আর্য-থিওরীর জন্ম
Image result for আর্য-থিওরীর জন্মআর্য-থিওরীর জন্ম

এইবার আর্য-থিওরী সম্বন্ধে শেষ কথা বলিব।আর্য-অনার্যের কথা শুনিলেই আমরা আমাদের চিন্তা ও ধারণাকে সুদূর অতীতে টানিয়া লইয়া যাই এবং ভাবি যে, আলো ও অন্ধকারের মতো দুই স্বতন্ত্র পরিমণ্ডলে আর্য ও অনার্যেরা বাস করিতেছে এবং সেখান হইতেই মানব-গোষ্ঠীর এই দুই ধারা বহিয়া আসিতেছে।কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল।আর্য-থিওরীর বয়স এখন মাত্র দেড়শত বৎসর।ইহার পূর্বে কোনো ইতিহাসে ‘আর্য’ অথবা ‘অনার্য’ বলিয়া কোনো বিশেষ চিহ্নিত জনগোষ্ঠী অথবা কোনো ভাষা ছিল না। এসব তীক্ষ্ণ শ্রেণী বিভাগ আমরা এখানে বসিয়া করিতেছি মাত্র!কাজেই সমস্ত কল্পনাটাই একটা কৃত্রিম আবরণ দিয়া মোড়া৷থিওরীটির উৎপত্তি কাহিনী নিম্নরূপ:

১৭৮৬ খ্রীষ্টাব্দে বাংলাদেশের তদানীন্তন চীফ জান্টিস এবং ‘এসিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল’-এর প্রেসিডেন্ট Sir William Jones সোসাইটির এক বার্ষিক সভায় একটি মূল্যবান ভাষণ দান করেন।ঐ ভাষণে তিনি ল্যাটিন, গ্রীক, ইংরাজী, ফরাসী, জার্মানি, পহলবী, সংস্কৃত প্রভৃতি কতিপয় ভাষার অনেকগুলি শব্দ ও ধাতৃরূপ বিশ্লেষণ করিয়া দেখান যে, ঐ সব ভাষার মূলে ঐক্য রহিয়াছে।তিনি তাই অনুমান করেন, ঐসব ভাষাভাষীজনেরা আদিতে একই স্থানে বাস করিত এবং একই ভাষায় কথা বলিত।কালে কালে বংশবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাহারা নানা দেশে ছড়াইয়া পড়িতে বাধ্য হইয়াছিল। এইরূপেই বিভিন্ন জাতি ও বিভিন্ন ভাষার সৃষ্টি হইয়াছিল।

এই ইংগিত পাইয়া জার্মান পণ্ডিতদের মনে এক নতুন চিন্তার উদ্রেক হইল।তুলনামূলক ভাষাতত্বের (Comparative Philology) আলোচনায় তাঁহারা প্ৰবৃত্ত হইলেন।Max Muller, Bopp, Kalaproth প্রভৃতি পণ্ডিতগণ এই বিষয়ে বহু গবেষণা করিলেন।অতঃপর ১৮৪৪ খ্রীষ্টাব্দে Sir Thomas Young নামক জনৈক মিসরভাষাবিদ পণ্ডিত আলোচ্য ভাষাগুলিকে “Family of Indo-European Language” বলিয়া অভিহিত করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ঐসব ভাষাভাষী জনগণকে Indo-European Races নামে পরিচয় দেন।ইহার পরই Indo-Aryan এবং Aryan নামের উৎপত্তি হয়।

তাহা হইলে একথা অনায়াসেই বুঝা যায় যে, আর্য-অনার্যের প্রভেদ নিতান্তই আধুনিক যুগের সৃষ্টি।এই জন্যই ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় বলেন যে, আর্য, অনার্য বা দ্রাবিড় কোনো নৃতাত্তিক প্রকারভেদ নয়; উহারা ভাষার নাম; অর্থাৎ আর্য ভাষাভাষী যাহারা তাহারাই ছিল আর্য, দ্রাবিড় ভাষাভাষী যাহারা তাহারা ছিল দ্রাবিড়।[বঙ্গালীর ইতিহাস]
কিন্তু এ ব্যাখ্যাও খুব সন্তোষজনক বলিয়া মনে হয় না।তবে ইহাতে আর্যদের আভিজাত্যের ভঙ্গি নষ্ট হয় বটে।

