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁয়ে ইন্তেকাল করেন এবং বাংলার মাটিতেই তাঁকে দাফন করা হয়। তবে বর্তমানে সংরক্ষণের অভাবে উপমহাদেশের প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ হারিয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঐতিহাসিক এই বিদ্যাপীঠের স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করে ফেলা হয়


৪. বাগদাদের বিখ্যাত নিজামিয়া মাদরাসা
ইসলামের ইতিহাসে প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠগুলোর অন্যতম বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসা। ইরানের সেলজুক বংশের শাসক উলুপ আরসালানের বিখ্যাত প্রধানমন্ত্রী খাজা নিজামুল মুলক তুসি এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা। ৪৫৯ হিজরি মোতাবেক ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে নিজামিয়া মাদরাসার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। খাজা নিজামুল মুলক এই মাদরাসা নির্মাণে দুই লাখ স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করেন। ১০ জিলহজ ৪৫৯ হিজরি সনে নিজামিয়া মাদরাসা আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।

বাগদাদ নগরীর দজলা নদীর তীরে রুসাফা নামক স্থানে এই মাদরাসা স্থাপন করা হয়।

নিজামিয়া মাদরাসায় সমকালীন আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হতো। খলিফারা এই মাদরাসাকে নিজেদের জন্য গর্ব মনে করতেন এবং যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরিশোধ করা হতো। ৫০৪ হিজরি মাদরাসায়ে নিজামিয়ার সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়। 

নিজামুল মুলক মাদরাসায়ে নিজামিয়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলেন। যেখানে ছাত্রদের আবাসনের সব ব্যবস্থা রাখা হয়। ছাত্রদের জন্য তৈরি করা হয় ছাত্রাবাসপৃথক পাঠকক্ষরান্নাঘরপানির হাউস ও কূপগুদামঘরপাঠাগার ও মসজিদ।

মূল শিক্ষা ভবনটি পবিত্র কাবাঘরের আদলে চতুর্ভুজ আকৃতিতে তৈরি করা হয়। মাঝখানে রাখা হয় বিস্তৃত উঠোন।

শত যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যেও মাদরাসায়ে নিজামিয়া টিকে ছিল শত শত বছর ধরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৪ সালে নিজামিয়া মাদরাসা পরিত্যক্ত হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সড়ক সম্প্রসারণের নামে ঐতিহাসিক এই বিদ্যাপীঠের শেষ স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করা হয়।

শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে নিজামিয়া মাদরাসার প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। নিজামুল মুলক মাদরাসায়ে নিজামিয়ার জন্য একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার গড়ে তোলেন। তাঁর আমলেই পাঠাগারে ১০ হাজারেরও বেশি দুর্লভ বইয়ের সংগ্রহ ছিল। ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গলীয়রা বাগদাদ দখলের পর পাঠাগারটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।

৫. মিসরের হাজার বছরের আল-আজহার

মিসরের আল-আজহার পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। তবে প্রতিষ্ঠাকালে আল-আজহার কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না।

৯৭৫ সালে আল-আজহারকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। এখানে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি পাঠদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠাকালে আল আজহারের বিভাগ ছিল মাত্র পাঁচটি। সেগুলো হলোইসলামী ধর্মতত্ত্বআইন,আরবি ভাষা ও সাহিত্যজ্যোতির্বিজ্ঞানইসলামিক দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা।

১৯৬১ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসের আল-আজহারকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন। তিনি আল আজহারের পাঠ্যক্রমে হিসাববিজ্ঞানঅর্থনীতিবিজ্ঞানপ্রকৌশল ও কৃষির মতো আধুনিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেন। নারী শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেন।

বর্তমানে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৭টি অনুষদ রয়েছেযার ৪০টি মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য এবং ৪৭টি ছেলে শিক্ষার্থীদের জন্য। আল আজহারের ১৫ হাজার ১৫৫টি শ্রেণিকক্ষে ৩০ হাজার শিক্ষক পাঠদান করেন এবং পাঠ গ্রহণ করেন পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ২০ শতাংশই বিদেশি। বর্তমানে ১০২টি দেশের এক লাখ শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়নরত।

নিজস্ব ক্যাম্পাসের বাইরেও আল-আজহার মিসরের প্রায় চার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ লাখ। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানের উপাধি প্রেসিডেন্ট। বর্তমান প্রেসিডেন্টের নাম ড. মোহাম্মদ হুসাইন মাহরাসাভি।

