মানসা মুসা: অজানা ইতিহাসের বিখ্যাত সম্রাট
Image result for মানসা মুসামানসা মুসা: অজানা ইতিহাসের বিখ্যাত সম্রাট
"মানসা মুসা" মালি সম্রাজ্যের (১২৩০খ্রিঃ-১৬০০খ্রিঃ) দশম "মানসা" ছিলেন। মালি সম্রাজ্যে "মানসা" বলতে "রাজাধিরাজ" বোঝানো হত। তিনি মালি সম্রাজ্যের গোড়পত্তন কারী "সুন্দিয়াতা কেটা " (Sundiata Keita)র নাতি ছিলেন। তার নাম মুসা হলেও তাকে প্রথম মুসা, মালির আমির, ওয়াংগারা খনির সম্রাট, কনকান মুসা/কানকো মুসা, মালির সিংহ, গঙ্গা মুসা নামে ডাকা হয়। তিনি মালি সম্রাজ্যের এবং আফ্রিকার সবচেয়ে সফল সম্রাট/শাসনকর্তা ছিলেন। তিনি ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে সম্পদশালী সম্রাট এবং সর্বকালের সবচেয়ে ধনী ব্যাক্তি।
মুসা ছিলেন একাধারে দক্ষ শাসন কর্তা, ইসলাম প্রচারক, শিক্ষা ও বিজ্ঞান অনুরাগী এবং দানশীল।

জন্মঃ

"মানসা মুসা" আনুমানিক ১২৮০ খ্রিঃ জন্ম গ্রহন করেন।

শাসন কালঃ

মুসা ৩২ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহন করেন এবং সুদীর্ঘ ২৫ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে শাসন করেন।

সম্রাজ্যঃ

মুসার সম্রাজ্য অনেক বিস্তৃত ছিল। তার সময়ে মালি সম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার করে। ইতিহাসবিদদের মতে তার সম্রাজ্যের আয়তন ছিল প্রায় ১২,৯৪,৯৯৪ বর্গ কিলোমিটার। বর্তমান সময়ের মালি, আইভরি কোষ্ট, মৌরিতানিয়া, সেনেগাল, নাইজার, গাম্বিয়া, বুর্কিনা ফাসো, গিনি, গিনি বিসাউ দেশ সমুহ নিয়ে তার বিশাল সম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।


মুসার হজ্বঃ

১৩২৪ খ্রিঃ মুসা পবিত্র হজ্ব পালন করেন। "মানসা মুসা"র এই হজ্ব ইতিহাসের অবিস্বরনীয় এক হজ্ব বলে পরিচিতি পায়। এই হজ্বে প্রায় ৬০,০০০ মানুষ তার সফর সঙ্গী হয়। যার ভেতর প্রায় ১২,০০০ ক্রীতদাস এই সফরের দলে ছিল। মুসা সফরের জন্য প্রয়োজনীয় সকল খাদ্য-শস্য ও প্রচুর ধনসম্পদ নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন।
তার সফরে খাদ্যশস্য ছাড়াও সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছিল।

মুসার সফরে তার প্রথম স্ত্রী সঙ্গী হন। মুসার স্ত্রীর সেবায় ৫০০ দাসী নিযুক্ত ছিল। এই কাফেলায় বেশ কয়েকজন শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারী কর্মকর্তা ও সঙ্গীত শিল্পীও ছিলেন।

তার সফরের অগ্রদূতেরা সুসজ্জিত ঘোড়া, রেশমের কাপড়ে সজ্জিত হয়ে এবং ব্যাগ ভর্তি সোনা নিয়ে সফরের প্রথমাংশে থাকেন। তার কাফেলায় ১০০+ উট ছিল শুধুমাত্র সোনা বহন করার জন্য। এই ১০০+ উটের প্রত্যেকটিই প্রায় ৩০০ পাউন্ড এর মতো সোনা বহন করে। তার ৫০০+ ক্রীতদাস শুধুমাত্র স্বর্ণ মূদ্রা, স্বর্ণ খন্ড, খনিজ লবন সহ মূল্যবান রত্ন পাথর বহনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল।

সফরে কাফেলার পথে নাইজার নদী পড়ে এবং তারা নৌকা যোগে নদী পার হন। নদীর পড়েই পথে সুবিশাল সাহারা মরুভুমি পড়ে। এই মরুভুমি পার হতে এই কাফেলার ৬০ দিনের মত লাগে। তখন বসন্তের শেষ সময় হওয়ায় দিনের বেলায় গরম কম ছিল এবং রাত্রেও শীতের প্রকোপ তেমন ছিল না।

সাহার মরুভুমি পার হবার পড়েই তাদের সামনে নীল নদ পড়ে। নীল নদের অপর পারে মিশরের কায়রোতে তখন মুসার সুবিশাল সম্পদের কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে। এবং এই সুযোগে বণিকেরা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অনেক বেশি বাড়িয়ে দেয়। ফলে কায়রোতে এসে মুসা একটু তাজ্জব হয়ে যান। যদিও তার সম্পদের পাহাড় তখনো কমে নি। কিন্তু, কায়রোতে সোনার দাম প্রতিনিয়তই কমতে থাকে, যা ঐ এলাকায় পরবর্তী ২০ বছরের অর্থনৈতিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলেছিল।

মুসা অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। তিনি তার কাফেলার পথে যত গরিব ও দরিদ্রের দেখা পেয়েছেন, সবাইকে অর্থ-সম্পদ, খাদ্য-বস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছেন। কথিত আছে, প্রতি জুম্মা বারে মুসা একটি মসজিদ তৈরী করতেন।


মক্কায় পৌছে মুসা হজ্ব করেন। হজ্বের পর মক্কার জ্ঞান-বিজ্ঞানে অভিভুত হয়ে পড়েন। তিনি মক্কা থেকে উট বোঝাই করে চিকিৎসা, জোতির্বিদ্যা, দর্শন, ভুগোল, ইতিহাস, গনিত শাস্ত্র এবং আইনের উপর প্রচুর বই নিয়ে আসেন। এবং মক্কা থেকে মেধাবী এবং সেরা গনিতবিদ, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, আর্কিটেক্টদের আমন্ত্রন করে নিয়ে আসেন।

পুনর্গঠনঃ

বলা হয়ে থাকে মুসা এই ঐতিহাসিক হজ্বে ১,৫০,০০০পাউন্ড স্বর্ণ ব্যয় করেছিলেন। তিনি মক্কায় থাকতেই গাও (Gao) বিজয়ের সংবাদ পান। তিনি মক্কা থেকে অনেক বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীকে সাথে করে নিয়ে আসেন এবং তার উট বোঝাই করে প্রচুর বই-পুস্তক নিয়ে আসেন। গাও বিজয়ের পরে তিনি গাও সম্রাটের দুই পুত্রকে বন্দীদশা থেকে মুক্তি দেন এবং রাজধানী নিয়ানি (Niani)তে নিয়ে আসেন। এবং এই দুই ভাইকে নিজ সন্তানের মত করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেন। তিনি এই সময়টায় (১৩২৫খ্রিঃ-১৩৩৭খ্রিঃ) তার রাজত্বে প্রচুর উন্নয়ন করেন। মক্কায় থাকার সময় গাও (Gao) এবং টিমবুকটু (Timbuktu ) তার সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি মালি সম্রাজ্যের প্রায় ৪০০টি শহরকে আধুনিক করে গড়ে তোলেন।

তার তৈরী কৃত স্থাপত্য সমূহের মধ্যে শংকর মাদ্রাসা বা ইউনিভার্সিটি অফ শংকর , হল অডিয়েন্স, গ্রান্ড প্যালেস উল্লেখযোগ্য।

সম্রাট "মানসা মুসা"র সাম্রাজ্যঃ

টিম্বুকটুঃ

মুসার সাম্রাজ্যের সকল শহরের ভেতর টিমবুকটুকে বেশি উন্নত করে গড়ে তোলা হয়। গাও, ডিজেন, সেগু, নিয়ানি সহ অধিকাংশ শহরে তিনি মার্কেট, মাদ্রাসা, মসজিদ, গ্রন্থাগার, ইউনিভার্সিটি নির্মান করেন। টিম্বুকটুতে মুসা তার প্রধান প্রাসাদ এবং জিনগুয়ের্বার ( Djinguereber ) মসজিদ নির্মান করেন। এইজন্য আন্দালুসিয়া , স্পেন এবং কায়রো থেকে তিনি স্থাপত্যবিদদের আমন্ত্রন জানান।
তার নির্মিত ইউনিভার্সিটি অফ সংকর/সংকর মাদ্রাসায় দেশ বিদেশের শিক্ষার্থীরা বিনামুল্যে অধ্যয়নের সুযোগ পেত।

ধীরে ধীরে টিমবুকটু শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, এবং ব্যবসায়ের প্রানকেন্দ্র হয়ে ওঠে। তখন এশিয়া, ইউরোপ, এবং আফ্রিকায় স্বর্ণ এবং খনিজ লবন রপ্তানী এবং ক্রয়-বিক্রয় বানিজ্যে টিমবুকটু প্রধান কেন্দ্র বলে বিবেচিত হয়। উত্তর ইউরোপে (ভেনিস, জেনোয়া, গ্রানাডা) টিমবুকটু বানিজ্য বিস্তার করে, এবং ৩ মহাদেশে (এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ) স্বর্ণ এবং লবন সরবরাহের কেন্দ্র হয়ে উঠে।


মৃত্যুঃ

১৩৩৭ খ্রিঃ "মানসা মুসা" মৃত্যুবরন করেন।

মানসা মুসা ছিলেন মালি সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সফল শাসক। তার সময়েই মালি সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে, এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে, ব্যবসা-বানিজ্যে স্বর্গভুমি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে। তিনি প্রায় চারশো শহর এবং ডজনখানেক রাষ্ট্রের একাধিপতি ছিলেন। এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রাজ্য পরিচালনা করতেন।



আফ্রিকা এখন দারিদ্র এবং ক্ষুধার জন্য পরিচিত হলেও আমরা অনেকেই জানিনা, এই আফ্রিকাতেই ছিলেন জগদ্বিখ্যাত সম্রাট, ধন-সম্পদে কিংবা জ্ঞান বিজ্ঞানে তার সম্রাজ্যের কোন বিকল্প ছিল না।
ভারতের সেনাপ্রধানের তথ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল ইসলাম
Image result for মুক্তিযুদ্ধকালভারতের সেনাপ্রধানের তথ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল ইসলাম
‘যদি বাংলাদেশকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসাবে ঘোষণা করা হয় তাহলে ভারতের আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বাংলাদেশীদের কখনোই ভারতের প্রতি তেমন ভালবাসা ছিল না। আমি জানতাম ভারতের প্রতি তাদের ভালবাসা অস্থায়ী। অনুপ্রেরণা লাভের জন্য ভারতের দিকে না তাকিয়ে তারা মক্কা ও পাকিস্তানের দিকে দৃষ্টিপাত করবে। আমাদেরকে সত্যাশ্রয়ী হতে হবে। বাংলাদেশীদের প্রতি আমরা সঠিক আচরণ করিনি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সব রকমের সাহায্য করা উচিৎ ছিল, কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা তা করেনি। তারা বেনিয়ার মতো আচরণ করেছে।’
ফিল্ড মার্শাল মানেক শ’(ভারতের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান)স্টেটম্যান, ২৯ এপ্রিল ১৯৮৮।