আর্য-থিওরীর কুফল

আর্য-থিওরীর স্বরূপ দেখান হইল।ইহাতে ভারতীয় আর্যদের ভূমিকা থাকিলেও তাহারা ইহার স্রষ্টা নহে; ইউরোপ হইতে-বিশেষ করিয়া জার্মান জাতির দ্বারা-এই থিওরী উদ্ভাবিত ও প্রচারিত। উৎকট সেমিঢিক বিদ্বেষ এবং দুর্বল জাতিদিগকে গ্রাস করিবার গভীর দুরভিসন্ধি এই থিওরীর প্রধান প্রেরণা। ইউরোপে জার্মান জাতিই গোঁড়া আর্য বলিয়া খ্যাত। বিগত দুইটি মহাযুদ্ধ তাহাদের গোঁড়ামির ফলেই সংঘটিত হইয়াছে।পাক-ভারত উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের যে অবনতি ঘটিয়াছে তাহার মূলেও আছে এই আর্য-থিওরীর প্রভাব।

বস্তৃতঃ এই থিওরী নিতান্তই মানবতা বিরোধী, মানুষে মানুষে জাতিতে জাতিতে ও দেশে দেশে বিরোধ ও বৈষম্য সৃষ্টি করিতে এই থিওরী এক অমোঘ অস্ত্র।এই থিওরী মানব-সভ্যতার ইতিহাসকেও বিকৃত ও কলুষিত করিয়াছে এবং মানবজাতির সত্য পরিচয়কে সকলের চোখের আড়াল করিয়া রাখিয়াছে।কাজেই প্রত্যেক কল্যাণকামী মানুষের উচিত এই থিওরীর অবসান ঘটানো।



মধ্যয্যগে বাংলা ভাষার প্রভাব
Image result for মুসলিম-সাহিত্যমধ্যযুগে বাংলা ভাষার প্রভাব
মুহম্মদ বিন বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বাংলা ভাষার মধ্যযুগের প্রবেশ-দুয়ারে আসিয়া পৌঁছিলাম। এ যুগকে মুসলিম যুগও বলা যাইতে পারে। ১৩৫০-১৭৫০ খ্রী: পর্যন্ত দীর্ঘ চারিশত বৎসর ধরিয়া বাংলা সাহিত্য মুসলিমদিগের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের প্রারম্ভে কিছুকাল যাবৎ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকর্ম তেমন উৎকর্ষ লাভ করিতে পারে নাই, কারণ যুগ-বিপ্লবের পর শান্ত পরিবেশ ফিরাইয়া আনিতে কিছুটা সময় লাগে।

বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহের আমল হইতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা আরম্ভ হয় এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত মুসলিমদিগের সেবার, দানে, সাহায্যে ও সহানুভূতিতে বাংলা ভাষা নানা গৌরবে সমৃদ্ধ হইতে থাকে। বাংলা ভাষার সর্ব প্রথম মুসলিম কবি শাহ্ মুহম্মদ সগীর আযম শাহের রাজত্বকালে ‘য়ুসুফ জুলিখা’ নামক কাব্য লিখিয়া যশস্বী হন। মুহম্মদ সগীরের ‘য়ুসুফ্ জুলিখা’ এবং তৎপূর্ববর্তী বড় চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণর্কীর্তন’ই বাংলা সাহিত্যের দুই প্রথম গ্রন্থ।

য়ুসুফ জুলিখার ভাষা ছিল এইরূপঃ

কহে শাহ্-মোহাম্মদ যুসুফ জুলিখা পদ
দেশিভাষা-পয়ার রচিত।
কিতাব কোরাণ মধ্যে দেখিনু বিশেষ
য়ুসুফ জুলিখা কথা অমিয়া অশেষ।
কহিব কিতাব চাহি সুধারস পুরি।
শুনহ ভকত জন শ্রুতিঘট ভরি।।
দোষ খেম, গুণ ধর রসিক সুজন।
মোহাম্মদ ছগীর ভনে প্রেমিক বচন।। [মুসলিম বাংলা সাহিত্য]