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে আল আজহারের রয়েছে সাতটি নিজস্ব হাসপাতাল। কায়রোর সবচেয়ে বড় বাগানের মালিকও আল-আজহার। ৩০ হাজার হেক্টর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বাগানে রয়েছে ৮০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ।
ইসলামি সভ্যতায় প্রাচীন গ্রন্থাগার: সূচনা ও ক্রমবিকাশ
ইসলামি সভ্যতায় প্রাচীন গ্রন্থাগার: সূচনা ও ক্রমবিকাশ

ইসলাম-পূর্ব আরব উপদ্বীপে নিরক্ষরতার বিস্তার সত্ত্বেও আরবদের লিপি-শিল্পের ‘ধারণা’র বিষয়ে ঐতিহাসিক বহু প্রমাণ মেলে। ইবনুন নাদীম (মৃ. ৩৮০ হি.) তার ‘আল ফিহরিসতে’ আলোকপাত করেন যে, আরবরা তৎকালে হাবাশি লিপি-শৈলীতে অভ্যস্ত ছিল। এ ছাড়াও দক্ষিণ উপদ্বীপাঞ্চলীয় গোত্র সাবা এবং হিময়ারের লিপি-ধারাতেও তাদের কেউ কেউ পারঙ্গম ছিল বলে জানা যায়।

কাগজপত্তর-যাত্রা
প্রাক-ইসলাম যুগ থেকে পরবর্তী কালে বহুদিন লিপিকলার প্রধানতম উপাদান ছিলো কাষ্ঠ-ফলক, খেজুর বৃক্ষ, হাড়, শুকনো চামড়া প্রভৃতি। প্রথম দিকে ওহীও এভাবেই লেখা হতো। মাক্কী আস সিবাঈ’র ভাষায়, হাবীবুল্লাহ হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতিহাসের সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি জাজিরাতুল আরবে সিল-মোহর পদ্ধতি চালু করেন। এরপর নথিপত্র আদান-প্রদানে এর বহুল ব্যবহার শুরু হয়।কিছুকাল এভাবেই চলে।

একটা সময়ে আরবরা চিনাদের থেকে কাগজ ব্যবহার এবং এর রকমফের সৃষ্টি-শিল্পের প্রশিক্ষণ নেয়। ফলে তাদের শিক্ষা ও লেখনীতে বিশাল বিপ্লবের সৃষ্টি হয়। বিস্তর পরিসরে ইসলামী বিশ্বে লিপি-শিল্পের ক্রমবিকাশ ঘটে। ‘সিনাআতুল ওয়ারাক’ বাগদাদেও পৌছে যায়। আব্বাসী মন্ত্রী জাফর বিন ইয়াহয়া বুরমাকী রাষ্ট্রীয় সকল লেনদেনে ‘রুকুক’ তথা চামড়ার মুদ্রার পরিবর্তে কাগুজে মুদ্রা প্রতিকল্পন করার আদেশ দেন। কাগজের প্রসার ও শিল্প-বিকাশের সঙ্গে রুকুক এবং প্যাপিরাসের তুলনায় এর মূল্যও সহনীয় মাত্রায় নেমে আসে।বড় বড় শহরগুলোতে কাগজ-শিল্প ছড়িয়ে পড়ে।কিতাবাদীর বাজার রমরমা হয়ে ওঠে।


বলা চলে, দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগ থেকেই কাগুজে সাংস্কৃতিক বানিজ্য একটি জনপ্রিয় রূপ ধারণ করে।

কাগজের লিখিয়েদের নাম দেওয়া হয় ‘ওয়াররাক’ বহু বচন হলে ‘ওয়াররাকিন’। দারুল খিলাফাতে তাদের স্বতন্ত্র স্থান এবং ব্যবসায়-নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রাখেন।

