মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা নয়, হিন্দুদের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার পতন হয়েছিল।
Image result for মীর জাফরমীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা নয়, হিন্দুদের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার পতন হয়েছিল।

মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা নয়, হিন্দুদের বিশ্বাসঘাতকতায়! বাংলার পতন হয়েছিল।
এক বিরাট ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি, যা খণ্ডন করার দরকার আছে। সবাই সব সময় নবাবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্নে মীরজাফরকেই একচেটিয়া দোষ দিয়ে দেয়, কিন্তু আড়াল করে যাই প্রকৃত সত্যকে।
ইতিহাস বলে, মীরজাফর একা কখনোই মূল বিশ্বাসঘাতক ছিলো না। বরং মীরজাফর ছিলো বিশ্বাসঘাতকদের বানানো একটা পুতুল(যার নিজের কোন যোগ্যতা ছিলো না), যখনই তার দ্বারা বিশ্বাসঘাতকদের স্বার্থ উদ্ধার হয়েছে, তখনই তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে বিশ্বাসঘাতকরা। বেরিয়ে এসেছে প্রকৃত চক্রান্তবাজদের চেহারা।
ইতিহাসে মীরজাফরের আবির্ভাব ঘটেছিলো অনেক পরে।
নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যে সরাতে হবে তার পরিকল্পনা অনেক আগেই করেছিলো তিন হিন্দু বিশ্বাসঘাতক জগৎশেঠ, উমিচাঁদ ও রাজবল্লভ মিলে। জগৎশেঠের বাড়িতে এক গোপন মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত হয় যে, সিরাজউদ্দৌলাকে সরাতে হবে। সেই মিটিং এ মহিলার ছদ্মবেশে পালকীতে করে যোগ দিয়েছিলো ইংরেজ দূত ওয়াটস। মিটিং এ সিদ্ধান্ত হয় সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করা হবে, আবার মুসলমানদের উত্তেজিত করা যাবে না। এ জন্য সিরাজের আত্মীয় মীর জাফরকে বসানো হবে। মি. ওয়াটস তখন বললো-
সিরাজের সাথে লড়তে যে বিরাট অর্থের প্রয়োজন তা আমাদের কাছে নেই।’ তখন জগৎশেঠ বললো- ‘টাকা যা দিয়েছি (মানে এতদিন বেঈমান ইংরেজদের সেই টাকা দিতো), আরো যত দরকার আমি আপনাদের দিয়ে যাবো, কোন চিন্তা নাই”।
(তথ্যসূত্র: ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা, ২৩২)

এই মিটিং এর পর সিরাজকে সরাতে ঘসেটি বেগমকে বুঝানোর দায়িত্ব ছিলো রাজা রাজবল্লভের উপর। আর মীরজাফরকে বুঝানোর দায়িত্ব ছিলো উমিচাঁদের উপর। উমিচাঁদ মীরজাফরকে লোভ দেখায়, তুমি আমাদের দলে থাকলে তোমাকে পরবর্তীতে সিংহাসনে বসানো হবে। (বি: দ্র: যারা ব্রিটিশদের দালালি করতে পারতো, তাদেরকে রাজা উপাধি দেওয়া হতো। যেমন রাজা রামমোহন রায়, রাজা নবকৃষ্ণ)।
এরপর জগৎশেঠের বাড়িতে দফায় দফায় মিটিং হয়। সেখানে উপস্থিত থাকে জগৎশেঠ, রাজা মহেন্দ্ররায় (রায় দুর্লভ), রাজা রামনারায়ণ, রাজা রাজবল্লভ, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও মীরজাফর। ঐ মিটিংয়েই এক হিন্দু সরাসরি বলে বসে, “মুসলিম নবাব না করে হিন্দু নবাব করা হোক”। তখন কৃষ্ণচন্দ্র মীর জাফরের দিকে দৃষ্টিপাত করে থতমত খেয়ে যায় এবং বলে- ‘না, আমরা মীরজাফরকে দিয়েই সিরাজকে সরাতে চাই।’ উদ্দেশ্য ছিলো- মুসলমানগণ ক্ষেপে উঠবে না, মুসলমান নবাবের পরিবর্তে মুসলমান নবাব হবে মাত্র। এ বিষয়টি নিয়ে অনেক তর্ক হয়। তখন জগৎশেঠ বলে- “কৃষ্ণচন্দ্রের কথাই ঠিক আছে। আমরা কেউ নবাব হলে বিপদ আছে।”
(তথ্যসূত্র: ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা, ২৪৩। নবাব সিরাউদ্দৌলা- ডি এল রায়)
ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, মীরজাফর ছিলো যোগত্যাহীন এক খেলার পুতুলমাত্র, পেছন থেকে মূল কলকাঠি নেড়েছিলো দাদারা। দিয়েছিলো সমর্থন ও পর্যাপ্ত অর্থ সরবরাহ।
এখন হয়ত বলতে পারি, জগৎশেঠ কিভাবে টাকা দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করলো? তার ব্যক্তিগত টাকা সে দিতেই পারে।
কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। শেঠ পরিবারের পূর্ব পুরুষ হীরানন্দ ছিলো অত্যন্ত দরিদ্র, যারা অভাবের জ্বালায় নিজ ভিটামাটি ত্যাগ করেছিলো। মুসলমান নবাব ও সম্রাটদের ছাত্রছায়ায় তারা পেয়েছিলো অর্থসম্পদ। এই ‘শেঠ’ উপাধিও মুসলমানদের দেওয়া। মুসলিম সম্রাট ও নবাবদের দয়াদানেই এত টাকার মালিক হয়ে ওঠে শেঠ পরিবার। শেঠ পরিবার সব সময় মুসলিম শাসকদের তোষণ করতো, ফলে শেঠ পরিবারের উপর সব সময় মুগ্ধ থাকতো সম্রাটরা। সম্রাট মুহম্মদ শাহ জগৎশেঠ উপাধি দিয়েছিলো এবং তার জন্য মতির মালা ও হাতি উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়েছিলো। উল্লেখ্য, মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যুর পর তার বাড়ির টাকা শেঠদের বাড়িতে জমা রাখা হয়েছিলো, যার পরিমাণ ঐ সময় ৭ কোটি টাকা।, যা শেঠ পরিবার আর ফেরত দেয়নি। (সূত্র: রিয়াজুস সালাতিন, Stewarts History of Bengal, মুর্শিদাবাদ কাহিনী, ৫৬ পৃষ্ঠা, নিখিল চন্দ্র রায়, ঐতিহাসিক চিত্র, অক্ষয় কুমার মৈত্র)।
অর্থাৎ মুসলমানদের থেকে পাওয়া অর্থই মুসলিম শাসন অবসান করতে ব্যবহার করেছিলো জগৎশেঠ। এ জন্য ইংরেজ ঐতিহাসিকগণ মীর জাফরের কথিত বিশ্বাসঘাতকতা নয় বরং হিন্দু মহাজনদের টাকাকেই মূখ্য করেছে। এ সম্পর্কে এক ইংরেজ ঐতিহাসিক বলেন-
The Rupees of the Hindu banker, equally with the sword of the English colonel contributed to the overthrow of the Mahammedan power in Bengal.
(ঐতিহাসিক চিত্র, অক্ষয় কুমার মৈত্র ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যায় দ্রষ্টব্য। ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা, ২৩৬)