সুলতান হুসেন শাহ্ এবং তাঁহার বংশধরদিগের আমলই মধ্য-বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ।এই উদারমনা সাহিত্য-রসিক গুণগ্ৰাহী সুলতান সত্যই বাংলা সাহিত্যের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের কবি-সাহিত্যিকদিগকে ডাকিয়া তিনি দরবারে স্থান দেন।আরবী-ফারসী হইতে নানা ধর্মগ্রন্থ, ইতিহাস, গল্প ইত্যাদি অনুবাদ করাইবার কাজে তিনি মুসলিম কবিদিগকে নিয়োগ করেন। সেই সঙ্গে মৌলিক রচনাবলীরও মর্যাদা দেন।gulam-mostafa


শুধু মুসলিম কবি নন, হিন্দু কবিদিগকেও তিনি এবং তাঁহার অনুবর্তিগণ সাদরে আহবান করেন। তাহাদেরই উৎসাহে রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য হিন্দু গ্রন্থাদি বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়। হুসেন শাহের আমলে শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাব হওয়ায় বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব-ধারাও সংযোজিত হয়।এইরূপে বাংলা ভাষা জাতিধর্ম-নির্বিশেষে গোটা বাঙালী জাতির প্রতিনিধিত্ব করিবার সুযোগ পায়।

কিন্তু একটি কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। হুসেন শাহের দরবারে যখন বাংলা সাহিত্য চর্চার এমন সমারোহ চলিতেছে, তখনই-বা বাংলা ভাষার প্রতি আর্য-হিন্দুদিগের মনোভাব কিরূপ ছিল? পূর্বের সেই জাতক্রোধ, বিদ্বেষ ঘৃণার ভাব তাহারা তখনও অন্তরে অন্তরে পোষণ করিতেছিল, এই জন্য সুলতানের আবেদনে অগ্রে তাহারা সাড়া দেয় নাই।পরে যখন অন্যান্য কবিরা নিজেদের কাব্য-রচনার জন্য সুলতানের নিকট হইতে প্রচুর ইনাম, খেতাব ও পুরস্কার লাভ করিতে লাগিল, কেবল মাত্র তখনই তাহারা রাজ-দরবারে আসিয়া সাহিত্য সেবার আত্মনিয়োগ করিল।

“The Brahmins could not resist the influence of this high patronage. They were, therefore compelled to favour the language they had hated so much and latterly they themselves came forward to write poems and compile works of translation in Bengali.“ [History of Bengali Literature]

শুধু তাই নয়।সুলতানদেব দেখাদেখি দেশীয় অন্যান্য হিন্দু রাজারাও তখন নিজেদের রাজসভায় বাঙালী কবি-সাহিত্যিকদিগকে সমাদর করিতে লাগিলেন।এই ভাবেই বাংলা সাহিত্যের গোড়াপত্তন হইল এবং উহার সমস্ত গৌরব মুসলমানদের প্রাপ্য: “Thus the appointment of Bengali poets to the courts of Hindu Rajas grew to be fashion after the example of the Muslim chiefs.” [Ibid]


এইসব তথ্যের মুকাবেলায় কি করিয়া বলা যায় যে, বাংলা ভাষা আর্যভাষা?

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদিগের দান এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়া আছে । তাহাদের রচিত সাহিত্যে বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যও ছিল প্রচুর।ধর্ম, ইতিহাস, জীবনী, আধ্যাত্মিক তত্ত্ব, লৌকিক কেচ্ছা ও কাহিনী এবং অনুবাদই ছিল তাহাদের সাহিত্য-কর্মের মূলধারা।