এই উক্তিটি করেছে সেই ব্যক্তি, যে ১৯৭১ সালে ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান ছিল।সে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দিনই উপলব্ধি করেছিল, বাংলাদেশের মানুষের জীবনধারা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যে চেতনা বিরাজ করছে তাতে করে মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার স্থান হওয়া সম্ভব নয়।
মুক্তিযুদ্ধকালে কতিপয় আওয়ামীলীগ নেতাদের শরনার্থী জীবনের যত কীর্তি….
Image result for মুক্তিযুদ্ধকালমুক্তিযুদ্ধকালে কতিপয় আওয়ামীলীগ নেতাদের শরনার্থী জীবনের যত কীর্তি….
কোলকাতার ৫৮ বালিগঞ্জ বাড়িটি ছিল প্রবাসী সরকারের আবাসিক কার্যালয়। ওই ভবনেই বসবাস ও দাপ্তরিক কাজ করতেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নজরুল ইসলাম। প্রয়োজনের তুলনায় ছোট এ বাড়িটিতে সারাক্ষন “জয় বাংলা”র লোকের ভিড় লেগেই থাকত। বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা আওয়ামীলীগ দলীয় এমপি, নেতা, আমলা, কর্মী, আত্মীয়স্বজন, আমত্য, চামচা সবার জন্য এ বাড়িটি ছিল অবারিত। ঢালাওভাবে ভাত-গোশত দিয়ে ভুড়ি ভোজ এমনকি নিশি যাপনেও কোনো কার্পণ্য ছিল না। অভ্যাগতদের প্রত্যেকের হাতে দেখা যেত একটা নতুন ব্রিফকেস কিংবা ছোট এট্যাচী, কোন কোন নেতার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। আহার নিদ্রা, এমনকি প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদনের সময়ও এসব ব্যাগ কাছছাড়া করতো না কেউ। এমন একটি ঘটনায় সেনা কর্মকর্তারা একজন অতিথির ব্রিফকেস পরীক্ষা করে ১২ লাখ পাকিস্তানী রুপী (বর্তমান মূল্য প্রায় ৪৩ কোটি টাকা) উদঘাটিত হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় কর্নেল ওসমানীর জেরার মুখে ভদ্রলোকটি টাকার কথা চেপে যান। পরে উদ্ধারকৃত বিপুল টাকা প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে জমা করে দেয়া হয়। মূলত: দেশ ছাড়ার আগে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা পূর্ব বাংলার ব্যাংক ট্রেজারীগুলো সব উজাড় করে অর্থ ও সোনাদানা নিয়েই পাড়ি জমান ভারতবর্ষে। আহমদ ছফা এ জাতীয় আরেকটি ঘটনার কথা বর্ণনা করে এভাবে, “এই সোনা তো বাংলাদেশের জনগনের সম্পত্তি।…যে তিনজন আমরা সোনা নিয়ে এসেছিলাম তারমধ্যে একজন এমপি’র আপন ছোট ভাই। আরেকজন স্থানীয় আওয়ামীলীগ প্রেসিডেন্টের শালা। তারা এখন কোথায় আছে কি করছে, কিছু জানিনে। অথচ এদিকে শুনতে পাচ্ছি সেই সোনা ইতোমধ্যে ভাগভাটোয়ারা হয়ে গেছে।…..সত্যিই তো এরকম একজন মানুষ দেড় মন সোনা বয়ে নিয়ে এসেছে শুনলে এখনকে বিশ্বাস করবে? (অলাতচক্র, পৃষ্ঠা ৬২)।


এ নিয়ে ৮নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল লিখেছেন,“আমি যখন তাদেরকে দেখেছি কোলকাতার অভিজাত এলাকার হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে জমজমাট আড্ডায় ব্যস্ত। একাত্তরের সেই গভীর বর্ষায়ত দিনরাতে কোলকাতার অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলোতে বসে গরম কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়ে হাটুতক কাদা জলে ডোবান্ত মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরগুলোতে অবস্থানরত হাজার হাজার তরুনের বেদনাহত চেহারাগুলো তারা একবারও দেখেছে কিনা তা আজও আমার জানতে ইচ্ছা করে। আমার জানতে ইচ্ছে করে কোলকাতার পার্ক স্ট্রীটের অভিজাত নাইট ক্লাবগুলোতে ‘বীয়ার’ হুইসকি পানরত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মনোমুকুরে একবারও ভেসে উঠেছে কিনা সেই গুলিবিদ্ধ কিশোর কাজলের কথা যে মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত চীৎকার করে ঘোষণা করেছে ‘জয় বাংলা’। আমার জানতে ইচ্ছে করে আরো আরো অনেক কিছু। কিন্তু জানতে ইচ্ছে করলেই তো আর জানা যায় না।” কলকাতা ও আগরতলার নাইট ক্লাব ও বেশ্যালয়ে প্রবাসী নেতাদের অনেকেরই নিয়মিত আসা যাওয়া ছিল। প্রবাসী সরকারের একজন মন্ত্রী সোনাগাছির বেশ্যালয়ে মারামারি করে কলকাতা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে অবশেষে মুজিবনগর সরকারের কাছে হস্তান্তরিত হয়। আহমদ ছফা ঘটনাটিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন, “যে সকল মানুষকে দেশে থাকতে শ্রদ্ধা করতাম, কলকাতায় অনেকের আচরণ দেখে সরল বাংলায় যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমুঢ়- তাই হতে হচ্ছে। এখনও তোমরা স্যার ডাকছ তার বদলে শালা বললেও অবাক কিছু ছিল না। এখানকার একটা সাপ্তাহিক খবরটা ছেপেছে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের একজন মন্ত্রী নাকি সোনাগাছিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। জানেন তো স্যার, সোনাগাছি কি জন্য বিখ্যাত?…পুলিশ অফিসারের জেরার মুখে ভদ্রলোককে কবুল করতেই হল, তিনি ভারতে প্রবাসী সরকারের একজন মন্ত্রী। পুলিশ অফিসার তখন বললেন, তাহলে স্যারের গুডনেমটা বলতে হয়। মন্ত্রী বাহাদুর নিজের নাম প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে ভেরিফাই করে দেখে যে বক্তব্য সঠিক। পুলিশ অফিসারটি দাঁতে জিভ কেটে বললেন, স্যার কেন মিছিমিছি সোনাগাছির মত খারাপ জায়গায় নিজেকে নাহক ঝুট-ঝামেলার মধ্যে পড়বেন। আর ভারত সরকারের আতিথেয়তার নিন্দে করবেন। আগে ভাগে আমাদের স্মরণ করলেই পারতেন, আমরা আপনাকে ভিআইপি-র উপযুক্ত যায়গায় পাঠিয়ে দিতাম (ছফা, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ২০-২১)। এসব নেতাদের কীর্তিকলাপ নিয়ে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র ঘৃনা উঠে এসেছে আহমদ ছফার কলমে, “কলকাতা এলে মাথায় খুন চেপে বসে। ইচ্ছা জাগে এই ফর্সা কাপড় পরা তথাকথিত নেতাদের সবকটাকে গুলি করে হত্যা করি। এ্যায়াসা দিন নেহি রয়েগা। একদিন আমরা দেশে ফিরে যাব। তখন সব কয়টা বানচোতকে গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে মারব। দেখি কোন বাপ সেদিন তাদের উদ্ধার করে। কলকাতার নরম বিছানায় ঘুমিয়ে পোলাও-কোর্মা খাওয়ার মজা ভাল করে ‍দেখিয়ে দেব” (ছফা, ৮১)।

“স্টপ জেনোসাইড” খ্যাত চলচ্চিত্রকার কাজী জহির রায়হান যুদ্ধকালে পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে গিয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে আওয়ামীলীগ নেতাদের অপকর্মের অনেক ফুটেজ ও ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেন, যা দিয়ে তিনি ডকুমেন্টারী বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট পাপিষ্ঠরা এসব কারনে জহির রায়হানকে গায়েব করে দেয়, তার লাশটিও খুঁজে পাওয়া যায় নি। জহির রায়হান সংবাদ সম্মেলন করে এসব চিত্র প্রকাশের হুমকি দিয়েছিলেন। আর এ হুমকির পরই তাঁর অন্তর্ধানের ঘটনা ঘটে। জহির রায়হানের ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার যুদ্ধকালে ১৪ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর দ্বারা অপহৃত হন। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারী ভাইকে খোঁজার নাম করে জহির রায়হানকে ডেকে নেয় স্বাধীন বাংলার প্রশাসন পরিচিতরা। এরপর থেকে জহির নিখোঁজ। তার লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি। মুজিব সকারের পুলিশ ও মিরপুর এলাকা নিয়ন্ত্রকারী বাহিনী জহির রায়হানের পরিবারকে সাহায্য করার পরিবর্তে এড়িয়ে যেতেন। জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া প্রসঙ্গে ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম.এ. জলিল লিখেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের আওয়ামীলীগ নেতাদের কুকীর্তি ফাঁস করে দিতে চাওয়ায় নিখোঁজ হন সাংবাদিক জহির রায়হান। ভারত অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক এবং চিত্র নির্মাতা কাজী জহির রায়হান। তিনি জেনেছিলেন অনেক কিছু, চিত্রায়িতও করেছিলেন অনেক দুর্লভ দৃশ্যের। কিন্তু অতসব জানতে বুঝতে গিয়ে তিনি বেজায় অপরাধ করে ফেলেছিলেন। স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই তাকে সেই অনেক কিছু জানার অপরাধেই প্রাণ দিতে হয়েছে। ভারতের মাটিতে অবস্থান কালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের চুরি, দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, যৌন কেলেংকারী, বিভিন্ন রূপ ভোগ-বিলাস সহ তাদের বিভিন্নমূখী অপকর্মের প্রমাণ্য দলীল ছিল- ছিল সচিত্র দৃশ্য। আওয়ামী লীগের অতি সাধের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজী জহির রায়হানের এতবড় অপরাধকে স্বার্থান্বেষী মহল কোন যুক্তিতে ক্ষমা করতে পারে? তাই বেঁচে থেকে স্বাধীনতার পরবর্তী রূপ দেখে যাওয়ার সুযোগ আর হয়নি জহির রায়হানের। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩ নম্বর আসামী স্টুয়ার্ড মুজীবেরও ঘটেছিল এই পরিণতি। এই দায়িত্বশীল নিষ্ঠাবান তেজোদীপ্ত যুবক স্টুয়ার্ড মুজীব ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে এবং পরে ৮ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছে। তার মত নির্ভেজাল ত্বরিতকর্মা একজন দেশপ্রেমিক যুদ্ধা সত্যিই বিরল। প্রচন্ড সহস ও বীরত্বের অধিকারী স্টুয়ার্ড মুজীব ছিল শেখ মুজিবের অত্যন্ত প্রিয় অন্ধভক্ত। মাদারীপুর থানার অন্তর্গত পালং অধিবাসী মুজীবকে দেখেছি বিদ্যুতের মতই এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ছুটোছুটি করতে। কি করে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করা যায়, ভারতের কোন নেতার সাথে যোগাযোগ করলে মুক্তিযুদ্ধের রসদ লাভ করা যায় কেবল সেই চিন্তা এবং কর্মেই অস্থির দেখেছি স্টুয়ার্ড মুজীবকে। মুজীব ভারতে অবস্থিত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেক কুকীর্তি সম্পর্কেই ছিল ওয়াকিফহাল। এতবড় স্পর্ধা কি করে সইবে স্বার্থান্বেষী মহল। তাই স্বাধীনতার মাত্র সপ্তাহ খানিকের মধ্যেই ঢাকা নগরীর গুলিস্তান চত্তর থেকে হাইজ্যাক হয়ে যায় স্টুয়ার্ড মুজীব। এভাবে হারিয়ে যায় বাংলার আর একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। (পৃষ্ঠা ৫৫, ৫৬)

http://archive.is/G25n3
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম-ই ছিল জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র চেতনা, কথিত ধর্মনিরপেক্ষতা নয়।
Image result for ধর্মনিরপেক্ষতাসম্মানিত দ্বীন ইসলাম-ই ছিল জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র চেতনা, কথিত ধর্মনিরপেক্ষতা নয়।

বর্তমানে নাস্তিক আর ইসলামবিদ্বেষীরা ‘চেতনা’ শব্দের ব্যবহার করে অপপ্রচার করে, স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ নাকি ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার জন্য হয়েছে। তারা এ সকল ক্ষেত্রে একান্ত নিজস্ব মত ব্যক্ত করে থাকে । এরা বুঝতে চায় না যে গুটিকয়েক নাস্তিক আর ইসলামবিদ্বেষীর মত, ১৫ রিটকারীর মত বাংলাদেশের মত নয়, মুসলমানের মত নয়, জনগনের মত নয়। এরা জনগনের প্রতিনিধিত্ব করেনা, জনগনের কাছে পরিত্যাজ্য। মিডিয়ায় টকশো’র মতই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের মত নয়, তা এরা জানে না, জানতেও চায়না।

আসলে প্রকৃত সত্য কি? মুক্তিযুদ্ধ কি ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য হয়েছিল নাকি ইসলাম এর জন্য ? তৎকালীন ৯৫ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশের মুসলমান কি নাস্তিক আর ইসলামবিদ্বেষী হবার জন্য যুদ্ধ করেছিলো? দেশের আপামর জনগণ কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে তাই বুঝে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অগণিত মানুষ কি আত্মাহুতি দিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের জন্য, জাতির ইসলাম ও মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার জন্যে?