উপরের ইংরেজী বক্তব্যে স্পষ্ট লেখা - ‘মুসলমানদের শাসনের পতন ঘটাতে দুটি জিনিস কাজ করেছে - প্রথমত হিন্দুদের টাকা, দ্বিতীয়ত্ব ইংরেজদের তরবারি।’ এতে বোঝা যাচ্ছে, ঐ সময় ঐতিহাসিকদের কাছে মুসলিম শাসন অবসানের জন্য মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকার খুব একটা মূল্য ছিলো না। উল্লেখ্য, সিরাজ-উদ-দৌলা পতনের মত ঘটনার গোড়ার ঘটনা হচ্ছে ইংরেজদের কলকাতা দুর্গ নির্মাণ করা। এই দুর্গ নির্মাণকে কেন্দ্র করেই সিরাজের সাথে ইংরেজদের দ্বন্দ্ব বাধে, যার অনেক পরের ফল হচ্ছে পলাশীর যুদ্ধ। ইতিহাস বলছে, ঐ দুর্গ নির্মাণের মত অর্থ ইংরেজদের ছিলো না, সেই অর্থ কিন্তু দিয়েছিলো রাজবল্লভ।
আলীবর্দীর আমলে প্রজাদের সর্বনাশ করে প্রচুর অর্থ সঞ্চয় করেছিলো সামান্য কেরানী রাজবল্লভ। সেই টাকা নিজপুত্র কৃষ্ণরায়ের মারফত দুর্গ নির্মাণে পাচার করেছিলো রাজবল্লভ। দুর্গ নির্মাণের পরই কলকাতায় অভিযান চালিয়েছিলো নবাব। এ সময় গ্রেফতার হয় বিশ্বাসঘাতক হলওয়েল, কৃষ্ণদাস ও উমিচাঁদ। কিন্তু সিরাজের অপরাধ ছিলো, সে ঐ তিন বিশ্বাঘাতকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তিনজনকেই ক্ষমা করে দেয়। যার ফল নবাবকে পরে পেতে হয়েছিলো। (তথ্যসূত্র: ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমদ মোর্তজা, ২৪৩)

এখানে একটা কথা আসতে পারে, হিন্দুরা কেন নবাব সিরাজের মূলকেন্দ্র তথা বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের পতন চাইবে?
এর উত্তর হতে পারে, হয়ত মনে মনে মুর্শিদাবাদকে কখনই সহ্য করতে পারতো না হিন্দুরা। কারণ মুর্শিদাবাদকে বাংলার রাজধানী করেছিলো মুর্শিদকুলী খান, যেই মুর্শিদ কুলী খান আগে ছিলো এক কুলীন ব্রাহ্মণ, যে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়ে যায়। এই কারণে মুর্শিদাবাদের উপর ক্ষোভ বা হিংসা ছিলো গোঁড়া হিন্দুদের।
আবার অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, একজন শেঠ(জগৎশেঠ)কিভাবে একজন নবাবকে সরিয়ে দিতে মূল ভূমিকা পালন করলো?
এর উত্তর হচ্ছে, ঐ সময় অর্থকড়ির একটা বড় হিসেব হতো এই শেঠ পরিবারের মাধ্যমে।
মুসলিম শাসকদের তোষণ করে তারা সে সুযোগটা আদায় করে নিয়েছিলো। সারা ভারতের বহু স্থানেই তাদের গদি ছিলো। ইংরেজরা শেঠ পরিবারের নাম দিয়েছিলো ‘ব্যাংকার’। বর্তমানে যারা ইহুদীদের রথচাইল্ড পরিবার সম্পর্কে ধারণা রাখেন তাদের জন্য বিষয়টি বুঝতে সোজা হবে। বর্তমানে সারা বিশ্বের শাসক কে হবে, আর কে না হবে, এটা পর্দার আড়াল থেকে মূল চাবিকাঠি নাড়ে রথচাইল্ড পরিবার। এরা টাকার জোরে মূল কাজটি করে থাকে। ঐ সময়ও টাকার জোরে জগৎশেঠ পেছন থেকে বাংলাকে ইংরেজদের হাতে তুলে দিতে মূল ভূমিকা পালন করেছিলো। সত্যিই বলতে, ইতিহাস পড়লে একজন স্বল্প শিক্ষিত লোকও বুঝতে পারবে বাংলার শাসন অবসানে মীর জাফর ছিলো একটা পুতুল মাত্র। কারণ তাকে সিংহাসনে বসানোর পর তার কোন ক্ষমতা ছিলো না, তাকে যা বলা হতো সে তাই করতো।
তাও মাত্র ৩ বছরের মাথায় তাকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বসানো হয় মীরকাশেমকে। দেখাগেলো মীরকাশেম যখন জগৎশেঠের বিরুদ্ধে গেলো, তখনই ইংরেজরাই মীরকাশেমের বিরুদ্ধচারণ শুরু করলো। এর দ্বারা প্রমাণ হয় মীরজাফর ও মীরকাশেমের সাথে ইংরেজদের সম্পর্ক, ইংরেজ ও জগৎশেঠ তথা হিন্দুদের সাথে সম্পর্কের তুলনায় কিছুই ছিলো না।
তাই লেখার শেষে আবার বলতে হচ্ছে, মীরজাফরের কথিত বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং হিন্দুদের সাম্প্রদায়িক বিশ্বাসঘাতকতাই বাংলার পতনের মূল কারণ। তাই আমি আর কিছু বলতে চাই না, আপনার মুল্যবান জ্ঞান দিয়ে অনুধাবন করুন বিশ্বাসঘাতক কি সে নাকি তারা।
ঘষেটী বেগমসহ বিশ্বাসঘাতকরা ছিল মোট পাঁচ জন এবং এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন চার জন। প্রধান চার জনের এক জন ছিলো মুসলিম আর তিনজনই হিন্দু বা প্রধান পাঁচ জনের দুইজন ছিলো মুসলিম আর তিনজনই হিন্দু। বাংলাকে শতভাগ পরাধীন করার জন্য মুসলিম কতভাগ দায়ী মিরজাফর কতভাগ দায়ী!!!
হিন্দু শাসকের অত্যাচার থেকে বৌদ্ধদের রক্ষা করেছে মুসলিম শাসকেরাই
Image result for হিন্দু রাজাহিন্দু শাসকের অত্যাচার থেকে বৌদ্ধদের রক্ষা করেছে মুসলিম শাসকেরাই