কাসাসােল আম্বিয়া, ফতুহুশ্বাম, ফতহুল মেছের, আলেফ-লায়লা, জঙ্গনামা, শহীদে-কারবালা, লায়লি-মজনু, ইউসুফ-জোলেখা, আমির হামজা, চাহার দরবেশ, ছয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামান, সোনাভান, গাজী কালু ইত্যাদি অসংখ্য পুঁথি মুসলমান কবিরা রচনা করিয়া গিয়াছেন।ডক্টর আব্দুল গফুর সিদ্দিকীর মতে মুসলিম পুঁথির সংখ্যা প্রায় ৫০,০০০ হইবে। মুসলিম পুঁথি-সাহিত্যের ভাষা ও রচনা-রীতির কিঞ্চিৎ নমুনা নিম্নে দেওয়া হইলঃ

“মেছের সহর হইতে বাহির হইয়া
মকদ্দস পানে নবি জান নেকালিয়া
সামের সহর বিচে ফলগুন গ্রাম
তথা উতরিল যদি নবি নেককাম।
জিবরিল আসিয়া কহে শোন সমাচার
দেখ হেথা জমিনেতে কেমন বাহার।।” [কাসাসুল আম্বিয়া]

“উজিরের পানে বাদশা আঁখি ঘুমাইল।
দেলেতে হইল গোশ্বা কিছু না কহিল।
উজির কহিল বাদশা আমি সব জানি।
আমিরের বেটা এই উম্মর ইউসানি।।[আমির হামজা]

“শুন যত বেরাদার, কহি কিছু সমাচার
শুন সবে আগামি কালাম।
রুমের সহর বিচে, কুস্তনতুনিয়া দেশে
এস্তাম্বুল বলে যার নাম।” [চাহার দরবেশ]

এই চলিত ভাষা এতই জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছিল্ যে, অনেক হিন্দু কবিও এই ভাষায় পুঁথি লিখিয়া গিয়াছেন। একটি দৃষ্টান্ত দিই:

“আল্লা আল্লা বল পাক পরোয়ারদিগার।
আখেরে দোজখে ডালি…যার।।
দোজখ তরিতে বান্দা করহ ফিকির।
জাহিরে বাতুনে লইলাম আল্লার জিকির।।
আল্লার আরশ কোর্সে কিছু মেহেরবানী চাই।
ইমামগণের কেচ্ছা কিছু মিলাইয়া গাই।
শ্ৰীযুক্ত সাহেবের কেচ্ছা রাধাচরণ গাএ।
আল্লা আল্লা বল নবি পাঞ্জাতনের পাএ’’।।

অষ্টাদশ শতাব্দীতেও হিন্দু কবিরা তাঁহাদের কাব্যে আরবী-ফারসী শব্দ ব্যবহার করিতে কুষ্ঠাবোধ করেন নাই।দৃষ্টান্তস্বরূপ ভারতচন্দ্র ও বিদ্যাপতির নাম করা যায়। নিম্নে দুইটি উদ্ধৃতি দিতেছি:

“মানসিংহ জোড় হাতে অঞ্জলি বাঁধিয়া মাথে
কহে জাহাঁপনা সেলামত।
রামজির কুদরতে মহিম হইল ফতে
কেবল তোমারই কেরামত।
হুকুম শাহানশাহী আর কিছু নাহি চাহি
জের হৈল নিমকহারাম।
গোলাম গোলামী কৈল জালিম কয়েদ হৈল
বাহাদুরী সাহেবের নাম।” [ভারতচন্দ্র রায়]

হৈয়া বান্দার বান্দা নুঙাইয়া শির।
বন্দির বড় খাঁ গাজী পীর দস্তগীর।
নিয়ৎ হাছিল সত্যপীরের কালাম।
কহে বিদ্যাপতি করি হাজার ছালাম।। [বিদ্যাপতি]

প্রাচীন গদ্য

প্রাচীন বাংলা গদ্যের নিদর্শন খুবই বিরল।শুধু সরকারী দলিল-দস্তাবিজের মধ্যেই যা কিছু নমুনা পাওয়া যায়।নিম্নে সপ্তদশ, অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর ভাষার নমুনা দেখানো হইতেছে:

সপ্তদশ শতাব্দী (১৬৬২)