ইতিহাস কি বলে ?
১. মুসলিম লীগ ১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগে পরিণত হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা সম্মেলনে প্রস্তাবিত প্রথম মেনিফেস্টো হিসাবে জনাব শামসুল হক (যিনি আওয়ামী লীগের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন) “মুল দাবী” শীর্ষক একটি পুস্তিকা পাঠ করেন। এতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয় “পাকিস্তান খেলাফত অথবা ইউনিয়ন অব পাকিস্তান রিপাবলিকস বৃটিশ কমনওয়েলথের বাইরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্র হবে” গঠনতন্ত্রের ১০ নং ধারায় বলা হয় “জনগণের মধ্যে ইসলামের প্রকৃত জ্ঞান, তার উচ্চ নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় নীতিমালা বিস্তার করা”। [সুত্র- বদরুদ্দীন উমর, পুর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি থেকে উদৃত; আবু আল সাঈদ, আওয়ামী লীগের ইতিহাস ১৯৪৯-১৯৭১, সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৩, পৃঃ ১৯৭-২০০]।

কাজেই আওয়ামী লীগের জন্মের সময় ধর্মনিরপেক্ষতা নয় বরং সম্মানিত ইসলামের প্রতি বিশ্বাস ও অঙ্গিকার ব্যক্ত করেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এমনকি সম্মানিত খিলাফতের আদলে দেশ পরিচালনার অঙ্গীকার ও ব্যক্ত করা হয়েছে।


২. ৭০ এর নির্বাচনি ইশতিহারে ধর্ম নিরপেক্ষতা ছিল কি না?
১৯৭০ সালের ৭ ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের জন্য ১৯৭০ সালের ৬ই জুন আওয়ামী লীগ ইশতেহার প্রকাশ করে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ- সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল - নুহ উল আলম লেলিনের রচনা/সম্পাদনায় সপ্তম পেজের” মিথ্যা প্রচারণা বন্ধ করুন” অংশটুক লিখা রয়েছে- “৬-দফা বা আমাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচী ইসলাম বিপন্ন করে তুলছে বলে যে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে সেই মিথ্যা প্রচারণা থেকে বিরত থাকার জন্য আমি শেষবারের মতো আহ্বান জানাচ্ছি। অঞ্চলে অঞ্চলে এবং মানুষে মানুষে সুবিচারের প্রত্যাশী কোনও কিছুই ইসলামের পরিপন্থী হতে পারেনা। আমরা এই শাসনতান্ত্রিক নীতির প্রতি অবিচল ওয়াদাবদ্ধ যে, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত ইসলামী নীতির পরিপন্থী কোনও আইনই এ দেশে পাস হতে বা চাপিয়ে দেওয়া যেতে পারেনা।” (মুজিবের রচনা সংগ্রহ, বাংলাদেশ কালচারাল ফোরাম ৮৪-৮৫ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)
নির্বাচনকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বেতার ভাষণে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, “যে দেশের শতকরা ৯৫ জনই মুসলমান, সে দেশে ইসলামবিরোধী আইন পাসের সম্ভাবনার কথা ভাবতে পারেন কেবল তারাই যাদের ঈমানই আদতে নাজুক আর ইসলামকে যারা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা ফায়দা করে তোলার কাজে। অতএব আমরা যারা আল্লাহর মজলুম বান্দাদের জন্য সংগ্রাম করছি, তারা ইসলামের বিরোধিতা করা তো দূরের কথা বরং ইসলামের বিধান মতে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারই উমেদার, আর সে ব্যাপারে প্রতিবন্ধক হলেন তারাই যারা ইসলাম বিপন্নের জিগির তুলে জনগণকে ধোঁকা দিতে চান।”

শেখ সাহেবের ভাষ্যমতে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার সম্মানিত ইসলাম উনার খিলাপ কাজ করে নাজুক ঈমান আর দুনিয়ার ফায়দার জন্য ইসলামকে ব্যবহার করেছে তা প্রতীয়মান হয়।


২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও সরকার পবিত্র কুরআন শরীফ এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ খিলাপ কোন আইন পাস হবেনা বলেই ক্ষমতা এসেছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ২০.২ অনুচ্ছেদে এই বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ ১৯৭০ এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে মুসলমানের কাছে এই ওয়াদাবদ্ধ হয়ে যে, তারা ইসলামের খেলাপ কোন কাজ করবেনা। যার কারণে মুসলমান বিশ্বাস করে তাদের ভোট দিয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধর্ম নিরপেক্ষ বলে মিথ্যাচার করে তারা কি জানেনা আওয়ামীলীগ ইসলাম উনার দোহাই দিয়েই ১৯৭০,২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেছে?

৩. ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করার পর তাদের সংবিধান কমিটি কর্তৃক প্রণীত খসড়া সংবিধানের প্রস্তাবনায় তদানীন্তন “পাকিস্তানের মুসলমানদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে পবিত্র কুরআন শরীফ- পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের আলোকে গড়ে তোলার” কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিলো। (দ্রষ্টব্য- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, ২য় খণ্ড, সংযোজন ১, পৃ.৭৯৩)। সেই খসড়া সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সন্নিবেশিত হয়েছিল- “(১) পবিত্র কুরআন শরীফ- পবিত্র সুন্নাহ শরীফ বিরোধী আইন পাস করা হবে না, (২) পবিত্র কুরআন ও ইসলামিয়াত শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে, (৩) মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী নৈতিকতা উন্নয়ণের পদক্ষেপ নেয়া হবে।” (দ্রষ্টব্য- ঐ,২য় খণ্ড,পৃ.৭৯৪)

৪. ১৯৭১ এর ১৪ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের প্রতি যে নির্দেশাবলী প্রদান করা হয় তার শীর্ষেই “আল্লাহু আকবার” লিখা হয়। তারপর স্বাধীনতার প্রসঙ্গ ব্যাখ্যা করে বলা হয়, “------বাঙ্গালীর অপরাধ মহান আল্লাহ পাক উনার সৃষ্ট পৃথিবীতে, মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশমত সম্মানের সাথে শান্তিতে সুখে বাস করতে চেয়েছে। বাঙ্গালীর অপরাধ মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশমত অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে এক সুন্দর ও সুখী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবার সংকল্প ঘোষণা করেছে। আমাদের সহায় পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ পাক উনার সাহায্য। এ সংগ্রাম আমাদের বাঁচার সংগ্রাম। সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ পাক উনার উপর ভরসা রেখে ন্যায়ের সংগ্রামে অটল থাকুন। স্মরণ করুন “মহান আল্লাহ পাক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, “অতীতের চাইতে ভবিষ্যৎ নিশ্চয় সুখকর।” বিশ্বাস রাখুন “মহান আল্লাহ পাক উনার সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী।” (দ্রষ্টব্য- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৯৮২, ৩য় খণ্ড, স্বাধীনতা ঘোষণার লক্ষ্য), পৃ.১৯-২২)


আল্লাহ আকবর, মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশিত পথে চলা, মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি বিশ্বাস,মহান আল্লাহ পাক উনার সাহায্যের প্রত্যাশা ও পবিত্র কুরআন শরীফ উনার বক্তব্য- এ সবই ছিলো সেদিনকার মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মর্মকথা, স্বাধীনতা যুদ্ধের আদর্শিক চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ও ভাবাদর্শ।

৫. স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধকে ‘জিহাদ’ বলে প্রচার করা হতো। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ করে জিহাদ বলে প্রচার করা হতো। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের এক কথিকায় বলা হয়-“ওরা আমাদের সাথে যে ধরনের যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, তা হচ্ছে ন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্যায় কে প্রতিষ্ঠিত করার যুদ্ধ।কোরানের দৃষ্টিতে ওরা শয়তানের বন্ধু ও দোযখী। অতএব মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশে ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমাদের ধর্মীয় কর্তব্য। ......অতএব, হে বাঙালী ভাইবোনেরা, আসুন আমরা অন্যায়কারী পশ্চিমা হানাদার পশু ও এদের পদলেহী দালাল কুকুরদের বিরুদ্ধে সার্বিক জেহাদ চালিয়ে আমরা আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হই। বিজয় আমাদের আমাদের সুনিশ্চত। “নাসরু-মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহান কারীব” (আবু রাহাত মোঃ হাবীবুর রহমান রচিত) [তথ্যসূত্র- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, পঞ্চমখণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৮২-২৮৫]

৬. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিল, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৩২ পৃষ্ঠায় ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ কলকাতা বেতার স্টেশন থেকে বিশ্ববাসীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্য প্রচার করা হয়। সর্বশেষে বঙ্গবন্ধু বলেন- গধু অষষধয নষবংং ুড়ঁ ধহফ যবষঢ় রহ ুড়ঁৎ ংঃৎঁমমষব ভড়ৎ ভৎববফড়স. ঔঙণ ইঅঘএখঅ. যার সোজা অর্থ- “এ মুক্তিসংগ্রামে মহান আল্লাহ পাক তোমাদের উপর রহমত করুণ এবং সাহায্য করুন। জয় বাংলা।“
৭. মুক্তিযুদ্ধ যে ইসলামের চেতনাই হয়েছিল তার অন্যতম প্রতিষ্ঠিত দলিল ১৯৭১ এর ৭ মার্চ এর শেখ মুজিবর রহমান সাহেবের ভাষন । যার কথা সবারই জানা। রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বললেন “মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়াছি, রক্ত আরো দেব, বাংলাদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ “।

এই পবিত্র শব্দের উপর ভিত্তি করেই লক্ষ লক্ষ মুসলমানেরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, শহিদ হয়েছেন। এই একটি মাত্র শব্দ-ই বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে।একজন মুক্তিযোদ্ধা ভাংগা রাইফেল কাধে নিয়ে পাকিস্থানী বাহীনির আধুনিক অস্ত্রের সামনে কোন বলে নিজের বুক পেতে দিয়েছেন এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই।