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে পাল বংশের প্রথম রাজা গোপালের মাধ্যমে বৌদ্ধদের শাসনামল শুরু হয় এবং বৌদ্ধদের শাসন ৪শ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। পরবর্তিতে দক্ষিন ভারত থেকে আগত সেন বংশের (ব্রাহ্মন) লোকেরা পালদের থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়। দক্ষিন ভারতীয় সেন ব্রাহ্মনরা ক্ষমতায় এসে বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু করে। সেন রাজাদের অত্যাচারে বৌদ্ধদের একটা অংশ নেপালে গিয়ে আশ্রয় গ্রহন করে। যে কারণে চর্যাপদ নেপাল থেকে আবিস্কৃত হয়।

বাঁচার তাগিদে বাধ্য হয়ে বৌদ্ধদের একটা অংশ হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে বর্ণ প্রথার সর্বনিন্মে স্থান পায়। বৌদ্ধদের আরেকটি অংশ দিল্লির মুসলিম শাসক কুতুবুদ্দিন আইবেকের শরণাপন্ন হয় এবং বৌদ্ধদের রক্ষায় বাংলায় মুসলিম সেনাবাহিনী পাঠানোর অনুরোধ করে। তিব্বতী বুদ্ধ ঐতিহাসিক কুলাচার্য জ্ঞানানশ্রীর বিবরনী থেকে জানা যায় মগধ থেকে এক দল ভিক্ষু মির্জাপুরে গিয়ে বখতিয়ারের সংগে দেখা করে তাকে মগধকে মুক্ত করতে আবেদন করে (Journal of the Varendra Research Society, Rajshahi, 1940)। বৌদ্ধদের অনুরোধে বখতিয়ার খিলজি তার বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন এবং সেন বংশের রাজা লক্ষণ সেন কে পরাজিত করে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেন।

শূন্যপুরাণের ‘নিরঞ্জনের উষ্মা’ নামক অধ্যায়ে দেখা যায়-তাহারা (বৌদ্ধরা) মুসলমানদিগকে ভগবানের ও নানা দেবদেবীর অবতার মনে করিয়া তাহাদের কর্তৃক ব্রাহ্মণ দলনে নিতান্ত আনন্দিত হইয়াছিল।….ইতিহাসে কোথাও একথা নাই যে সেনরাজত্বের ধ্বংসের প্রাক্কালে মুসলমানদিগের সঙ্গে বাঙালি জাতির রীতিমত কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হইয়াছে। পরন্তু দেখা যায় যে বঙ্গবিজয়ের পরে বিশেষ করিয়া উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু, নব ব্রাহ্মণদিগের ঘোর অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে (ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-৫২৮)
মুসলিম শাসকদের উদারতা, বৌদ্ধদের প্রতি মুসলিমদের ভালো ব্যবহারের ফলে দলে দলে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে ‘বাংলার অর্ধেক বৌদ্ধ মুসলমান হইয়া গেলো’ (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বৌদ্ধধর্ম, পৃষ্ঠা ১৩১)। তবে মুসলমান হওয়ার এই প্রক্রিয়াটি রাতারাতি হয়ে যায়নি, রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে বৌদ্ধ-মুসলিম সংমিশ্রনের ফলে বৌদ্ধরা আস্তে আস্তে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে।

বখতিয়ার খিলজি ছাড়াও পূর্ব থেকে বাংলার অন্যান্য মুসলিমরা নির্যাতিত বৌদ্ধদের পক্ষে অবস্থান নেন। বৌদ্ধরা বখতিয়ার খিলজি ও তার বাহিনীকে দু-বাহু বাড়িয়ে বরণ করে নেন।বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিক আবদুস সাত্তার লিখেন; ”ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজীর আগমনে এদেশের সাধারণ মানুষ উৎফুল্ল হয়ে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিল।হোসেন শাহের বেলায়ও একই কথা”

এই শাসনের বৈশিষ্ট ছিল বাংলায় স্থানীয় বৌদ্ধদের সাথে মুসলিম আরবদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে উঠে। স্থানীয় ব্যবসা ছিল বৌদ্ধদের হাতে আর এই ব্যবসার সাথে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সৃষ্টি করে দেন মুসলিম বনিকগন। ফলে বৌদ্ধদের সাথে মুসলিমদের একটা সুসম্পর্ক তৈরী হয়।
বৌদ্ধদের দুর্দিনে মুসলিমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার ফলে বৌদ্ধরা মুসলিমদের সংস্পর্শে আসতে থাকে এবং ইসলাম দ্বারা অনুপ্রানিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। হিন্দু ধর্ম থেকেও অনেকে উচ্চ-নিম্ন বর্ণ বৈষম্যের কারণে ইসলামে আসতে থাকে।

কিন্তু উপনিবেশকালে পশ্চিমা ওরিয়েন্টালিষ্ট এবং ভারতীয় ইতিহাসবিদরা মিথ্যাচার করতে থাকে যে মুসলমানদের সাথে বৌদ্ধদের দ্বন্দ্বের কারনে বাংলা থেকে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী হারিয়ে গেছে। প্রফেসর Johan Elverskog তাঁর Buddhism and Islam on the Silk Road বইয়ে ভারতে বৌদ্ধ মুসলিম সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত এই মিথ্যাচার ও ধারাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। বৌদ্ধদের উপর মুসলিম সেনাপতি ও শাসকগন অত্যাচার করেছে এই ধারণাকে সে নাকচ করে দেয়।সে বলে; “…the stereotypical image of Muslims as hostile towards Buddhists has been constructed in the West, and “reaffirmed” with the Taliban’s destruction of the giant Buddha statues in Bamiyan in 2001” (pp. 1–4). অর্থাৎ, বৌদ্ধদের সাথে মুসলমানদের শত্রুতার প্রচলিত ধারণা পশ্চিমে তৈরি হয় এবং এটা আরো প্রতিষ্ঠিত হয় তালেবান কর্তৃক ২০০১ সালে (আফগানিস্তানের বামিয়ানে) বিশাল বৌদ্ধমুর্তি ধ্বংসের মাধ্যমে।

রেফারেন্সঃ

Baxter, Craig. 1998. Bangladesh: From a Nation to a State. Boulder, CO: Westview Press.