“শ্রী যশোমাধব ঠাকুর কুমড়াল গ্রামে দেবালয়ৎ আছিলা।রাম শর্মা ও গায়রহ্ আপনার ২ ওয়াদা মাফিক সেবা করিতেছিল।রাত্রদিন চৌকি দিতেছিল। শ্রী রামজীবন মৌলিক সেবার সরবরাহ পুরুষানুত্রুমে করিতেছেন।” ইত্যাদি। (শ্রী মনোমোহন ঘোষের ‘বাংলা গদ্যের চারযুগ’)

অষ্টাদশ শতাব্দী (১৭৮৬)

“শ্ৰীযুক্ত ওলন্দেজ কোম্পানীতে আড়ঙ্গ বিরভূমের খরিদর দাদনী আমি লইয়া ঢাকা আড়ঙ্গ চালানী করিয়াছি।আপরেল মাহেতে এবং মোকাম মজবুরের গােমস্তা কাপড় খরিদ করিতেছিল এবং কাপড় কথক ২ আমদানি হইয়াছে এবং হইতেছে দাস্ত কথক ২ তৈয়ার হইতেছে এবং মবলগ কাপড় ধোবার হাতে দাস্তর কারণ রহিয়াছে।তাহাতে সংপ্রীতি মে: গেল সাহেবের তরফ পেয়াদা আসিয়া খামখা জবরদস্তী ও মারপিঠ করিয়া ঘাট হইতে ধোবা লোককে ধরিয়া লইয়া গেল।”… ইত্যাদি।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত বাংলা ভাষায় এই মিলিত রূপ অব্যাহত ছিল।কিন্তু ইহার পরই বাংলা ভাষার খাত পরিবর্তিত হইল। তখন এদেশে ইংরাজ শাসন প্রবর্তিত হইয়াছে।শাসন কার্যেরর ‘সুবিধার’ জন্য ইংরাজেরা ভেদনীতির আশ্রয় লইল।সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তাহারা এই নীতি অবলম্বন করিল।
শেষ পর্বঃ ঊনবিংশ শতাব্দীর সাহিত্য

[উৎসঃ গোলাম মোস্তফা, বাংলা ভাষার নূতন পরিচয়, গোলাম মোস্তফা প্রবন্ধ সংকলন, আহমদ পাবলিশং হাউস, ঢাকা, ১৯৬৮ থেকে সংগৃহীত]
ঊনবিংশ শতাব্দীর মুসলিম-সাহিত্য
Image result for মুসলিম-সাহিত্যঊনবিংশ শতাব্দীর মুসলিম-সাহিত্য
রাজ্যহারা মুসলমানেরা যখন বুঝিতে পারিল যে, ইংরাজী ও বাংলা না শিখিয়া তাহাদের গত্যন্তর নাই, তখন তাহারা এইদিকে মনোযোগ দিল।এই নতুন যুগের প্রথম মুসলিম সাহিত্য-স্রষ্টা হইতেছেন মরহুম মীর মোশারফ হোসেন (১৮8৭-১৯১১)।তাঁহার প্রণীত ‘বিষাদ-সিন্ধু’ সাধু ভাষায় লিখিত হইলেও তাহার ভাষা যে কতো সাবলীল ও প্রাণবন্ত, নিম্নের উদ্ধৃতি হইতেই তাহা বুঝা যাইবে:

“রক্ত দর্শনে হোসেন চমকিয়া উঠিলেন। আজ ভয়শূন্য মনে ভয়ের সঞ্চার হইল।সভয়ে চতুর্দিকে চাহিয়া দেখিলেন: আবদুল্লাহ্ জেয়াদ, ওমর, সীমার এবং আরও কয়েকজন সেনা তাঁহার চতুর্দিকে ঘিরিয়া যইিতেছে।সকলের হাতেই তীর-ধনু।ইহা দেখিয়াই তিনি চমকিয়া উঠিলেন।যে সমুদয় বসনের মাহাত্ম্যে তিনি নির্ভ্য-হৃদয়ে ছিলেন, তৎসমুদয় এখন পরিত্যাগ করিয়াছেন; তরবারি, তীর, নেজা, বল্লম, বর্ম, খঞ্জর কিছুই তাঁহার সঙ্গে নাই।কেবল দুইখানি হাত মাত্র সম্বল।অন্যমনস্কভাবে তিনি দুই এক পদ করিয়া চলিলেন, শত্রুরাও পূর্ববৎ ঘিরিয়া তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে চলিল ৷” [বিষাদ-সিন্ধু]