৮. মুসলমান উনাদের রক্তের উপর দাঁড়িয়েই যে বাংলাদেশ তার প্রমান নাম না জানা লক্ষ লক্ষ মুসলমান ছাড়াও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত - ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জন বীরউত্তম, ১৭৫ বীর বিক্রম, ৪২৬ বীর প্রতীকদের অর্থাৎ মোট খেতাব প্রাপ্ত -৬৭৬ জন এর মাঝে মুসলিম হলেন -৬৭১ জন, বিধর্মী মাত্র -০৪ জন। সংখ্যা অনুপাতে মুসলিম হলেন -৯৯.২৬%। সুতরাং খেতাবপ্রাপ্ত শহীদের তালিকা অনুযায়ী এটাই প্রমানিত হয় যে যুদ্ধে অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে এবং ৩০ লক্ষ শহীদের মাঝে মুসলিমের অনুপাত ৯৯% এরও বেশী।যে দেশের ৯৯.২৬% ধর্মের লোক সে দেশ সৃষ্টির যুদ্ধে বীরত্বের জন্য খেতাব পেয়েছে সে দেশ ধর্ম নিরপেক্ষ যারা বানাতে চায় তারা ইতিহাস সম্পর্কে গন্ডমুর্খ, বকলম।

৯. মুক্তিযুদ্ধে যারা নিহত হয়েছেন উনাদের শহীদ বলা হয়। যদি ধর্মনিরপেক্ষতার জন্যই যুদ্ধ হয় তাহলে শহীদ শব্দ আসে কি করে?
যে চেতনার সাথে দেশের তাবৎ জনগণ সংশ্লিষ্ট। যে প্রেরণা ও স্বপ্ন নিয়ে দেশের জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যেসব মহান উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করা হয়েছিল সেসব উদ্দেশ্যাবলীই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্মমূলে। যে গণচেতনা, যে গণআবেগ, যে গণআকাংখার সাথে সমষ্টিগতভাবে দেশের জনগণ সংশ্লিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে দেশের বৃহত্তর জনগণের চিন্তা-চেতনায় যে মনোভাব লালিত তাই হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নির্ধারক। কারো পক্ষ থেকে কোন কিছু জনগণের উপর আরোপ করলেই তা গণসমর্থিত, গণগ্রাহ্য হয়ে যায় না। বরং তা হবে আরোপিত ও চাপিয়ে দেয়া চেতনা। ইতিহাস থেকে প্রমাণিত সত্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল ইসলামী চেতনায়, মুসলমান যুদ্ধ করেছেন ইসলাম পালন করার জন্যই। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ বানাতে চায় তারা ধোকাবাজ, প্রতারক, দেশদ্রোহী, দ্বীনদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী, সংবিধানদ্রোহী।
তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দু সংস্কৃতি ভাব প্রসূত বাহিনী করাই ছিল 'র' এর মুজিব বাহিনী করার মুল লক্ষ্য
Image result for মুজিব বাহিনীতথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দু সংস্কৃতি ভাব প্রসূত বাহিনী করাই ছিল 'র' এর মুজিব বাহিনী করার মুল লক্ষ্য

প্রবাসী সরকারের নিয়ন্ত্রিনে গড়ে উঠেছিল মুক্তিবাহিনী। এই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন আতাউল গণি ওসমানি। তার পরেই ছিলেন ১১জন সেক্টর কমান্ডার। যাদের সবাই ছিলেন পাকিস্তান সেনা বাহিনীর প্রশিক্ষিত অফিসার। এটাই বাংলাদেশ সরকার এবং সর্বজন স্বীকৃত ও অনুমোদিত মুক্তিবাহিনী। এই বাহিনীর বাইরে প্যারালাল আরেকটি বাহিনী গোপনে তৈরি করেছিল ইন্ডিয়া। সেটার নাম ‘মুজিববাহিনী’।যা শেখ সাহেবের অগোচরেই হয়েছিলো। এই বাহিনীর গড়ে উঠেছিল সম্পুর্নভাবে ‘র’-এর তত্ত্বাবধানে। মুজিব বাহিনীর গঠন করা হয় প্রবাসী সরকারকে না জানিয়ে। অত্যন্ত গোপনে। টেনিং ও সমন্নয়ের দায়িত্বে ছিল ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-কাউন্টার ইন্টিলিজেন্স বিভাগের প্রধান জেনারেল ওভান।
মুজিব বাহিনী প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ বাহিনী বা মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চীপ অব স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল একে খন্দকার লিখেছেন-‘১৯৭১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ বাহিনী বা মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়। এই বাহিনী অস্থায়ী সরকারের দ্বারা অনুমোদিত ছিল। এই বাইরেও কিছু বাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন ব্যাক্তির নেতৃত্বে। তারা মুক্তিবাহিনীর সাথে সমন্বয় করে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে মুজিব বাহিনীর সৃষ্টি হয়েছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। মুজিব বাহিনীর গঠনপ্রাণলী ছিল সম্পুর্ন আলাদা। এই বাহিনীর সমন্বয়কারী ও প্রশিক্ষক ছিল ‘র’-এর কাউন্টার ইন্ডিলিজেন্স বিভাগের মেজর জেনারেল সুজন সিং ওভান। ইন্ডিয়ার দেরাদুনে মুজিব বাহিনীকে গোপনে টেনিং দেওয়া হত। প্রথম দিকে প্রবাসী সরকার এবিষয়ে কিছুই জানত না। পরবর্তিতে বিষয়টি জানার পর প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবিষয়ে প্রবাসী সরকারকে পাত্তাই দেয়নি’ (ভেতরে বাইরে, পৃষ্ঠা-১৩২)।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত ‘একুশ শতকের মহাজাগরণ, সিরাজুল আলম খান-দর্শন ও চিন্তাধারা’ শীর্ষক একটি বই বাজারে পাওয়া যায়। এই বইয়ের ৯৯ পৃষ্ঠায় জেনারেল ওভানের উদ্ধৃতি দিয়ে অধ্যায় রয়েছে ‘মুজিব বাহিনী’ শিরোনামে। এই অধ্যায় থেকে জানা যায় মুজিব বাহিনীর গঠনে ‘র’এর সার্বিক সহযোগিতায় ছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগিনা শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমদ (বর্তমানে মন্ত্রী) ও আবদুর রাজ্জাক (মরহুম আওয়ামী লীগ নেতা)। শেখ ফজলুল হক মনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট নিহত হয়েছে। সিরাজুল আলম খান স্বাধীনতার পর থেকে পর্দার আড়ালে বহু ঘটনার নায়ক। তবে এক সময় তিনি তুখোর ছাত্রনেতা ছিলেন।
বইটিতে সিরাজুল আলম খানকে স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর চিন্তা এবং ভাব দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এমনটাই দাবী করা হয়। যদিও স্বাধীনতার পরপরই শেখ ফজলুল হক মনি এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর দূরত্ব তৈরির কথাও বলা হয় বইটিতে। তবে বইটি পাঠ করলে একটা বিষয় স্পষ্ট হয় শেখ মুুজিবুর রহমানের অজান্তেই সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ‘নিউক্লিয়াস’। পরবর্তিতে এই সংগঠনটি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এই গোপন সংগঠনের সদস্যরাই মূলত বেশি যোগ দিয়েছিল মুজিব বাহিনীতে। এই বাহিনীর তৎকালীন দ্বিতীয় সারির নেতা ছিল হাসানুল হক ইনু।

মুজিব বাহিনী গঠনের উৎস পাওয়া যায় ডা. কালিদাস বৈদ্যের লেখায়। কলিকাতা থেকে প্রকাশিত কালিদাস বৈদ্যের লেখা বইটির নাম হচ্ছে- "বাঙ্গালির মুক্তিযুদ্ধের অন্তরালে শেখ মুজিব"। এ বইয়ের ১৫৮ পৃষ্ঠায় শুরু হয়েছে ‘মুজিব বাহিনী’ নামে একটি অধ্যায়। এখানে বলা হয়েছে মুজিব বাহিনী কালিদাস বৈদ্য এবং চিত্ত রঞ্জন সূতারের ব্রেইন চাইল্ড। বইটির এ অধ্যায়ের শুরুতে ডা. কালিদাস বৈদ্য দাবী করে মুক্তি বাহিনীর প্যারালাল আরেকটি বাহিনী গঠন করতে সে এবং চিত্তরঞ্জন সূতার আলোচনা করে। তারা ধারণা করেছিল মুক্তিবাহিনীর মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলেও তাদের আসল উদ্দেশ্য হাসিল হবে না। তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সংস্কৃতি বাংলাদেশের মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেওয়া। তারা মনে করত মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে যারা রয়েছে তারা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ট্রেনিংপ্রাপ্ত। মুসলমানদের সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত এই বাহিনী। সুতরাং তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতার নামে হিন্দু সংস্কৃতি ভাব প্রসূত পৃথক বাহিনী দরকার। যাদের হাতে থাকবে মূল ক্ষমতা।
এ অধ্যায়ের প্রথম প্যারার শেষাংশে উল্লেখ করা হয়-’চিত্তবাবু ও আমি গোপন আলোচনায় বসি। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবেলা করা যায় সেই পথের অনুসন্ধানই ছিল আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়। সেদিনের আলোচনায় দুটি পথের কথা আমরা চিন্তা করি। তার প্রথমটি হল হিন্দু ছেলেদের আলাদাভাবে গোপনে ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করা। আর দ্বিতীয়টি হল মুক্তিবাহিনী ছাড়াও আরও একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বাহিনী গঠন করা। তারা একদিকে যেমন উন্নত ধরনের সামরিক শিক্ষা পাবে তেমিন অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক হওয়ার জন্য তাদের বাস্তব শিক্ষা দিতে হবে। এই অসাম্প্রদায়িক বাহিনী বাংলাদেশের প্রকৃত সামরিক ক্ষমতা তাদের হাতে নিবে। বাংলাদেশকে তারাই চালাবে সাম্প্রদায়িক মুক্তিবাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করে।’ কালিদাস বৈদ্য বাবু প্রসঙ্গটি বর্ণনা করেছে মুজিব বাহিনী গঠনের নেপথ্য কাহিনী বলতে গিয়ে।
এ প্রসঙ্গে সে আরো বলেছে-‘বৈঠক শেষে চিত্ত বাবু প্রস্তাব করে, এই বাহিনীর নাম হবে মুজিব বাহিনী। সঙ্গে সঙ্গে আমি তার স্বীকৃতি জানাই। ওদিন আরো আলোচনা হয় মুজিব বাহিনীর নেতৃত্ব ও কতৃত্ব থাকবে ৪ জন ছাত্র নেতার হাতে।’
আলোচনায় তারা সিদ্ধান্ত নেন প্রথমে সিরাজুল আলম খানের সম্মতি পেলেই ৪ ছাত্র নেতার সমর্থন পাওয়া সহজ হবে। তারা আরো ধারণা করল শেখ ফজলুল হক মনি কখনো তার মামার নামে গঠিত বাহিনীর বিরোধীতা করবে না। শেখ ফজলুল হক মনি এবং সিরাজুল আলম খান একমত হলে আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদ কোন বিরোধীতা করবে না। তাদের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় চিত্ত বাবু ওই চার ছাত্র নেতার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে। বইটির বর্ণনায় বলা হয়, চিত্তবাবু বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার এক ফাঁকে প্রসঙ্গটি সিরাজুল আলম খানের সামনে উপস্থাপন করে। দেরি না করে সিরাজুল আলম খান তা লুফে নেন। তারা টার্গেট অনুযায়ী সিরাজুল আলম খানকে ব্যবহার করে বাকী ৩জনের সম্মতি আদায় করে।
কালীদাস বৈদ্যের বর্ণনায় আরো উল্লেখ করা হয়, ওই সিদ্ধানের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে পরের দিনই ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির কাছে পৌছে দেয়া হয়। সেও শুনে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। তারপরই জেনালে ওভানের মাধ্যমে তাড়াতাড়ি গোপনে মুজিব বাহিনী গঠন ও ট্রেনিং শুরু হয়ে যায়। এ বাহিনী গঠনের নেপথ্য কারন হিসাবে আরো কিছু বিষয় খোলাসা করেছে। তাদের লক্ষ্য ছিল মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী নিজেরা রেষারেষি করতে থাকবে। সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সাথেও মতানৈক্য চলবে। হিন্দু জোয়ানদের দিয়ে আরো একটি বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিবে তারা। এই বাহিনী হবে তখন মধ্যশক্তি বাহিনী। তাদের কথাই হবে তখন শেষ কথা।