Chowdhury, M. Abdul Mu’min, The Rise and Fall of Buddhism in South Asia, London , 2008

Johan Elverskog, Buddhism and Islam on the Silk Road. Philadelphia: University of Pennsylvania Press, 2010

আবদুস সাত্তার, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলিম অবদান, মোশাররফ হোসেন খান (সম্পাদিত),বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা, ১৯৯৮, পৃষ্ঠাঃ২৭৫
ইসলাম না এলে বৌদ্ধ ধর্ম হিন্দুদের দ্বারা ভারতবর্ষ থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্নই হয়ে যেত
Image result for বৌদ্ধ ধর্মইসলাম না এলে বৌদ্ধ ধর্ম হিন্দুদের দ্বারা ভারতবর্ষ থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্নই হয়ে যেত
মুসলিমদের উপমহাদেশে আবির্ভাবের আগে থেকেই বৌদ্ধরা ক্ষমতাশালী হিন্দুদের প্রতাপে ছিল একেবারে কোণঠাসা। এমনকি গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুস্থান বিহারের প্রতিবেশী বাংলাতেও হিন্দু ব্রাহ্মণ, শাসক ও নেতারা সাধারণ জনগণকে বশীভূত করে ফেলতে পেরেছিলে। আসলে ইসলাম না এলে বৌদ্ধ ধর্ম হিন্দুদের দ্বারা ভারতবর্ষ থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্নই হয়ে যেত।

উঁচু বর্ণের ব্রাহ্মণরা ধর্ম বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখত। তারা বুদ্ধের দার্শনিক ভাবশিক্ষার বিরুদ্ধে ততটা সোচ্চার ছিল না। তবে ব্রাহ্মণ্যবাদের ভিত্তিপ্রস্তর অর্থাৎ, প্রাচীন কাল থেকে রক্ষা করে আসা বেদে দেয়া ব্রাহ্মণদের দৈবত্ব, প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বকে যখন বৌদ্ধবাদে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো তখন তারা তার সর্বাঙ্গীন বিরোধিতা করলে। বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ নিয়ে গবেষণা করা শ্রী নরেশ কুমার মনে করে, বৌদ্ধবাদের বিরোধিতা ও একইসাথে ক্ষয়িষ্ণু ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যবাদের পুনর্স্থাপনের জন্যে, ব্রাহ্মণ পুনর্জাগরণীরা তিন ধাপের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলে।
প্রথম ধাপে তারা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে ঘৃণা আর অত্যাচারের অভিযান শুরু করে। এরপরে তারা বৌদ্ধ ধর্মের ভালো দিকগুলো আত্মস্থ করে নেয় যাতে করে “নীচু” জাতের বৌদ্ধদের মন জয় করা যায়। কিন্তু বাছাইকৃত আত্মীকরণের এই ধাপে ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য যাতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয় তা নিশ্চিত রাখা হয়। বৌদ্ধবাদ ধ্বংস প্রকল্পের শেষধাপে – ‘গৌতম বুদ্ধ হিন্দু বিধাতা বিষ্ণুর আরেকটি অবতার ছাড়া আর কিছুই নয়’ – এই ধারণা চালু করে তা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

এভাবে বুদ্ধকে ব্রাহ্মণ্যবাদের সর্বদেবতার মন্দিরের অগুন্তি ঈশ্বরের সামান্য একটিমাত্র-তে পরিণত করা হয়। অবশেষে, বৌদ্ধরা মূলত শুদ্র আর অচ্ছুত হিসেবে জাতপ্রথায় আত্মীকৃত হল – আর এভাবেই নিজ জন্মভূমিতেই বৌদ্ধরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে লাগল।

নীলেশ কুমার বলে, “বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে চলা এই নির্মূলাভিযানকে বৈধতা দিতে ব্রাহ্মণ্য লেখাগুলোতে বৌদ্ধদের প্রচণ্ডভাবে তিরস্কার করা হয়। মনুসংহিতায় মনু বলে, “কেউ যদি বুদ্ধকে স্পর্শ করে […] তবে সে স্নান করে নিজেকে শুচি-শুদ্ধ করে নেবে।”

কুমার বলেন, “অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থের রচয়িতা ব্রাহ্মণ বর্ণের চাণক্য ঘোষণা করে, “যদি কেউ শক্য (বৌদ্ধ), অজিবিকাশ, শুদ্র বা নিষ্ক্রান্ত ব্যক্তিদের ঈশ্বর বা পূর্ব–পুরুষদের পূণ্যার্থে উৎসর্গিত ভোজসভায় যোগদান করে – তবে তার উপর একশ পানা অর্থদণ্ড আরোপিত হবে।” ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুজ্জীবনের পুরোধা শঙ্করাচার্য বৌদ্ধবাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড নিন্দামূলক কথার মাধ্যমে বৌদ্ধদের মনে সীমাহীন ভীতির সঞ্চার করে … পুরানের অনেক রচয়িতাও মিথ্যা কলঙ্ক, অপবাদ, চরিত্রহরণের মাধ্যমে ঘৃণার এই পরম্পরা অব্যাহত রাখে। এমনকি বিপন্ন সময়েও কোনো বৌদ্ধের বাড়িতে প্রবেশ করাকে ব্রাহ্মণদের জন্যে মহাপাপ হিসেবে তাদের ধর্মগ্রন্থ নারদীয় পুরানে আজ্ঞায়িত করা হয়। বিষ্ণু পুরানে বৌদ্ধদের মহা-মোহ হিসেবে উপাধিত করা হয়। এতে ‘বৌদ্ধদের সাথে কথা বলার পাপ’-কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, “যারা এমনকি বৌদ্ধ সন্তদের সাথে কথাও বলবে – তাদের নরকে যেতে হবে।”

কুশিনগর বা হার্রাম্বাতে গৌতম বুদ্ধ মারা যান বিধায় এটি বৌদ্ধদের কাছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্থান। এই নামকরা শহরের চাকচিক্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে ব্রাহ্মণরা এই কুৎসা রটায় যে এই শহরে মৃত্যু হলে সে সরাসরি নরকে চলে যাবে কিংবা পরজন্মে গাধা হয়ে জন্মাবে – কিন্তু ব্রাহ্মণীয় পবিত্র নগর কাশিতে মৃত্যু হলে সে সরাসরি স্বর্গে চলে যাবে।

এরপরে নরেশ কুমার বলে, “বুদ্ধের নাম কলুষিত করার পাশাপাশি এহেন ব্রাহ্মণ্য পুনর্জাগরণবাদীরা নিরপরাধ বৌদ্ধদের নিপীড়ন কিংবা এমনকি মেরে ফেলার তাগিদ হিন্দু রাজাদের দিতে থাকে। বাংলার শৈব ব্রাহ্মণরাজা শশাঙ্ক শেষ বৌদ্ধ সম্রাট হর্ষবর্ধনের বড় ভাই রাজ্যবর্ধনকে ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে হত্যা করে। এরপরে শশাঙ্ক বোধি গয়াতে গিয়ে বোধি বৃক্ষকে উপড়ে ফেলে – যার নিচে বসে ধ্যান করে গৌতম বোধি প্রাপ্ত হয়।


পাশের বৌদ্ধ বিহারে থাকা বৌদ্ধের প্রতিকৃতি তিনি সরিয়ে ফেলে তার জায়গাতে শিবের প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে দেয়। এরপরে বলা হয়ে থাকে যে শশাঙ্ক কুশিনগরের সব বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নির্বিচারে হত্যা করে। আরেক শৈব হিন্দু রাজা মিহিরকুল ১৫০০ বৌদ্ধ তীর্থস্থান সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে। শৈব রাজা তরামন কৌসম্বিতে থাকা বৌদ্ধ মঠ ঘষিতরাম ধ্বংস করেনবলে জানা যায়।