কিন্তু মুসলিম কাব্য-সাহিত্য ও পুঁথির ধারা তখনও মন্থর গতিতে চলিতেছিল । এই সময়কার জনৈক মুসলিম কবির রচিত নিম্নের ব্যঙ্গ কবিতাটিতে কিছুটা আধুনিকতার ছাপ এবং উন্নত রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায় । কবিতাটি ইনকামট্যাক্সকে লক্ষ্য করিয়া রচিতঃ

“বালেশ্বর বিচে গড় পদ্দা পরগনা
ভিক্টোরিয়া শাহাজাদী যার মালিকানা।
লেয়সন করোসন দুই লাট বন্দি,
খাজানা দাখিল করি মোরা হাত বান্ধি।
জরিপেতে বন্দবস্ত হইয়াছে যার
বহুত মশকেলে দিতে হবে রাজকর !
তাহাতে যাহোক করি দুঃখেতে গুজরাণ
এইরূপে দিনপাত চালান রহমান।
রাতদিন দোওয়া করি মহারাণীর তরে,
রাজ্যবৃদ্ধি হয় তার খোদাতালা করে ৷
এমন আমল দুটা হয় না জাহানে
এক জাগায় রাখে বাঘ বকরী দুইজনে।
কেহ কারো জবরদস্তি করিতে না পারে,
কায়েম হুকুম যে আইন অনুসারে।
এই মতে কতদিন যায় গুজারিয়া
পালেন সবার তরে মেহের করিয়া।
তাহাতে আইল এক এমন রাক্ষস
তাহার বিখ্যাত নাম ইনকাম ট্যাকস।”

এই ধারা এখনও বাঁচিয়া আছে।নজরুল ইসলামের হাতে ইহার রূপান্তর ঘঢিয়াছে।আরবী-ফার্সী শব্দ দ্বারা, বলিষ্ঠ আঙ্গিক দ্বারা এবং ইসলামী ভাবধারা দ্বারা তিনি বাংলা ভাষাকে প্রচুর শ্রী ও সমৃদ্ধি দান করিয়াছেন।

উপসংহার

প্রাগৈতিহাসিক কাল হইতে আধুনিক কাল পর্যন্ত বাংলা ভাষার একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় এতক্ষণ আমরা দিলাম। এই পরিচয়ে দেখিলাম বাংলা ভাষা আর্য ভাষা নয়, অনার্য ভাষা। অনার্য ভাষার অর্থে অসভ্য বর্বর অস্পৃশ্যদের ভাষা নয়-আর্য-বহির্ভূত নরগােষ্ঠীর ভাষা; অন্য কথায় বাংলার ভাষা-বাঙালীদের ভাষা। অবশ্য একথা স্বীকার্য যে, পরবর্তীকালে বাংলা ভাষা সংস্কৃত ভাষা দ্বারা কিছুটা প্রভাবান্বিত হইয়াছে।কিন্তু সে প্রভাব ‘অত্যন্ত নগণ্য’ এবং “অত্যন্ত আধুনিক’।ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক্ বলেন:

“বর্তমান বাংলা ভাষার উপর সংস্কৃতের প্রত্যক্ষ প্রভাব যেমন নগণ্য, তেমনই অত্যন্ত আধুনিকও বটে ৷” [মুসলিম বাংলা সাহিত্য]

বাংলা ভাষার সংগঠনে সংস্কৃত হইতে যতটুকু সাহায্য লাভ করিয়াছি, তাহা আমরা অবশ্যই স্বীকার করি।কিন্তু বাংলা যে সংস্কৃতের দুহিতা এবং কাজেই আর্যভাষা এই দাবী অস্বীকার করি। আর্যামির গোঁড়ামি হইতে বাংলা ভাষাকে আমরা মুক্ত রাখিতে চাই।ইহইি হইবে বাংলা ভাষার কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথ।