মুজিব বাহিনী গঠন ও টেনিং নিয়ে কালীদাস বৈদ্য এবং এ কে খন্দকারের লেখায় হুবহু মিল পাওয়া যায়। এছাড়া সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে লেখা বইয়েও একই তথ্য উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থার প্রচেষ্টা নুতন কিছু নয়। এটা অতীতের ধারাবাহিকাত মাত্র। নিকট অতীতেও রাজনীতিতে ‘র‘-এর ভুমিকা নিয়ে এক তরফা অভিযোগ করা হত। এখন উভয় দিকেই তীর ছোড়া হচ্ছে। অতীত এবং বর্তমানের ব্যবধানটা এখানেই।



ক্রুসেডের ইতিহাস
Image result for ক্রুসেডের ইতিহাসক্রুসেডের ইতিহাস
১০৯৫ খৃস্টাব্দ থেকে ১২৯১ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড, বিষেশ করে বায়তুল মুকাদ্দাস খৃস্টানদের কর্তৃত্ব বহাল করার জন্য ইউরোপের খৃস্টানরা অনেক যুদ্ধ করে। ইতিহাসে এগুলোকে ক্রুসেড যুদ্ধ নামে আখ্যায়িত করা হয়। এসব যুদ্ধ ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার ভূখণ্ডে ক্রসের নামে চালানো হয়েছিল। ক্রুসেড যুদ্ধের এই ধারা দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকে। এ সময় নয়টি বড় যুদ্ধ হয় এবং তাতে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।
ফিলিস্তিন ও বায়তুল মাকাদ্দাস ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ফারুক রা.- এর সময়েই জয় হয়েছিল এবং তখন থেকে তা মুসলমানদের আয়ত্তে ছিল। দীর্ঘকাল পর্যন্ত খৃস্টানরা তা ফিরিয়ে নেয়ার কোনই দাবী তোলেনি। কিন্ত খৃস্টীয় একাদশ শতকের শেষদিকে সালজুকীদের পতনের পর হঠাৎ খৃস্টানদের মনে বায়তুল মাকদিস জয় করে নেয়ার চেতনা জাগে। তা থেকেই এ যুদ্ধের অবতারণা হয়। এসব যুদ্ধে ইউরোপীয়রা সঙ্কীর্ণ দৃষ্টি, পক্ষপাতিত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, অনৈতিকতা ও বর্বরতার যে প্রকাশ ঘটায় তা তাদের কপালে অনপনীয় কলঙ্ক হিসেবে চিরকাল থেকে যায়।


কারণসমূহ

ক্রুসেড যুদ্ধসমূহের পিছনে আসল কারণ ছিল ধর্মীয়। কিন্ত এটাকে কিছু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হয়। আর এই ধর্মীয় করণের পিছনে রয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট। যিনি এই যুদ্ধের উন্মাদনা ছড়িয়ে ছিলেন সেই পিটার রাহেবের সম্পর্ক ছিল কিছু ধনী ইহুদীর সাথেও । পিটার রাহেব ছাড়াও ইউরোপে কয়জন খৃস্টান রাজার ধারণা ছিল ইসলামী এলাকাগুলো দখল নিতে পারলে তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্তা কেটে যেতে পারে। মোটকথা, এসব যুদ্ধেও পিছনে কোন একটি কারণ ছিল না। তবে ধর্মীয় প্রেক্ষাপট ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় কারণ

ফিলিস্তিন হযরত ঈসা আ. এর জন্মস্থান। ফলে খৃস্টানদের জন্য তা পবিত্র ও বরকতময় স্থান। তাদের জন্য এটা ছিল পর্যটনের স্থান। হযরত উমর ফারুক রা.- এর খেলাফতকালে ফিলিস্তিন ভূমি ও বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের অধীনে চলে আসে। বায়তুল মুসলমানদের প্রথম কেবলা ছিল। বড় বড় অনেক নবীর কবর এখানে অবস্থিত। এ জন্য বায়তুল মাকদিস ও এ ভূমি মুসলমানদের কাছে খৃস্টানদের চেয়েও পবিত্র ও বরকতময় বলে বিবেচিত হয়। মুসলমানরা এখানকার বরকতময় জায়গাগুলো সব সময় হেফাজত করেছে। সেমতে অমুসলিম পর্যটকরা যখন তাদের পবিত্র স্থানগুলো দর্শনের উদ্দেশ্যে এখনে আসত, তখন মুসলমান প্রশাসনগুলো তাদেরকে সব ধরনের সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করত। অমুসলিমদের গীর্জা ও খানকাগুলো সব ধরনের বিধিনিষেধের বইরে থাকত। প্রশাসন তাদেরকে উঁচু মর্যাদা দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ইসলামী খেলাফতের পতন ও বিশৃঙ্খলার যুগে এসব পর্যটক স্বাদীনতার সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা চালায়। তাদের অনুদার দৃষ্টিভঙ্গি ও মতলবী আচরণের কারণে মুসলমান ও খৃস্টানদের মধ্যে ছোটখাটো দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কিন্তু এই ধান্ধাবাজ ও একচোখা পর্যটকরা এখান থেকে দেশে ফিরে মুসলমানদের দুর্ব্যবহারের বানোয়াট কাহিনী প্রচার করত এবং ইউরোপবাসীকে উস্কে দিত। ইউরোপের খৃস্টানরা তো আগে থেকেই মুসলমানদের বিরোধী ছিল। এখন এ পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা আরো বেড়ে যায়। সেমতে খৃস্টীয় দশম শতকে ইউরোপের খৃস্টান রাষ্ট্রসমূহ ইতালী, ফ্রান্স, জার্মানী, ইংলেন্ড ইত্যাদি ফিলিস্তিন ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের একটি পরিকল্পনা তৈরি করে যাতে এটাকে আবার খৃস্টান সাম্রাজ্যের অন্তুর্ভুক্ত করে নেয়া যায়।
এ সময় গোটা ইউরোপে একটি গুজব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, হযরত ঈসা আ. আবার নেমে এসে খৃস্টানদের সব দুঃখ-কষ্ট দূর করবেন। কিন্তু তাঁর অবতরণ হবে তখন, যখন জেরুজালেমের পবিত্র শহর মুসলমানদের হাত থেকে স্বাধীন করা হবে। এই গুজব খৃস্টানদের ধর্মীয় উত্তেজনা অত্যন্তু বাড়িয়ে দেয়ে।

খৃস্টান ধর্মগুরুরা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকেন যে, যদি কোন চোর, দুস্কৃতি ও পাপীও বায়তুল মাকদিস দর্শণ করে আসে, তাহলে পরকালে সে জান্নাতের উপযুক্ত হয়ে যাবে। এ জন্য বিশ্বাসের ভিত্তিতে বড় বড় দুস্কৃতিকারীও পর্যটক হিসেবে বায়তুল মাকদিস আসতে শুরু করে। এরা শহরে প্রবেশের সময় নাচ-গান ও শোরগোল করত নিজেদের প্রধান্য ও প্রসিদ্ধি প্রকাশ করার জন্য। আর শরাব পান করত খোলাখুলি। তাই পর্যটকদের এসব অশোভনীয় আচরণ এবং তাদের অনাচার, বিশৃঙ্খলা ও শান্তিু শৃঙ্খলা নষ্টকারী কার্যকলাপের কারণে তাদের প্রতি কিছু নৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। কিন্তু এসব পর্যটক দেশে ফিরে মুসলমানদের কঠোর ব্যবহারের মনগড়া কাহিনী লোকদের শোনাতে থাকে, যাতে তাদের ধর্মীয় উত্তেজনা চাঙ্গা করা যায়।
খৃস্টানজাতি তখন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। একভগের সম্পর্ক ছিল পশ্চিম ইউরোপের গীর্জার সাথে। তাদের কেন্দ্র ছিল রোম। দ্বিতীয় ভাগের সম্পর্ক ছিল কুসতুনতুনিয়া বা কনস্টান্টিনোপল বা বর্তমানের ইস্তাম্বুল। দু’গীর্জার অনুসারীদের মধ্যে পরস্পরে বিরোধ ছিল। পশ্চিম ইউরোপ বা রোমের পোপ দীর্ঘকাল কামনা করেছিলেন- পূর্ব ইউরোপ বা বাইজেন্টাইন গীর্জার কর্তৃত্বও যদি পাওয়া যেত, তাহলে পুরো বিশ্বের খৃস্টান জাতির আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব তিনি পেয়ে যেতেন। সেমতে ইসলামের বিরোধিতা ছাড়াও তারা নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য তিনি ঘোষণা করে দিলেন, সারা দুনিয়ার খৃস্টানরা বায়তুল মাকদিস মুসলমানদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও। এই যুদ্ধে যে মারা যাবে, সে জান্নাতের অধিকারী হবে, তার সব পাপ মুছে যাবে এবং বিজয়ের পর যেসব ধন দৌলত পাওয়া যাবে, তা তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হবে। পোপের এ ঘোষণার ফলে সারা পৃথিবীর খৃস্টানরা মুসলমানদের বিরোদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।
পোপ দ্বিতীয় আরবান পশ্চিম ইউরোপের গীর্জার প্রধান ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানপূজারী ও যুদ্ধবাজ ধর্মীয় নেতা। ইউরোপের শাষকদের কাছে তার মর্যাদা ও গুরুত্ব কমে গিয়েছিল। তাই তিনি নিজের মর্যাদা আবার বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খৃস্টনদের মধ্যে ধর্মীয় যুদ্ধের উম্মাদনা ছড়াতে শুরু করেন। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে খৃস্টানদের প্রাধান্য ফিরিয়ে আনা ও মুসলমানদের পরাজিত করার প্রচারণা চালাতে থাকেন। তিনি গীর্জার প্রভার শক্তিশালী করার জন্য খৃস্টান বিশ্বে ধর্মীয় যুদ্ধেও আগুন জ্বলিয়ে দেয়াই উত্তম উপায় মনে করলেন। এভাবে তিনি ক্রুসেড যুদ্ধের পথ তৈরি করে দিলেন।


রাজনৈতিক কারণ

ইসলামের মুজাহিদরা তাদের উত্থানের যুগে বড় বড় সাম্রাজ্য নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিলেন। আফ্রিকা, এশিয়া, আলজিরিয়া, ভূমধ্য সাগরের দ্বীপ রাষ্ট্রসমুহ সাইপ্রাস, সিসিলি ইত্যাদি এবং স্পেন, পুর্তগাল- সবাই তাদের অধীনে চলে আসে। এভাবে সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু খৃস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে ইসলামী বিশ্বের পরিস্থিতি অনেক বদলে যায়। মিসওর উবায়দী সাম্রাজ্য তখন পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সিসিলিতে মুসলমানদের শক্তি কমে গিয়েছে। স্পেনে যদি ইউসুফ ইবনে তাশফীনের আবির্ভাব না হতো, তাহলে সেখানে থেকে মুনলমানদের বিতাড়ন অনেক আগেই সম্পন্ন হতো। সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের রাজনৈতিক শক্তি যখন কমে এসেছে, তখন খৃস্টান জগত তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে।
তুরস্কের সালজুকীদের যুগ ছিল মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতির শেষ গৌরবময় অধ্যায়। তারা এশিয়া মাইনরের সব এলাকা জয় করে কুসতুনতুনিয়া জয়ের পথ খুলে দিয়েছিলেন। যদি মালিক শাহ সালজুকীর পর কোন উপযুক্ত ব্যক্তি সিংহাসনে আরোহন করতেন, তাহলে হয়ত কুসতুনতুনিয়া খৃস্টান বিশ্বের ওপর ইসলামী বাহিনীর হামলা প্রতিরোধের শেষ দুর্গ হিসেবে বিদ্যমান ছিল। তাই সালজুকীদের শক্তিতে ভীত হয়ে বাইজেন্টাইন শাসক মাইকেল ডোকাস ১০৯০ খৃস্টাব্দে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোকে তুর্কিদের এই ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির প্রতি মনোযোগী করেন এবং তাদের কছে সাহায্য চান। সারা খৃস্টান বিশ্ব তার আহবানে তৎক্ষণাত সাড়া দেয়ে এবং ময়দানে নেমে আসে। এভাবে অল্পদিনের মধ্যে খৃস্টানদের বিশাল এক বাহিনী স্রোতের বেগে ধেয়ে আসে মুসলমানদের প্রতি। নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের স্বার্থে প্রাচ্যের বাইজেন্টাইন গীর্জা ও পাশ্চাত্যের গীর্জার কধ্যে পরস্পরে সমঝোতা হয়ে যায় এবং উভয় গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড যুদ্ধে অংশ নেয়।