বাগদাদে এক মুহূর্তের জন্য হলেও আগমন করেছেনে এমন সব বরেণ্য ব্যাক্তিদের নিয়ে লেখা প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ ‘তারিখু বাগদাদ'; যার গ্রন্থপ্রণেতা হলেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস খতীব আবু বকর আল বাগদাদী (মৃ. ৪৬৩ হি.)। বহু জায়গায় তিনি ঐতিহাসিক সূত্র-পরম্পরা প্রমাণে শুধু এসব ব্যবসায়ী ওয়াররাকদের বর্ণনাকেই ভিত্তিমূল ঠাওর করেছেন। ইতিহাসজ্ঞ মোহাম্মাদ শা'বান আয়্যুব ৮৫০টি জায়গা চিহ্নিত করেছেন। তবে আরো বহু স্থান রয়ে গেছে শা'বান আয়্যুবের গণনার বাইরে।
স্বয়ং ইবনুন নাদীম (মৃ. ৩৮০হি.) ছিলেন চতুর্থ শতকের একজন বিশিষ্ট ওয়াররাক। যিনি প্রাচীন আরবীয় বায়োগ্রাফিক গ্রন্থ ‘আল ফিহরিস’ প্রণেতা। লাইব্রেরি সংরক্ষণ, পরিশীলন, নুসখা প্রতিলিপি করণ এবং সবশেষ-পেশাদারিত্বের তাগিদে গ্রন্থ ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্য দিয়েই তিনি লিখে ফেলেছেন এই বিখ্যাত কিতাব; যা আজও মুসলিম মনিষীদের কাছে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্বকোষ বলা চলে একে। ইবনুন নাদীম তার কাল পর্যন্ত অস্তিত্বে আসা কত বর্ণ-মতাদর্শ, সভ্যতা ও গ্রন্থমালার হিসাব এখানে কষেছেন, পাঠক কিতাবটির পাতা উল্টালেই তা বুঝতে সক্ষম হবেন।


শরিয়াহ, আইন, ব্যাকরণ, ভাষা, ইতিহাস, আখবার, অনুপাত, ফিকহ, হাদিস, দর্শন, প্রকৃতি ও রসায়ন-বিজ্ঞানসহ সহস্র বিষয় টেনে এনেছেন এখানে। এমনকি কল্প কাহিনী, মনস্তত্ত্ব ও জাদু-টোনা বিষয়ে লিখিত কিতাবাদী নিয়েও আলাপ করেছেন দীর্ঘ। শাখাগত মাসালায় অনুসরণীয় ‘মাযাহেব ও ইতিকাদাত’ বিষয়ে তো লিখেছেন-ই।
গণ-গ্রন্থাগার
ইসলামী সভ্যতায় মাকতাবার (লাইব্রেরী) গুরুত্ব অপরিসীম। পাঠ-পঠনে সবকালেই আলোকবর্তিকার ভূমিকা রেখেছ এসব মাকতাবা। আমির-উমারা ছাড়াও সমাজে ধর্মীয়-মূল্যবোধ লালন করেন—এমন বহু বিত্তশালী মানুষ মাকতাবা প্রতিষ্ঠা এবং সচল রাখার পেছনে অসামান্য ভূমিকা রেখে এসেছেন সব যুগে।

বিশেষত যখন আমাদের আজকের প্রযুক্তি তাদের হাতে ছিল না। ছাপার হরফে কোন কিতাব দেখার সুযোগ তাদের হতো না কখনো; বহু টাকার বিনিময়ে ওয়াররাকদের থেকে নুসখার প্রতিলিপি করিয়ে নিতে হতো,সর্বসাধারণের জন্য যা কষ্টসাধ্য ছিলো অবশ্যই। সে সময়ে জ্ঞান-চর্চার মাধ্যম হিসেবে একটা গণ-গ্রন্থাগারের কী ভূমিকা হতে পারে,তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ক্ষুদে ক্ষুদে চিন্তা থেকেই কিন্তু বৃহৎ পরিসরের পাবলিক লাইব্রেরিগুলো প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

মাকতাবার বহু রূপ, শৈলী ও ধরনের সঙ্গে ইসলামী সভ্যতা পরিচিত সেই আদিকাল থেকেই। ইসলামী দেশগুলোর বলতে গেলে প্রায় সব শহরেই এই মাকতাবার ইতিহাস পাওয়া যায়। সেটা চাই ক্ষুদ্র হোক কিংবা বড়...।

একাডেমিক গ্রন্থাগার
এটা ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত গ্রন্থাগারের ধারা। এর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ হলো-বাগদাদের ‘বাইতুল হিকমাহ’। ফাতেমীদের সময় ছিল কায়রোতে 'দারুল হিকমাহ'। এর পরে আসে ‘বিশেষ’ গ্রন্থাগারের আলাপ। এই প্রকার গ্রন্থাগারের বিস্তর প্রসার ঘটেছিলো গোটা বিশ্বে। উল্লেখযোগ্য হলো খলিফা মুসতানসিরের মাকতাবা। ফাতাহ বিন খাকানের মাকতাবা। যাহাবী তারিখুল ইসলামে তার সম্পর্কে লেখেন, ‘বিন খাকাব হাটতেন, আস্তিনে কিতাব থাকতো, ইচ্ছে হলে চোখ বুলাতেন।’ বলা চলে অনেকটা স্বতন্ত্র ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার।