আজ বাংলা ভাষা দ্বিধা-বিভক্ত।পশ্চিম বঙ্গের বাংলা এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা এক হইয়াও এক নয়। উভয়ের গতি ও লক্ষ্য বিভিন্ন। ইহাতে আমাদের আনন্দের কারণ আছে। এখানকার বাংলা সংস্কৃতের আওতা হইতে অনেক দূরে থাকিবে।সংস্কৃত একটি মৃতভাষা; সুতরাং মৃতের সহিত যাহারা যত বেশী মিতালী করিবে, তাহারা ততাে বেশী আড়ষ্ট ও প্রাণহীন হইবে।
পাক-ভারত উপমহাদেশের বহু প্রাদেশিক ভাষা রহিয়াছে ৷ যেমন বাংলা, উর্দু, হিন্দী, গুজরাটী, মারাঠি, আসামী ইত্যাদি।ইহাদের মধ্যে বাংলা ও উর্দুই যে শীর্ষস্থানীয়, একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ নোবেল প্রাইজ লাভ করিয়াছেন।উর্দুর কবি ইকবাল আজ সারা জগতের বিপ্লবী কবি ও দার্শনিক।এই দুই ভাষাতেই বহু বিশিষ্ট মনীষী জন্মগ্রহণ করিয়াছেন।এ গৌরব এক হিসাবে ইসলামের। উর্দু ও বাংলা যে আজ এত প্রগতিশীল ও জীবন্ত তাহার কারণ যে উহারা আর্য ভাষা নহে; অন্য কথায় সংস্কৃত হইতে উহাদের জন্ম হয় নাই। সংস্কৃত হইতে যে ভাষা যতো দূরে রহিয়াছে, সে ভাষা আজ ততো জীবন্ত, ততো প্রগতিশীল।

পাক-ভারত উপমহাদেশের সমস্ত আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে আজ যে উর্দু ও বাংলা ভাষাই সর্বাপেক্ষা উন্নত, বলিষ্ঠ ও ব্যাপক,তাহার অন্যতম প্রধান কারণ এই যে, ইহাদের প্রকৃতি ও রক্তে আছে ইসলামের বিশ্বজনীন উদারতা ও মানবিকতার ছাপ।প্রচারধর্মী সাম্যবাদী মানুষেরাই ইহাদের জন্মদাতা ও পালয়িতা।

বাংলা ভাষার গতিপথ লক্ষ্য করিলেও এ সত্য সহজেই বুঝা যায়।দ্রাবিড়, বৌদ্ধ, সুলতানী আমল পার হইয়া সে আসিল বৃটিশ আমলে। এখানে আসিয়া পাদ্রী ও পণ্ডিতদের ষড়ষন্থে সে অনেকখানি স্বাধীনতা হারাইয়া ফেলিল বটে, কিন্তু মুক্তির নূতন পথ ধরিয়া বাহিরে আসিতে তাহার বিলম্ব ঘটিল না।

এই মুক্তি-সংগ্রামে সাহায্য করিলেন মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম প্রমুখ উদারধর্মী কবি-সাহিত্যিকেরা।পাকিস্তান আসিয়া তাহার রূপান্তর ঘটিয়াছে। সুখস্মৃতি ঘেরা পূর্ব পাকিস্তানেই তো তাহার আদি বাসভূমি।এখানে আসিবা মাত্রই সে আবার তাহার হৃতগৌরব ফিরিয়া পাইয়াছে।

উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাও এখন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা।এই গৌরব বাংলা ভাষা অন্যত্র লাভ করিতে পারে নাই। পূর্ব-পাক বাংলা সাহিত্যে এবারেও ইসলাম এক নূতন ভূমিকা গ্রহণ করিবে।ইসলামের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা ও মহামানবতার বাণী এবং তাহার রূপ, রস ও সুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে প্রেরণা যোগাইবে এবং সম্ভাবনার এক নূতন দিগন্ত খুলিয়া দিবে।

[উৎসঃ গোলাম মোস্তফা, বাংলা ভাষার নূতন পরিচয়, গোলাম মোস্তফা প্রবন্ধ সংকলন, আহমদ পাবলিশং হাউস, ঢাকা, ১৯৬৮ থেকে সংগৃহীত]