এদিকে ইসলামী বিশ্বে ছিল ঐক্যের অভাব। বাগদাদের আব্বাসী ও মিসরের ফাতেমী খেলাফত এবং সালজুকী ও স্পেনের শাসকেরা অধঃপতনের শিকার ছিল। তাদের মধ্যে ঐক্যের কোন পরিস্থিতি ছিল না। সুতরাং ক্রুসেডারদের জন্য এর চেয়ে সুবর্ণ সুযোগ আর কী হতে পারত।


সামজিক কারণ

সামজিক দিক দিয়ে ইউরোপ ছিল মুসলমানদের তুলনায় পাশ্চাৎপদ। সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচারের যেসব নীতি মুনলমানরা নিজেদের মধ্যে চালু করেছিল, ইউরোপের খৃস্টান সমাজ তখনো তা থেকে বঞ্চিত ছিল। অভাবী ও দরিদ্র লোকেরা বিভিন্ন ধরনের বিধি-নিষেধের জালে আবদ্ধ ছিল। সামন্ততন্ত্রের ওপর ইউরোপের সমাজব্যবস্থার ভিত্তি ছিল। সামন্ত প্রভুরা দরিদ্র জনসাধারণের রক্ত চুষে নিতে। অথচ তাদের কোন অধিকার পরিশোধ করত না। ক্ষমতাসীন ও ধর্মীয় গোষ্ঠী এসব মানুষের ক্ষোভের লক্ষ্য নিজেদের পরিবর্তে মুসলমানদের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। নৈতিক অধঃপতনের কারণেও জনসাধারণের অবস্থা ছিল শোচনীয়। ইউরোপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জনগণের দৃষ্টি অভ্যন্তরীণ সমস্যাবলী ও তাদের দুর্দশা থেকে সরানোর জন্য বাইরের সমস্যাবলীর দিকে ঘুরিয়ে দেয়। এসব লড়াইয়ে স্বেচ্ছাসেবকদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল তাদের নিয়ে, যারা তাদের হীন তাড়না প্রশমিত করতে গ্রীক সৌন্দর্যের নান্দনিকতা স্পর্শ করার জন্য এ সফরে শরীক হয়েছিল। ফ্রান্সের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক লেবরের বর্ণনায় সেই যুগের সামাজিক পরিস্থিতির সুন্দর প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি লিখেছেন- জান্নত লাভ ছাড়াও প্রতিটি মানুষ এটাকে সম্পদ লাভের উপায় বলে মনে করছিল। যেসব কৃষক ছিল জমিদারদের গোলাম, পরিবারের যেসব সদস্য আইনের দৃষ্টিতে উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছিল, যেসব ধনী ব্যক্তি অল্প সম্পত্তি পেয়েছিল এবং যারা সম্পদ উপার্জনের নেশায় পড়েছিল, যেসব পাদ্রী গীর্জার কঠিন জীবনরীতিতে হাঁপিয়ে উঠেছিল- মোটকথা দুর্দশাগ্রস্থ ও বঞ্চিত লোকদের একটি সংখ্যা এই পবিত্র বাহিনীতে অংশগ্রহণ করেছিল।’ অর্থাৎ ধর্মীয় নেতারা তাদের বিলাসী জীবন লুকানোর স্বার্থে জনগণের মনোযোগ সামাজিক এসব আনাচার থেকে সরানোর চেষ্টা করেন।


অর্থনৈতিক কারণ

ইউরোপে ব্যাপকভাবে আলোচিত হতো ইসলামী বিশ্বের স্বচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের কথ। প্রাচ্যের ইসলামী রাষ্ট্রগুলো স্বচ্ছলতা ও সমৃদ্ধির যেসব পর্যায় অতিক্রম করেছিল, ইউরোপের দেশগুলো তা করতে পারেনি। সুতরাং ইউরোপের যেসব মহল সম্পদ উপার্জনের উপায় ইউরোপে খুঁজে পাচ্ছিল না, তারা তাদের ভাগ্য পরীক্ষার জন্য এই ধর্মীয় অভিযানে অংশ নেয়। তাদের শুধু লক্ষ ছিল লুটপাট ও ধনসম্পদ অর্জন। হাঙ্গেরীর পথে অগ্রসর হওয়ার সময় সেখানকার খৃস্টন বাসিন্দাদের সাথে ক্রুসেডাররা যে আচরণ করেছিল, তা থেকেই এটা প্রমাণিত হয়।
ইউরোপের সরকার ব্যবস্থায় সামন্তপ্রতা ছিল মৌলিক বিষয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সামন্ত প্রথার অনিষ্টকারিতা ও কুপ্রভাব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অর্থের সমস্ত উৎস মহাজন, গীর্জার যাজক ও জমিদারদের আয়ত্তে ছিল। জনসাধারণ ছিল দুর্দশার মধ্যে। কৃষকদের অবস্থা ছিল অবর্ণনীয়। তাই ধর্মীয় শ্রেণী ধর্মের আচরণে জনগণের প্রতিক্রিয়া রোধ করার চেষ্টা চালায়, যাতে তাদের মনোযোগ দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর দিকে না যায়। তাছাড়া উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী যারা বঞ্চিত হয়েছিল, তারাও নিছক অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের স্বার্থে এতে বাতাস দেয়ে।

ইতালীর বাসিন্দারা চাইছিল ফিলিস্তিন ও সিরিয়া দখল করে আগের মতো নিজেদের ব্যবসায়িক উন্নতি সাধন করতে। কেননা ইসলামী বিজয়ের কারণে ইতালীর ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ শেষ হয়ে গিয়েছিল। এজন্য তাদের ধারণা ছিল ক্রুসেড যুদ্ধের মাধ্যমে যদি ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার এলাকা সমূহ মুসলমানদের হাত থেকে আবার ছিনিয়ে নেয়া যায়, তাহলে ইউরোপের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে।


তাৎক্ষণিক কারণ

তাৎক্ষণিক কারণ ছিল পোপ দ্বিতীয় আরবানের জিহাদের ফতোয়া। ফ্রান্সের পিটার যখন বায়তুল মাকদিস যিয়ারতে গেলেন, তখন তিনি বায়তুল মাকদিস ওপর মুসলমানদের কর্তৃত্ব খুব কষ্টকর মনে করলেন। ইউরোপে ফিরে গিয়ে তিনি খৃস্টানদের দুরবস্থার সত্য মিথ্যা কাহিনী বর্ণনা করলেন এবং এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি গোটা ইউরোপ সফর করলেন। পিটারের এ সফর সেখানকার লোকদের মধ্যে ধর্মীয় উম্মাদনার পরিস্থিতি সৃষ্টি করল। কিন্ত দুঃখের বিষয়, এই ধর্মযাজক বায়তুল মাকদিস দর্শন করতে আসা লোকদের দুস্কর্ম একদম চেপে গেলেন। পোপ যেহেতু পশ্চিমা গীর্জার আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন, এজন্য তিনি বিভিন্ন উপগোষ্ঠির একটি সম্মেলন ডাকলেন এবং সেখানে মুসলানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন। তিনি এ মর্মে সুসংবাদ ঘোষণা করলেন যে, এ যুদ্ধে মারা গেলে সব ধরনের পাপ মোচন হয়ে যাবে এবং বেহেশতের অধিকারী হওয়া যাবে। লোকেরা দলে দলে সেন্ট পিটারের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনে হামলার জন্য রওয়ানা দেয়ে।


প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধ ১০৯৭-১১৪৫ খৃ.

পোপের যুদ্ধ ঘোষণার পর একে একে চারটি বিশাল সেনাবাহিনী বায়তুল মাকদিস জয়ের সঙ্কল্প নিয়ে রওয়ানা হয়। পাদ্রী পিটারের অধীনে তের লাখ খৃস্টানের এক বিশাল বাহিনী কনস্টান্টিনোপলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। পথে তারা নিজেদের ধর্মের লোকদের ওপরেই হত্যা, রাহাজানি ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে। বুলগেরিয়া হয়ে তারা যখন কনস্টান্টিনোপল পৌছে, তখন এখানকার রোমান সম্রাট তাদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণে তাদের গতি এশিয়া মাইনরের দিকে ফিরিয়ে দেন। তারা যখন ইসলামী এলাকায় প্রবেশ করে, তখন সালজুকী শাসক কালাজ আরসালান এ বাহিনীটিকে নাস্তানাবুদ করে দেন। তাদের প্রচুর সৈন্য নিহত হয়। ক্রুসেডারদের এ অভিযান একেবারেই ব্যর্থ হয়ে যায়।

ক্রুসেডারদের দ্বিতীয় বাহিনী একজন জার্মান পাদ্রী গাউসফেল- এর নেতৃত্বে রওয়ানা হয়। তারা যখন হাঙ্গেরী অতিক্রম করে, তখন তাদের অনাচারে হাঙ্গেরীর লোকেরা নিরুপায় হয়ে পড়ে এবং তাদেরকে সেখান খেকে বের করে দেয়। এ বাহিনীটিও এভাবে অপকর্মের প্রয়াশ্চিত্ত ভোগ করে।

ক্রুসেডারদের তৃতীয় বাহিনীতে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ফিনল্যান্ডের স্বেচ্ছাসেবকরা ছিল। এ বাহিনী যখন পবিত্র যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হয়, তখন এই স্বেচ্ছাসেবকদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের শিকার হয় রাইন নদীর তীরবর্তী মোসেল সহ কয়েকটি শহরের ইহুদী বাসিন্দারা। এরা যখন হঙ্গেরী অতিক্রম করতে থকে, তখন হাঙ্গেরীর বাসিন্দারা তাদের কচুকাটা করে হাঙ্গেরীর মাটিকে তাদের কবরস্তান বানায়।


সবচেয়ে সুশৃঙ্খল ও বিশাল বাহিনী ছিল দশ লাখ সৈন্যের। ১০৯৭-এ তারা রওয়ানা হয়। এ বাহিনীতে ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স, জার্মানী, ইতালী ও সিসিলির রাজপুত্ররা ছিলেন। এ সম্মিলিত বাহিনির কমাণ্ড ছিল ফ্রান্সের গডফ্রের হাতে। বিশাল এই বহিনী এশিয়া মাইনরের দিকে রওয়ানা হয় এবং প্রসিদ্ধ কুনিয়া শহর অবরোধ করে। কালাজ আরসালান পরাজিত হলেন। বিজয়ী খৃস্টানরা অগ্রসর হতে হতে ইন্তাকিয়া পৌছে যায়। নয় মাস পরে ইন্তাকিয়াও তাদের দখলে চলে যায়। সেখানকার সমস্ত মুসলমানকে তারা হত্যা করে। মুসলমানদের ওপর ক্রুসেডারদের নির্যাতন ছিল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়গুলোর একটি। শিশু, যুবক, বৃদ্ধ কেউ তাদের হাত থেকে বাঁচতে পারল না। প্রায় এক লাখ মুসলমান নিহত হয়। ইন্তাকিয়ার পর বিজয়ী বাহিনী সিরিয়ার কয়েকটি শহর দখল করতে করতে হিমস পৌছে।