ব্রাহ্মণদের দ্বারা পাইকারী হারে বৌদ্ধ স্থাপনাগুলোর ধ্বংস ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধবাদের নির্মূল হওয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। বোধগয়ার মহাবোধি বিহারকে জোর করে শিব মন্দিরে পরিণত করা হয়েছে কিনা – তা নিয়ে বাদানুবাদ আজও চলছে। কুশিনগরের বুদ্ধের স্তুপ-প্যাগোডাকে রমহর ভবানী নামের এক অখ্যাত হিন্দু দেবতার মন্দিরে পরিবর্তিত করা হয়। জানা যায় যে আদি শঙ্কর অধিকৃত বৌদ্ধ আশ্রমের জায়গাতে হিন্দু শ্রীঙ্গেরী মঠ বানিয়েছিলেন। অযোধ্যার অনেক হিন্দু তীর্থস্থান, যেমন সবরীমালা, বদ্রীনাথ কিংবা পুরীর মত প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণ্য মন্দির আদতে একসময় ছিল বৌদ্ধ মন্দির।”

ইতিহাসবিদ এস. আর. গোয়েল এর মতে (লেখক – A History of Indian Buddhism) পুরোহিত বর্ণের ব্রাহ্মণদের শত্রুতার জন্যেই ভারতবর্ষে বৌদ্ধবাদের অবলুপ্তি ঘটেছে। গৌড়ের শাসক হিন্দু শৈব রাজা শশাঙ্ক (৫৯০-৬২৬) বোধি বৃক্ষ ধ্বংস করে – যার নিচে বসে ধ্যান করে গৌতম বোধিপ্রাপ্ত হয়। পুস্যমিত্র শুঙ্গ (১৮৫-১৫১ পূর্বাব্দ) বৌদ্ধদের প্রতি বৈরী ছিল। সে ধর্মীয় সূত্র লেখনিগুলোসহ বৌদ্ধ প্রার্থনালয় জ্বালিয়ে দেয়া ছাড়াও অসংখ্য বৌদ্ধ ভিক্ষুকে পাইকারী হারে হত্যা করে।

প্রথম সহস্রাব্দীর দ্বিতীয় অংশে বৌদ্ধদের অবস্থা সম্পর্কে আমরা যা জানি তা মূলত এসেছে সপ্তম শতাব্দীর চৈনিক বৌদ্ধ পদব্রাজক হিউয়েন সাং ভ্রমনবৃত্তান্ত থেকে। সাং এর বাংলা ভ্রমণকালে গোঁড়া হিন্দু শশাঙ্ক ছিল বাংলার শাসক। সে শশাঙ্ককে একজন “বিষাক্ত গৌড় সাপ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে – যে বাংলার বৌদ্ধ স্তুপ -মন্দিরগুলো ধ্বংস করে আর তার রাজ্যের একেক বৌদ্ধ সন্তদের মাথার জন্যে একশ স্বর্ণমুদ্রা করে পুরস্কার ঘোষণা করে। হিউয়েন সাং-সহ অনেক বৌদ্ধ সূত্রগুলোতে থানেসরের বৌদ্ধ রাজা রাজ্যবর্ধনের হত্যার জন্যে শশাঙ্ককে দায়ী করা হয়। হিউয়েন সাং লিখেছে, বোধ গোয়ার বোধি বৃক্ষ কাটা ছাড়াও ওখানকার বৌদ্ধ মূর্তিগুলোকে শিবলিঙ্গ দ্বারা প্রতিস্থাপন করে।

পালদের পরে ত্রয়োদশ শতকের বখতিয়ার খিলজি বাংলার শাসন অধিগ্রহণের আগে হিন্দু সেন রাজারা (১০৯৭-১২০৩) বাংলার অধিপতি ছিল। আর সেন’দের সময়ে শৈব হিন্দুরা পায় শাসকদের আনুকুল্য, আর ঐদিকে বৌদ্ধদের তিব্বতের দিকে ঠেলে সরিয়ে দেয়া হয়। পুরান গ্রন্থগুলো নিয়ে সামান্য গবেষণা করলেই দেখা যায়, এই ব্রাহ্মণ্য আখ্যানগুলো কীভাবে বৌদ্ধদের প্রতি শ্লেষ আর অবর্ণনীয় ভাষিক বর্বরতায় ভরা, যেখানে বৌদ্ধদের ক্ষতিকর আর ভয়ানক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

আসলে অশোকের পরে ভারতবর্ষের অধিকাংশ শাসকরাই হিন্দুত্বকে আনুকুল্য দেখানোর পাশাপাশি বৌদ্ধদের প্রতি ছিলেন বৈরী – আর এ কারণেই ভারতবর্ষে বৌদ্ধদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। অনেক দিক থেকেই বৌদ্ধবাদ সার্বিক অর্থে ম্রিয়মান হয়ে আসছিল। জনৈক ঐতিহাসিক বলে,
“গুপ্ত সম্রাজ্যের পর থেকে ভারতীয় ধর্মগুলো দিনে দিনে জাদুমন্ত্র ও যৌনতা-কেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক মর্মজ্ঞান লাভের মত সনাতনী চিন্তাধারা দিয়ে আবিষ্ট হতে থাকে, আর বৌদ্ধ ধর্মও এই ধারাগুলো দিয়ে প্রভাবিত হতে থাকে।”
এই অবিষ্টতার ফলাফল হিসেবে “বজ্রপাতের যান” হিসেবে বজ্রায়নের আবির্ভাব ঘটে। নতুন এই গোষ্ঠী ধর্মীয় মতবাদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে উন্মত্ততাকে আশির্বাদ দেয় – সাথে সাথে কৌমার্য ব্রতের প্রতিও দেখা দিতে থাকে শৈথিল্য।

দেখা যায়, যে নিজেদের দোষেই বৌদ্ধবাদ অনেকাংশে অবলুপ্ত হয়। নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত হিন্দুত্ববাদের সাথে এটি জনপ্রিয়তায় কোনোভাবেই টিকতে পারছিলনা। আদিশঙ্কর, মাধবাচার্য ও রামানুজ প্রমুখ হিন্দু দার্শনিক ও ধর্মবেত্তাদের আবির্ভাবে হিন্দুত্বে নবপ্রাণ ফিরে আসে – আর সেইসাথে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধবাদ দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকে।