ছিল আলে বাওয়াইহের প্রসিদ্ধ মন্ত্রী ইবনুল আমিদের মাকতাবা। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ‘ইবনু মাসকুয়াহ’ উল্লেখ করেন, তিনি ইবনুল আমীদের গ্রন্থাগারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। একদিন তার বাড়িতে বড় ধরনের চুরি হয়। বহু সরঞ্জাম নিয়ে যায় ‘চোর’। ইবনুল আমিদের কাছে সব চেয়ে মূল্যবান এবং প্রিয় বস্তু ছিল তার কিতাবগুলো। সব ধরনেরর কিতাবাদি ছিল তার এ সুবিশাল গ্রন্থাগারে; পরিমাপ করলে যা একশ' উটের হাওদাজের সমান হতো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সকালে উঠে তিনি আমাকে সব কিছু বাদ দিয়ে কেবল তার কিতাবগুলোর কথাই জিজ্ঞেস করলেন। আমি দেখছিলাম, ইতিমধ্যে তার চেহারা হলুদ বর্ণ ধারণ করেছিল।


বললাম, সেগুলো নিরাপদ আছে, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন! ইবনুল আমিদ তখন বললেন, আমার কাছে পৃথীবির তাবৎ ধনভাণ্ডারের বিকল্প আছে, কিন্তু আমার এইসব বিরল কিতাবগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

কর্ডোভার ঐতিহাসিক গন-গ্রন্থাগারও এই ধারাই ছিলো। উমাইয়্যা খলিফা মুসতানসির বিল্লাহ ৩৫০ হিজরিতে প্রতিষ্ঠা করেন এ গ্রন্থাগার। সরকারি কোষাগার থেকে শতাধিক ‘মুয়ায্যিফ’ নির্ধারণ করা হয় গ্রন্থাগার সংরক্ষণের স্বার্থে। এরপর থেকে প্রতিনিয়ত বহু নুসখা প্রতিলিপিকার, ঝানু লিখিয়ে ও প্রসিদ্ধ ওয়াররাকদেরর মিলনমেলা ঘটে এখানে।

আন্দালুসের সহস্র বিদ্যান-পণ্ডিতের জ্ঞানের খোরাকে পরিণত হয় কর্ডোভার এ বিদ্যানিকেতন। জানা যায়, ইউরো সভ্যতার বহু আদীম নথিপত্রও গচ্ছিত ছিলো এখানে, ফলে তাদের কাছেও যথেষ্ট গুরুত্বের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয় মুসতানসির প্রতিষ্ঠিত এই মাকতাবা।

ইবনুল আবার ‘তাকমিলা লি কিতাবিস সিলাহ' গ্রন্থে লেখেন, ‘সে সময় গ্রন্থাগারের কিতাবের 'তালিকা' সম্বলিত সূচিপত্রের সংখ্যা ৪৪ খণ্ড ছিলো।’

বর্তমান লিবিয়ার লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলী,তখন তারাবুলুস নামে পরিচিত ছিলো ইলমি মহলে। বনু আম্মার প্রতিষ্ঠিত সুবিশাল গ্রন্থাগার আজও সেখানে বহাল তবিয়তে আছে। রাষ্ট্র কতৃক নিয়োজিত একটি দল এমন ছিল, যারা রাষ্ট্রীয় ভাতা নিয়ে সমগ্র-ইসলামী বিশ্ব চষে বেড়াত বিরলতর কিতাবাদির অনুসন্ধানে।

৮৫ জন লিপিকার ছিলেন, যারা রাত দিন নুসখা প্রতিলিপির কাজ করে যেতেন শুধু।

এভাবেই খলিফা থেকে শুরু করে বিত্তশালী সমাজপতিসহ সাধারণ ধনী ব্যবসায়ী মুসলিমদের অনেকে এসকল গন-গ্রন্থাগারের সূচনা করেন। ইতিহাসে পাওয়া যায, নুরুদ্দিন মুহাম্মাদ যানকী দামেশকে একটি মাদ্রাসা কায়েম করেন,সঙ্গে বড় রকমের একটি গ্রন্থাগারও জুড়ে দেন।সালাউদ্দিন আইয়ুবি রহমতুল্লাহি আলাইহি তার পথেই হাটেন। উনার প্রধান বিচার প্রতি-যিনি আল কাদী,আল ফাদিল' নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন- কায়রোতে মাদ্রাসা কায়েম করেন এবং ফাতেমিদের ভাণ্ডার থেকে প্রাপ্ত প্রায় দুই লক্ষ কিতাবের বিশাল এক গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন মাদ্রাসার পাশেই।