বায়তুল মাকদিস পতন

হিমস দখল করার পর ক্রুসেডাররা বায়তুল মাকদিস অবরোধ করে। ফতেমীরা বায়তুল মাকদিস শহর রক্ষার সন্তোষজনক ব্যবস্তা নেয়নি। এজন্য ১৫ জুন ১০৯৯ বায়তুল মাকদিস ওই ধর্মীয় উম্মাদরা সহজে দখল করে নেয়। শহরের পবিত্রতার কোনই খেয়াল করা হয়নি। মুসলমানদের গণহত্যা চালানো হয় এবং তাদের ধনসম্পদ লুটে নেয়া হয়। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরাও এই লজ্জাজনক অত্যাচারের কহিনী স্বীকার করেছেন। কয়েকশ বছর আগে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ফারুক রা. মুসলমানদের সাথে খৃস্টানদের আচরণ ছিল তার সম্পূর্ণ উল্টো। বায়তুল মাকদিসের আশপাশ এলাকা দখলের পর গডফ্রেকে বায়তুল মাকদিসের শাসক বানানো হয় এবং বিজিত এলাকাগুলো খৃস্টান রাজ্যগুলোর মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হয়। এসব এলাকার মধ্যে ছিল ত্রিপোলি, ইন্তাকিয়া ও সিরিয়ার অংশসমুহ। মুসলমানদের পরাজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল মুসলমানদের পরস্পরে অনৈক্য বিশৃঙ্খলা ও বিচ্ছিন্নতা।

সালজুকীদের বিচ্ছিন্নতার মাঝখানে আবির্ভূত হন ইমাদুদ্দীন জঙ্গীর মতো মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি জঙ্গী শাসনের গোড়াপত্তন করেন এবং মুসলমানদেরকে নব জীবনে ফিরিয়ে আনেন। তিনি হারবান, হালাব ইত্যাদি এলাকা জয় করে নিজের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি যে সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে ক্রুসেডারদের প্রতিহত করেন এবং তাদের পরাজিত করেন, তা ইসলামের ইতিহাসে গৌরবজনক অধ্যায় হয়ে রয়েছে। ইমাদুদ্দীন ইথারব দুর্গ ও মিসরের সীমান্ত এলাকা থেকে খৃস্টানদের বিতাড়িত করে নিজেই দখল করে নেন। সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারদেরকে পরাজয় বরণ করতে হয় এবং ইমাদুদ্দীন সিরিয়ার বৃস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেন। ইমাদুদ্দীনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব বা লাবাক্কে আবার মুসলমানদের দখল প্রতিষ্ঠা।


দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ ১১৪৪-১১৮৭ খৃ.

ইমাদুদ্দীনের ইন্তেকালের পর ১১৪৪ খৃস্টাব্দে তার যোগ্যপুত্র নূরদ্দীন জঙ্গী পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। ক্রুসেডারদের প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তিনি পিতার চেয়ে কম তৎপর ছিলেন না। শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি মুসলমানদের মধ্যে জিহাদের নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করেন এবং খৃস্টানদের কাছ থেকে প্রচুর এলাকা ছিনিয়ে নেন। প্রত্যেকটি যুদ্ধক্ষেত্রেই তিনি ক্রুসেডারদের পরাজিত করতে থাকেন। রওহা শহরটি আবার মুসলমানদের দখলে চলে আসে। ক্রুসেডারদের পরাজয়ের খবর সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়লে আবারো পোপ তৃতীয় কনরাড এবং ফ্রান্সের শসক সপ্তম লুইয়ের নেতৃত্বে নয় লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ইউরোপ থেকে রওয়ানা হয়। এই বাহিনীতে নারীরাও ছিল। প্রথম ক্রুসেডের মতো এ বাহিনীর সৈন্যরাও অত্যন্ত উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। সপ্তম লুইয়ের বাহিনীর একটি বড় অংশ সালজুকীদের হাতে ধ্বংস হয়। তারা যখন ইন্তাকিয়ায় পৌছে তখন তাদের তিন চতুর্থাংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। অবশিষ্ট সৈন্যরা অগ্রসর হয়ে দামেশ্ক অবরোধ করে। কিন্তু সাইফুদ্দীন জঙ্গী ও নূরুদ্দীন জঙ্গীর সম্মিলিত বাহিনীর প্রচেষ্টায় ক্রুসেডারদের পরিকল্পনা ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। সপ্তম লুই ও কনরাডকে আবার ইউরোপের সীমান্তের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এভাবে দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ ব্যর্থ হয়ে যায়।


মিসরে নূরুদ্দীন জঙ্গীর দখর প্রতিষ্ঠা

ইতিমধ্যে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন হয় এবং ইসলামের ইতিহাসে এমন এক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে যার অসাধারণ কৃতিত্ব ও অবদান আজও মুসলমানদের জন্য শিক্ষণীয়। এ মহান ব্যক্তি ছিলেন গাজী সালাহুদ্দীন আইয়ূবী। মিসরের ফাতেমী খলীফা ফায়েজ বিল্লাহর এমন ক্ষমতা ছিল না যে, তিনি খৃস্টানদের স্রোত প্রতিহত করবেন। তার মন্ত্রী শাদের সাদী ক্রুসেডারদের বিপদ অনুভব করে নূরুদ্দীন জঙ্গীকে মিসরে হামলার আহবান জানালেন। নূরুদ্দীন জঙ্গী নিজ ভাই আসাদুদ্দীন শিরকোহকে এ অভিযানে নিযুক্ত করলেন। সেমতে আসাদুদ্দীন মিসরে প্রবেশ করে খৃস্টানদের নাস্তানাবুদ করলেন। কিন্তু শাদের বিশ্বাস ঘাতকতা করলেন এবং শিরকোহের বিরুদ্ধে খৃস্টানদের সাথে আঁতাত করলেন। ১১২৭ খৃস্টাব্দে শিরকোহ আবার মিসরে হামলা চালালেন এবং আলেকজান্দ্রিয়া দখলের পর মিসরের অধিকাংশ এলাকা আয়ত্ত করে নিলেন। সালাহুদ্দীন আইয়ূবী এসব অভিযানে শিরকোহের সহযোগী ছিলেন। শাদের সাদীকে অপরাধের কারণে প্রাণদণ্ড- দেয়া হয় এবং শিরকোহ হন খলীফা আজেদের মন্ত্রী। তারপর সালাহুদ্দীন আইয়ূবী তার স্থলাভিষিক্ত হন। খলীফা তাকে আল মালিকুন নাসির উপাধী দেন। খলীফা আজেদের ইন্তেকালের পর সালাহুদ্দীন আইয়ূবী মিসরে আব্বাসীয়দের নামে খুতবা চালু করেন। মিসরের স্বাধীন খলীফা হওয়ার পর সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদকে নিজ জীবণের লক্ষ সাব্যস্ত করেন।

হিত্তিন যুদ্ধ

মিসর ছাড়াও সালাহুদ্দীন ১১৮২ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সিরিয়া, মোসেল, আলেপ্পো ইত্যাদি এলাকা জয় করে নিজ সাম্রাজ্যের অন্তভূক্ত করেন। এ সময়ে ক্রুসেডার নেতা রিজনাল্ডের সাথে চার বছরের শান্তিচুক্তি হয়। সেমতে উভয়ে পরস্পরকে সাহায্য করতে বাধ্য ছিলেন। কিন্তু এ চুক্তি কাগজ কলমেই সীমিত থেকে যায়। ক্রুসেডাররা যথারীতি বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনা সৃষ্টিতে লিপ্ত থাকে এবং মুসলমানদের কাফেলার ওপর হামলা অব্যাহত রাখে।

১১৮৬ খৃস্টান রিজনাল্ড এমন ধৃষ্টতা দেখায় যে, আরো কয়েকজন খৃস্টান নেতাকে সাথে নিয়ে মদীনা মুনাওয়ারায় হামলার উদ্দেশ্যে হেজাজে অভিযান চালায়। সালাহুদ্দীন আইয়ূবী তার তৎপরতা প্রতিহত করার জন্য পদক্ষেপ নেন এবং অবিলম্বে রিজনাল্ডকে ধাওয়া করতে করতে তাকে হিত্তিন গিয়ে ধরে ফেলেন। সুলতান সেখানে শত্রুবাহিনীর ওপর এমন এক আগ্নেয় উপাদান নিক্ষেপ করেন, যাতে মাটিতে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগ্নেয় পরিবেশ ১১৮৭ খৃস্টাব্দে হিত্তিন সংঘটিত হয় ইতিহাসের ভয়াবহতম যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ফলে তিরিশ হাজার খৃস্টান সৈন্য নিহত হয়। বন্দী হয় ওই পরিমাণে। রিজনাল্ড বন্দী হন। সুলতান নিজ হাতে তার দেহ থেকে মাথা ছিন্ন করেন। এ যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী খৃস্টানদের এলাকা সমূহে ছেয়ে ফেলে।


বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়

হিত্তিনে জয় লাভের পর সালাহুদ্দীন আইয়ূবী বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মনোযোগ দেন। এক সপ্তাহ ধরে রক্তক্ষয়ী পর খৃস্টানরা অস্ত্র ফেলে দেয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। ৯১ বছর পর বায়তুল মুকাদ্দাস আবার মুসলমানদের আয়ত্তে আসে। বায়তুল মুকাদ্দাসের বিজয় ছিল সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। কিন্তু তিনি ক্রুসেডারদের মতো আচরণ করলেন না। তিনি খৃস্টানদের ওপর কোন প্রকার অত্যাচার নির্যাতন হতে দিলেন না। তাদেরকে তিনি চল্লিশ দিনের মধ্যে শহর ছেড়ে চলে যেতে অনুমতি দিলেন। দয়ালু সুলতান মুক্তিপণ হিসেবে নির্ধারণ করলেন মামুলি অর্থ। তাও যারা পরিশোধ করতে অপারগ হলো, তাদেরকে তিনি এমনিতেই মুক্তি দিলেন। কারো কারো মুক্তিপণ তিনি নিজের পক্ষ থেকে দিয়ে দিলেন। তখন থেকে প্রায় ৭৬১ বছর পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদেরই আয়ত্তে ছিল। তারপর ১৯৪৮ সালে এ যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সের ষড়যন্ত্রে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলকে প্রতিষ্ঠা করা হয়ে। বায়তুল মুকাদ্দাসের অর্ধেক চলে যায় ইয়াহুদীদের দখলে। কিন্তু ১৯৬৭ এ আরব ইসরাইল যুদ্ধে বায়তুল মুকাদ্দাসের পুরো দখল নিয়ে নেয়ে ইসরাইল।


তৃতীয় ক্রুসেড

বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের হাতে চলে যাওয়া ক্রুসেডারদের জন্য মৃত্যুর পয়গামের চেয়ে কম ছিল না। মুসলমানদের এ বিজয়ের খবরে সারা ইউরোপে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ফলে তৃতীয় ক্রুসেডের আয়োজন শুরো হয়। পুরো ইউরোপ এতে যোগ দেয়। জার্মান সম্রাট ফ্রেডারিক বারব্রোসা, ফ্রান্সের সম্রাট ফিলিপ অগাস্টাস ও ইংল্যাণ্ডর রাজা রিচার্ডশেরদিল নিজেরাই এ যুদ্ধে অংশ নেন। পাদ্রী ও ধর্মযাজকরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে খৃস্টানদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করেন।