শঙ্করাচার্য (৭৮৮-৮২০ খৃঃ) ও রামানুজ (১০১৭-১১৩৭) প্রান্তিক লোকদের কাছে পরিচিত বৈদিক সাহিত্যের আলোকে হিন্দু দর্শনকে পরিশীলিত করেন আর সেইসাথে এই নব মতবাদ প্রচার ও প্রসারে গড়ে তোলেন অসংখ্য মন্দির আর পাঠশালা। অন্যদিকে নানা পথ ও মতের সমন্বয়ের চেষ্টায় রত হিন্দুত্বের সর্বদেবতার আলয়ে গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে আত্মস্থ করে নেয়া হয়। হিন্দু ধর্মের মধ্যে থেকেই তাই একজন ভক্ত বুদ্ধকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতে পারত। এটাই ছিল বুদ্ধের জন্মস্থানেই বৌদ্ধ ধর্মের কফিনে মারা শেষ পেরেক। হিন্দুধর্ম তাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো – “নানা মতের বিশ্বাসীদের জন্যে আস্থা ও সন্তুষ্টির কেন্দ্র।” ব্যক্তিগত ঈশ্বরের স্থান করে দেয়া ছাড়াও তখন আবেগী ভক্তিমূলক গানের উত্থান শুরু হলো যা আগে দেখা যেতনা।

বৌদ্ধ ধর্মবিশারদদের মতে একাদশ শতকের আগে সাধারণ বৌদ্ধ জনতার ধর্মরীতি কিংবা আচরণবিধি তৈরী করা হয়নি। কিছু বৌদ্ধ ধর্ম গবেষক বৌদ্ধ ধর্ম ক্ষয়িষ্ণু ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ার পেছনে কিছু ভিক্ষুর সহজিয়া ও অলস পথাবলম্বনকে দায়ী করেছেন – যা কিনা স্বয়ং বুদ্ধের অপরিগ্রহ কিংবা অনধিকার রীতির বিপরীত। বৌদ্ধ মন্দিরগুলো অনেকক্ষেত্রেই অঢেল সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে দেখা হয়। বাঁচার জন্যে ভিক্ষাবৃত্তি করা এসব বৌদ্ধ সন্তদের অনেক সময়ই দেখা গেছে সাধারণ জনগনের পরিবর্তে নিপীড়ক শাসকদের সাথে সখ্য গড়ে তুলতে। আর এই প্রবণতা – এমনকি আজও বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলোতে দেখা যায়।

হিন্দু আর বৌদ্ধদের এই সহস্রাব্দী ধরে চলতে থাকা শত্রুতাতে সাধারণ লোকজন বিরক্ত হয়ে পড়ে – এতে করে অবশ্য সুফী সাধক ও মুসলিম অগ্রদূতদের প্রচেষ্টায় ইসলাম এতদ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। চমৎকার নৈতিক শিক্ষা, বর্ণবাদ-মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা, ভ্রাতৃত্ববোধ, সহজবোধ্য ও সহজসাধ্য বিশ্বাস ও আচারিক ব্যবস্থার কল্যানে ইসলাম এতদ অঞ্চলে জনপ্রিয় হতোই – প্রশ্নটা কেবল ছিল – কখন?


তাছাড়াও বৌদ্ধ ও হিন্দু শাসনামলের চাইতে ত্রয়োদশ শতক থেকে শুরু করে ভারতবর্ষের বিশাল অংশে মুসলিম শাসকদের আমলে জনগণের উপর আরোপিত শুল্কহার কমে আসে – যা প্রান্তিক ও বঞ্চিত ভারতীয়দের ইসলামের প্রতি অনুকুল মনোভাব তৈরীতে সহায়তা করে। পরে অবশ্য নিজেদের অবস্থান আরো সুসংহত করতে শাসক শ্রেণীর অনেকেও ইসলাম গ্রহণ করে নেন। আর এসব ঘটনা রাতারাতি ঘটেনি – বরং শতাব্দী ধরে এই ধারা চলাতে ইসলাম ভারতবর্ষের অনেক অঞ্চলে প্রধান ধর্মে পরিণত হয়।
হিন্দু রাজারাই বৌদ্ধদের নির্মুল করেছিল
Image result for হিন্দু রাজাহিন্দু রাজারাই বৌদ্ধদের নির্মুল করেছিল

ছয় শতকের গোড়ার দিক থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে এবং ক্রমান্বয়ে স্থানীয় রাজাদের উত্থান হতে থাকে এবং স্থানীয় রাজাদের হাতেই বাংলা এবং উত্তর ভারত শাসিত হতে থাকে। সাত শতকের শুরুতে (৬০১ খ্রিস্টাব্দে) পশ্চিম বঙ্গে হিন্দু রাজা শশাঙ্কের আবির্ভাব হয়। তার শাসনকাল ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। শশাঙ্ক ছিল চরম বৌদ্ধ বিদ্ধেষী। শশাঙ্কের নিষ্ঠুর অত্যাচারে অনেক বাঙালি বৌদ্ধ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় ( R .C. Majumdar, বাংলা দেশের ইতিহাসঃ প্রাচীন যুগ, ১৯৮৮, পৃঃ১২৮)

৬৩০ খ্রিস্টাব্দে ভারত ভ্ৰমণকারী চীনা পরিব্রাজক হিউয়ান সাং বলে রাজা শশাঙ্ক গয়ায় বোধিবৃক্ষ ছেদন করে এবং নিকটবর্তী বৌদ্ধ মন্দির থেকে বুদ্ধমূর্তি সরিয়ে সেখানে শিবের মূর্তি প্রতিস্থাপন করে [T. Walters, on Yuan Chwang’s Travels in India (A.D 629-45), 1905, page 111, 115]। এছাড়াও পাটালিপুত্তা ও কুশীনারাতে বৌদ্ধদের অনেক বিহার এবং সৌধ ধ্বংস করা হয় (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৯২)।

রাজা শশাঙ্কের বৌদ্ধনীতি সম্পর্কে রামাই পন্ডিতের শূন্য পুরান থেকে ধারণা পাওয়া যায়। ‘সেতুবন্ধ হইতে হিমালয় পর্যন্ত যেখানে যত বৌদ্ধ আছে তাহাদের বৃদ্ধ ও বালকদের পর্যন্ত যে না হত্যা করিবে, সে প্রাণদন্ডে দণ্ডিত হইবে-রাজভৃত্যদিগের প্রতি রাজার এই আদেশ (শ্রীচারু বন্দোপাধ্যায়, রামাই পন্ডিতের শূন্য পুরান, পৃষ্ঠা ১২৪)।

সংখ্যালঘু হিন্দুরা মেজরিটি বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের শাসন করতে গিয়ে যেই দমন-নিপীড়ন শুরু করে তাতে এক গুমোট পরিবেশ তৈরী হয়, শশাঙ্কের মৃত্যুর সাথে সাথে এই পরিস্থিতির বিস্ফোরণ ঘটে। পরবর্তী একশত বছর পর্যন্ত অরাজক পরিস্থিতি চলতে থাকে যেটাকে মাৎসান্যায়ের একশো বছর বলা হয়। এই সময়ে একক কোনো রাষ্ট্র প্রধান ছিল না, ছোট ছোট সামন্তরা নিজ নিজ এলাকায় ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিল।
ফলে সংখ্যাগুরু ধর্মালম্বীদের প্রতিনিধি হিসেবে গোপালের ক্ষমতার গ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসে। গোপাল তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একজন ব্রাহ্মণকে নিয়োগ দেয়। গোপালের পূর্ব পুরুষরা ছিল ব্রাহ্মণ, পরবর্তীতে তারা মহাযানী বৌদ্ধে কনভার্ট হয়। ফলে গোপাল বৌদ্ধ ধর্মালম্বী হলেও তার মধ্যে অত্যাধিক ব্রাহ্মণ প্রভাব ছিল এবং ব্রাহ্মণদের মধ্যে গোপালের গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেক বেশি। (ড. আব্দুল মু’মিন চৌধুরী, Rise and Fall of Buddhism in South Asia, ২০০৮, পৃষ্ঠা ২২৮)।