ইতিহাসে ‘আল ফাদিলিয়্যা’ নামে পরিচিতি পায় সে মাদ্রাসা এবং তৎ-সংলগ্ন গ্রন্থাগার।

পাতা উল্টালে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এরূপ বহু চর্চা-কেন্দ্রের খোঁজ মিলবে, আজ আর সেদিকে যেতে চাচ্ছি না। মাত্র একটি ঐতিহাসিক ধারার প্রসঙ্গ টেনেই ক্ষান্ত হবো।

প্রাচীন মসজিদের সঙ্গে গড়ে ওঠা গ্রন্থাগার
জামে আজহার মসজিদের (যে মসজিদ থেকে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা হয়) গ্রন্থাগার এর মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকার কাইরাওয়ান অঞ্চলের জামে কাবির মসিজদের গ্রন্থাগারও ইতিহাসের বড় একটি অংশ জুড়ে রেখেছে। আর মসজিদে নববী তো হাজার বছরের ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে। আগন্তুক জ্ঞান-অন্বেষীর জন্য এক মহা জ্ঞান-ভাণ্ডার নববী মসজিদের এই গ্রন্থাগার।

দামেশকে জামে উমাওয়ির সঙ্গে লাগোয়া খিযানাতুল কুতুব তো এখন ইসলামি দুনিয়ার অন্যতম প্রসিদ্ধ প্রকাশনা বিভাগ।অথচ এর সূচনা যে আজ থেকে প্রায় ১২০০ বছর আগে হয়েছিলো একটি মসজিদকে কেন্দ্র করে, তা কজন জানে!

আন্দালুসে মসজিদ-কেন্দ্রিক গণ-গ্রন্থাগারগুলো প্রাচ্যের তুলনায় অধিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কর্ডোভার গ্রান্ড মসজিদকে সবচেয়ে বড় মসজিদ মনে করা হয়। ১৭০ হিজরীতে উমাইয়্যা খলিফা আব্দুর রহমান আদ-দাখিল এ মসজিদ প্রান্তরে মুসহাফ এবং কুতুবে ইসলামিয়্যার বিশাল এক ভাণ্ডার জমা করেন। কিন্তু দুঃজনক হলেও সত্য, দ্বিতীয় সম্রাট 'ফার্ডিনান্ড' ৬৩৪ হিজরিতে কর্ডোভা দখলের সময় সবগুলো কিতাব জ্বালিয়ে দেয়। বিখ্যাত আন্দালুসি ইতিহাসবেত্তা আল-মাক্কারি তার গ্রন্থ ‘নাফহুত ত্বীব ফি তারিখী আন্দালুস আর রাত্বীব’-এ লেখেন, ‘এসব গ্রন্থমালার মধ্যে উসমান ইবনে আফফান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর স্ব-হস্তে লিখিত মুসহাফটিও ছিল, যা পুড়িয়ে ফেলা হয়।’

এ ছিল সুখ-দুঃখ মিশ্রিত ঐতিহ্যময় ইসলামী সভ্যতার সামান্য বর্ণনা। শেখার ব্যাপার হলো— সমাজপতি, ধনকুবের, বিত্তশালী সে সময়েও ছিল, আজও আছে।

কিন্তু আমাদের চেতনার অবক্ষয় ঘটেছে পূর্বের তূলনায় কঠিন ভয়াবহ মাত্রায়। মসজিদ-মাদ্রাসা এবং লিল্লাহ বোর্ডিং ছাড়াও যে ‘ওয়াকফের’ বহু জায়গা রয়ে গেছে শরিয়তে এবং আমাদের সালাফের শিক্ষায়, তা আমরা সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে সক্ষম হই নি।

মূলত সভ্যতা যে চর্চার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং অধুনা দুনিয়ায় বুদ্ধিবৃত্তিকার অনুসঙ্গে চিন্তা-বিকাশের প্রশ্নে যে সভ্যতা-চর্চা নানামাত্রিক কল্পনাবল এবং বিনির্মাণীয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম—সে আলাপই বা আমরা কজন উঠাই।