খৃস্টান বিশ্ব এত বিশাল সেনাবাহিনী আগে কখনো তৈরি করেনি। অসংখ্য সৈন্যের এ বাহিনী রওয়ানা হয়ে আক্কা বন্দর অবরোধ করে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী একাকী আক্কা বন্দর রক্ষার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করে রেখেছিলেন। কিন্তু ক্রুসেডারদের কাছে ইউরোপ থেকে লাগাতার সাহায্য আসতে থাকে। এক যুদ্ধে দশ হাজার খৃস্টান সৈন্য নিহত হয়। কিন্তু তবুও ক্রুসেডাররা অবরোধ বহাল রাখ। যেহেতু অন্য কোনো ইসলামী রাষ্ট্র থেকে সুলতানের প্রতি সহায়তার হাত বাড়ানো হলো না, এজন্য ক্রুসেডারদের অবরোধে শহরবাসীর সাথে হাত সুলতানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সুলতান সবরকমের চেষ্টা সত্ত্বেও মুসলমানদের কোনো সাহায্য পৌঁছাতে পারলেন না। নিরুপায় হয়ে শহরবাসীরা নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিতে শহরটি খৃস্টানদের হাতে ছেড়ে দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। দু’পক্ষের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়। সেমতে মুসলমানরা দু’লাখ স্বর্ণমূদ্রা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ পরিশোধে সম্মত হয় এবং মহাক্রস ও পাঁচশ খৃস্টান বন্দীকে ফেরত দেয়ার শর্ত মেনে নিয়ে মুসলমানরা অস্ত্র ফেলে দেয়ে। মুসলমানদেরকে সব সহায় সম্পদ নিয়ে শহর থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু রিচার্ড বিশ্বাসঘাতকতা করেন এবং অবরুদ্ধ লোকদেরকে হত্যা করেন।

আক্কার পরে ক্রুসেডাররা ফিলিস্তিনের আসকালান বন্দরের দিকে অগ্রসর হয়। আসকালান পৌঁছানোর পথে সুলতানের বাহিনীর সাথে খৃস্টানদের এহার বারটি লড়াই হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আরসুভের লগাই। সুলতান বীরত্ব ও সাহসিকতার উজ্জ্বল নমুনা পেশ করেন। কিন্তু যেহেতু কোন মুসলিম রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিশেষ করে বাগদাদের খলীফার পক্ষ থেকে কোন সাহায্য এলো না, এজন্য সুলতানকে শেষ পর্যন্ত পিছপা হতে হলো। ফিরে আসার সময় সুলতান নিজেই আসকালান শহর ধ্বংস করে দিলেন। ক্রুসেডাররা যখন সেখানে পৌঁছল, তখন ইটের স্তুপ ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। এরই মধ্যে সুলতান বায়তুল মুকাদ্দাস রক্ষার সব আয়োজন সম্পন্ন করলেন। কেননা এবার ক্রুসেডারদের টার্গেট ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস। সুলতান তার ছোট একটি বাহিনী নিয়ে খৃস্টানদের বিশাল বাহিনী অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে প্রতিহত করতে লগলেন। বিজয়ের কোন আশা দেখতে না পেয়ে ক্রুসেডাররা সন্ধির আবেদন জানায়। দু’পক্ষে সন্ধি স্থাপিত হয়। এরই মাধ্যমে তৃতীয় ক্রুসেড শেষ হয়।

এ ক্রুসেডে খৃস্টানরা আক্কা বন্দর ছাড়া আর কিছুই লভ করতে পারেনি। তারা বিফল হয়ে ফিরে যায়। রিচার্ড শেরদিল সুলতানের বদন্যতা, উদারতা ও বীরত্বে মুগ্ধ হন। জার্মান সম্রাট পালিয়ে যাওয়ার সময় নদীতে ডুবে মারা যান এবং এসব যুদ্ধে প্রায় ছয় লাখ খৃস্টান সৈন্য প্রাণ হারায়।

চুক্তির শর্তগুলো ছিল :
০১. বায়তুল মুকাদ্দাস যথারীতি মুসলমানদের হাতে থাকবে।
০২. আরসুভ, হায়ফা, ইরাফা ও আক্কা ক্রুসেডারদের হাতে চলে যায়।
০৩. আসকালান স্বাধীন এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
০৪. পর্যটকদের আসা যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।
০৫. মহাক্রস যথারীতি মুসলমানদের আয়ত্তে থেকে যায়।


চতুর্থ ক্রুসেড (১১৯৫ খৃ.)

আইয়ূবী সুলতান আল মালিকুল আদেলের হাতে খৃস্টানরা দৃষ্টান্তমূলক পরাজয় বরণ করে এবং ইয়াফা শহর মুসলমানদের আয়ত্তে চলে আসে।

পঞ্চম ক্রুসেড (১২০৩ খৃ.)

ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনোপলে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ধ্বংস সাধন করে।

ষষ্ঠ ক্রুসেড (১২২৭ খৃ.)

পোপ এনভিসেন্টের নেতৃত্বে আড়াই লাখ জার্মান সৈন্যের বিশাল বাহিনী সিরিয়ার উপকূলে আক্রমন করে। আইয়ূবী শাষক আল আদল নীলনদের মোহনায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। খৃস্টান বাহিনী নিরাশ হয়ে ফিরে যায়।

সপ্তম ক্রুসেড

আল মালিকুল কামেল ও তার ভাইদের মধ্যে বিরোধের কারণে বায়তুল মুকাদ্দাস শহর ক্রুসেডারদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু কামেলের উত্তরসূরী সালেহ তা আবার ক্রুসেডারদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেন। বায়তুল মুকাদ্দাস যথারীতি মুসলমানদের আয়ত্তে থেকে যায়।

অষ্টম ক্রুসেড

ফ্রান্সের সম্রাট নবম লুই মিসরে হামলা চালান। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর কাছে পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান।

নবম ক্রুসেড

ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ড ও ফ্রান্সের রাজা যৌথভাবে সিরিয়র হামলা চালান। মুসলমানরা ইংরেজ ফরাসী যৌথবাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে দেয়। এ যুদ্ধের ফলে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন থেকে ক্রুসেডারদের অস্তিত্ব নিশ্চিন্ন হয়ে যায়। ক্রুসেডারদের মধ্যে আর যুদ্ধের সাহস রইল না। এদিকে মুসলমানরা নিজেদের এলাকা রক্ষায় সচেতন হয়ে যায়।

নিজেদের দীর্ঘ যুদ্ধের ধারা শেষ হয় এবং খৃস্টানরা ধ্বংস ও পরাজয় ছাড়া আর কিছু অর্জন করতে না পারায় তাদের যুদ্ধের উম্মাদনা থিতিয়ে যায়। ক্রুসেড যুদ্ধসমূহের অবসান ঘটে।

অন্যান্য ক্রুসেড

এখনে যে নয়টি ক্রুসেডের বিবরন দেয়া হলো, তাছাড়া আরো কয়েকটি ক্রুসেড সংঘটিত হয়। সেগুলোও কম গুরুত্ব পূর্ণ নয়। যেমন ১২১২ খৃস্টাব্দে বালকদের ক্রুসেড নামে এক বিশেষ আয়োজন করা হয়। খৃস্টান পাদ্রীদের মতে বয়স্ক মানুষেরা পাপী হয়ে থাকে। পাপীরা থাকার কারণে ক্রুসেড বাহিনী জয় লাভ করতে পারছে না। যেহেতু বালকেরা নিস্পাপ হয়। অতএব যদি তাদের নিয়ে একটি বাহিনী গঠন করা হয়, তাহলে বিজয় আসতে পারে। সেমতে ৩৭ হাজার বালকের এক বিশাল বাহিনী গঠন করা হয়। ফ্রান্স থেকে ৩০ হাজার বালকের বাহিনী রওয়ানা হয় সেনাপতি স্টিফেনের নেতৃত্বে। আর জার্মান থেকে নিকোলসের নেতৃত্বে রওয়ানা হয় ৭ হাজার বালক। কিন্তু এসব বালকের কেউ বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছাতে পারেনি। বরং ফ্রান্সের উপকূলয়ি এলাকা ও ইতালীতে তাদের সবাইকে গোলাম বানিয়ে নেয়া হয়। কিংবা তারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। কিংবা নিজেদের মধ্যে লড়াই করে শেষ হয়ে যায়। বালকদের এ ক্রুসেড হয় পঞ্চম ক্রুসেডের আগে।

ইউরোপে উসমানী খেলাফতের সম্প্রসারণ ঠেকানোর জন্য চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে যেসব যুদ্ধ হয়, ইউরোপীয়রা সেগুলোকেও ক্রুসেড নাম দেয়।

১৪৫৬ খৃস্টাব্দে উসমানীরা বেলগ্রেড অবরোধ করলে তা ভাঙ্গার জন্য ইউরোপীয়রা সর্বশক্তি নিয়োগ করে। তখন উসমানী সুলতান ছিলেন কনস্টান্টিনোপল বিজয়ী মুহাম্মাদ। তিনি বেলগ্রেড জয় করতে সক্ষম হলেন না। ক্রুসেডাররাই বিজয়ী হলো। অবশ্য অনেক পরে ১৫২১-এর ২৯ আগস্ট সুলতান প্রথম সুলায়মান বেলগ্রেড জয় করে উসমানী সাম্রজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেন।


ফলাফল

দু’শতাব্দী ধরে চলতে থাকা যে ক্রুসেড যুদ্ধ মুসলমানদের উপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, তাতে ধ্বংস ও নাশকতা ছাড়া কিছুই অর্জন করতে পারেনি ইউরোপীয়রা। এভাবে এই ধর্মীয় উম্মাদনা
প্রথমত: অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক বিপর্যয়ের কারণ হয়। এসব যুদ্ধ ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে নেয়ার জন্য। কিন্তু তা যথারীতি মুসলমানদের দখল থেকে যায়।
দ্বিতীয়ত: খৃস্টান ও মুসলমানদের মাঝখানে বৈরিতার মজবুত দেয়াল তৈরি হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত তা বহাল আছে। দু’ধর্মের মানুষের মধ্যে স্থায়ী বিরোধের পিছনে রয়েছে এসব যুদ্ধ। বর্তমানে ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও নতুন বিশ্বব্যবস্থার নামে গোটা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পশ্চিমা ও মার্কিন পরিকল্পনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
তৃতীয়ত: ইউরোপের যুদ্ধের উম্মাদনা যখন থেমে যায়, তখন তারা গীর্জাগুলোর প্রভাব ও কর্তৃত্ব অনুধাবন করতে পরে। ফলে গীর্জার কর্তৃত্বের সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, যাতে প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে গীর্জার প্রভাব কমে যায়।
চতুর্থত: ইউরোপের অসভ্য লোকেরা যখন মুসলমানদের সংস্পর্শে আসে, তখন মুসলমানদের শিক্ষা ও সভ্যতার উন্নতি দেখে অভিভূত হয়ে যায়। ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয়ের কারণে তাদের মানসিকতায় বিপ্লব সৃষ্টি হয় এবং জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার জন্য ইউরোপের পরিবেশ অনুকূল হয়ে যায়। তাছাড়া ইউরোপে সামন্ত প্রথার অবসান ঘটে এবং নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
পঞ্চমত: ইউরোপে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য লেনদেনের পরিবর্তে মুদ্রা ব্যবস্থা চালু হয়। তাছাড়া শিল্প ও কারিগরি ক্ষেত্রেও ইউরোপে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। ইউরোপের স্থাপত্য শিল্পও ইসলামী স্থাপত্য রীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়।