গোপালের ছেলে ধর্মপাল, প্রথম মহিপাল এর সন্তান নয়াপাল ব্রাহ্মণদের প্রতি খুব সহানুভুতিশীল ছিল এবং ভূমি দান করেছ। অর্থাৎ পাল শাসনামলে বৌদ্ধদের প্রতি কোনো অত্যাচার-নির্যাতন হয়নি কিন্তু নীরবে-নিভৃতে ব্রাহ্মণায়ন ঘটেছে। রাষ্ট্র বৌদ্ধ ধর্মের মূলস্রোত থেরাবাদী বৌদ্ধদের তুলনায় হিন্দু প্রভাবিত মহাযানী, বজ্রযানী এসব সম্প্রদায়কেই মূলত পৃষ্ঠপোষকতা করেছে (ড. আব্দুল মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২০-২২৫)। ধারণা করা হয় রাষ্ট্র কর্তৃক বৌদ্ধ ধর্মের বিকৃত সম্প্রদায়গুলোর পৃষ্ঠপোষকতার কারণে বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর বাংলাদেশ ছেড়ে চিরদিনের জন্য তিব্বত চলে যায় (ড. আব্দুল মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৩১)।

দক্ষিত ভারত থেকে আগত হিন্দু ধর্মালম্বী সেন বংশের লোকেরা পাল বংশের রাজা থেকে ক্ষমতা দখল করে নেয়। শুরু হয় বৌদ্ধদের উপর আরেক দফা নির্যাতন। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজিয়ের আগ পর্যন্ত সেনরা বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চলতে থাকে। ঐতিহাসিক তারানাথ এবং সুম্পার (Sumpa) উদ্ধৃতি দিয়ে ড. মু’মিন চৌধুরী বলেন সেন রাজাদের অত্যাচারে বৌদ্ধ ধর্মের লোকেরা বাংলা থেকে প্যাগান, পেগু, আরাকান, কুকি এসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২৩৬)। বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণদের এসব অত্যাচারের কথা রামাই পন্ডিত রচিত ‘শুন্য পুরানে’ বিস্তারিত রয়েছে। সেন শাসনামলে বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণ/হিন্দুদের অত্যাচারের মাত্রা ছিল অনেকটা শশাঙ্কের মত।

সেন রাজাদের অন্যতম ছিল রাজা বল্লাল সেন। সে কুলীন প্রথা চালু করে। বৌদ্ধদের একটা অংশকে কুলীন পদমর্যাদা দিয়ে হিন্দু ধর্মে গ্রহণ করে নেয়া হয় যারা কায়স্থ নামে পরিচিত। যারা সেনদের শাসনকে মাথা পেতে নেয়নি তারা হয়ে গেল নিম্ন বর্ণ (ড. মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২৪১)। দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে ‘বস্তুত কৌলিন্য সে সকল লোককে দেওয়া হইয়াছিল, যাহারা ব্রাহ্মণ শাসন শিরোধার্য্য করিয়া লইয়াছিলেন’ (ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-৪৮৩)।

সামাজিকভাবে সেন শাসনামলে পতিতাবৃত্তি মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল, এমনকি প্রকাশ্যে রাষ্ট্রের মন্ত্রীমহোদয়গন পতিতা ও নর্তকিদের সাথে দামাদামি করতো(S.Sen: 1963 উদৃত ড. মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা-২৪৪)। লক্ষণ সেনের অনেকগুলো স্ত্রী ছিল।পয়সাওয়ালারা সেন আমলে নারীদেরকে দাসী হিসেবে রাখত এবং সেটা শুধু যৌন আমোদ প্রমোদের জন্যই।যদি কোন দাসীর একাদিক মালিক থাকত তাহলে তারা শেয়ার অনুসারে পর্যায়ক্রমে তাদের ব্যবহার করত (N. R. Roy 1993:466 উদৃত ড. মু’মিন চৌধুরী, প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা-২৪৪)। এ থেকে একথা প্রতিয়মান হয় যে, সমাজে অশ্লীলতার বিস্তার ব্রাহ্মণ্যবাদের একটি আদি কৌশল।
মুসলিম শাসকদের উদারতায় বৌদ্ধরা হিন্দু অত্যাচার থেকে রক্ষা পেয়েছে
Image result for মুসলিম শাসকমুসলিম শাসকদের উদারতায় বৌদ্ধরা হিন্দু অত্যাচার থেকে রক্ষা পেয়েছে
দক্ষিত ভারত থেকে আগত হিন্দু ধর্মালম্বী সেন বংশের লোকেরা পাল বংশের রাজা থেকে ক্ষমতা দখল করে নেয়। শুরু হয় বৌদ্ধদের উপর আরেক দফা নির্যাতন। ঐতিহাসিক তারানাথ এবং সুম্পার (Sumpa) উদ্ধৃতি দিয়ে ড. মু’মিন চৌধুরী বলেন সেন রাজাদের অত্যাচারে বৌদ্ধ ধর্মের লোকেরা বাংলা থেকে প্যাগান, পেগু, আরাকান, কুকি এসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-২৩৬)।
সেনদের নিষ্ঠুর অত্যাচারে স্থানীয় বাঙালি বৌদ্ধদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষায় ছিল সবাই। সেই সময়ে বখতিয়ার খলজির আগমন ঘটে বাংলায়। তিব্বতী বুদ্ধ ঐতিহাসিক কুলাচার্য জ্ঞানানশ্রীর বিবরনী থেকে জানা যায় মগধ থেকে এক দল ভিক্ষু মির্জাপুরে গিয়ে কুতুবউদ্দিন বখতিয়ারের সংগে দেখা করে তাকে মগধকে মুক্ত করতে আবেদন করে (Journal of the Varendra Research Society, Rajshahi, 1940)। তাঁর আগমনে ব্রাহ্মণ্য শাসনের অবসান ঘটে। বৌদ্ধরা মুসলিম শাসনকে স্বাগত জানায়। দীনেশ চন্দ্র সেন তার পর্যবেক্ষণে বলে; শূন্যপুরাণের ‘নিরঞ্জনের উষ্মা’ নামক অধ্যায়ে দেখা যায়-তাহারা (বৌদ্ধরা) মুসলমানদিগকে ভগবানের ও নানা দেবদেবীর অবতার মনে করিয়া তাহাদের কর্তৃক ব্রাহ্মণ দলনে নিতান্ত আনন্দিত হইয়াছিল। …….ইতিহাসে কোথাও একথা নাই যে সেনরাজত্বের ধ্বংসের প্রাক্কালে মুসলমানদিগের সঙ্গে বাঙালি জাতির রীতিমত কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হইয়াছে। পরন্তু দেখা যায় যে বঙ্গবিজয়ের পরে বিশেষ করিয়া উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু, নব ব্রাহ্মণদিগের ঘোর অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে (ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-৫২৮)
মুসলিম শাসকদের উদারতা, বৌদ্ধদের প্রতি মুসলিমদের ভালো ব্যবহারের ফলে দলে দলে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে ‘বাংলার অর্ধেক বৌদ্ধ মুসলমান হইয়া গেলো’ (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বৌদ্ধধর্ম, পৃষ্ঠা ১৩১)। তবে মুসলমান হওয়ার এই প্রক্রিয়াটি রাতারাতি হয়ে যায়নি, রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে বৌদ্ধ-মুসলিম সংমিশ্রনের ফলে বৌদ্ধরা আস্তে আস্তে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে।

১২০৪ খ্রিস্টাব্দ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের আগেই বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটেছিলো।তবে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পর সেটা অনেক বেড়ে যায়।ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৭২ সালে ভারতে প্রথম বারের মত আদমশুমারি হয়।সেই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাংলা-বিহার-উড়িষ্যাতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা খুব দুর্বল। বিহার-উড়িষ্যার তুলনায় বাংলাতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে আরো দুর্বল ছিল। পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের অনেক জায়গাতেই পঞ্চায়েত ব্যবস্থার কোনো অস্তিত্বই ছিল না (Dr. Kamal Siddiqui, Local government in Bangladesh,The University Press Limited, page-37)।এই চিত্র ভারতে আর কোথাও ছিলনা।ফলে মুসলমানদের ইসলাম প্রচার প্রসারে এবং নির্যাতিত বৌদ্ধদের ইসলাম গ্রহণে ভারতের অন্য অঞ্চলের মত কোন সামাজিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি।

গিয়াস আদ দীন ইয়াদ (১২১৩-২৭) এবং মুগিস আদ দীন তুগরাল (১২২৭-৮১) এর শাসনামলে সেনাবাহিনীতে স্থানীয়দের (বৌদ্ধদের) নিয়োগ দেয়ার কথা জানা যায়। এছাড়া ইলিয়াস শাহের শাসনামলে (১৩৪২-৫৭) সেনাবাহিনীতে কর্মরত ‘পাইক’ বাহিনী একটি শক্তিশালী ফোর্সে পরিণত হয়। পাইক শব্দের অর্থ হচ্ছে পদাতিক বাহিনী এবং এই শব্দটি প্রাকৃত / পালি থেকে এসেছে।এই পাইকরা ছিল বৌদ্ধ। এ থেকে বুঝতে পারা যায় যে মুসলিম শাসকদের সাথে বৌদ্ধদের সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল(ড. মু’মিন চৌধুরী,প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা ২৭০)। এখনো বাংলা ভাষায় পাইক-পেয়াদা শব্দটি প্রচলিত আছে।

মুসলিম শাসকদের মধ্যে স্থানীয় (বৌদ্ধ) শিক্ষিত শ্রেণীর প্রভাব ছিল, একইসাথে মুসলিম প্রশাসনের ভূমি ব্যবস্থায় এসব স্থানীয়রা রাজস্ব্য আদায়কারী এবং হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা ছিল। (ড. মু’মিন চৌধুরী,প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা ২৭১ )।
স্থানীয় বৌদ্ধদের সাথে শাসক মুসলিমদের বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে খুবই ভাল সম্পর্ক ছিল। এই বিষয়টি ফুঁটে উঠে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় (দেখুনঃ Johan Elverskog, Buddhism and Islam on the Silk Road, Philadelphia: University of Pennsylvania Press, 2010)। এর ফলে মুসলিম অত্যাচারে বাংলা থেকে বৌদ্ধদের উৎখাতের ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রচারণা ভিত্তিহীন হয়ে পরে।

বৌদ্ধ-মুসলিম সুসম্পর্কের আরেকটি বড়ো নমুনা হচ্ছে বখতিয়ার খলজি এবং তার পরবর্তী শাসকরা কখনো স্থানীয় বৌদ্ধ এবং অন্যদের উপর জিজিয়া কর চাপিয়ে দেয়নি (ড. মু’মিন চৌধুরী,প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা ২৬৬)।
অর্থাৎ, মুসলিম ট্রেডিশান মতে কোন দেশ মুসলিম কর্তৃক যুদ্ধে জয়ী হলে অমুসলিমদের নিরাপত্তার জন্য ট্যাক্স হিসেবে জিজিয়া আদায় করা হয়। কিন্তু বাংলায় সেটা ঘটেনি।
হিন্দু বৌদ্ধদের মুসলিম হওয়া ঠেকাতে ছুপা হিন্দু চৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম চালু করে
Image result for হিন্দু বৌদ্ধহিন্দু বৌদ্ধদের মুসলিম হওয়া ঠেকাতে ছুপা হিন্দু চৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম চালু করে

মুসলিম শাসন দীর্ঘায়িত হওয়া এবং স্থানীয় লোকজনের ইসলাম গ্রহণ অব্যাহত থাকায় চৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম চালু করে। বৈষ্ণব ধর্মে বলা হয় মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে না-উচ্চ বর্ণ-নিম্ন বর্ণ বলে কিছু নাই, শুধু সৃষ্টিকর্তাকে ভক্তি করলেই হবে। তখন অনেক বৌদ্ধ বিশেষ করে মহাযানী বৌদ্ধরা বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু পরবর্তীতে বৈষ্ণব ধর্ম হিন্দু ধর্মের সাথে একীভূত হয়ে যায়। হিন্দু ধর্মের সাথে মিশে যাওয়ার কারণে এই ধর্মের অনুসারীরাও হিন্দু হয়ে যায় এবং নিম্ন বর্ণের হিন্দু হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। যারা বৌদ্ধ থেকে বৈষ্ণব হয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দু হয়েছে এরা বৈষ্ণব ধর্ম চালু না হলে বৌদ্ধ থেকে মুসলিম হয়ে যেত বলে মত প্রকাশ করে দীনেশ চন্দ্র সেন।দীনেশ মন্তব্য করে;

‘এদেশে ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের পুনরভ্যুদয়ে বিজিত বৌদ্ধদিগের প্রতি যেরূপ কঠোর নিপীড়ন চলিয়াছিলো, তাহাতে বৈষ্ণবেরা যদি সেই সকল হতভাগ্যের জন্য স্বীয় সমাজের দ্বার উদঘটনা না করিত, তবে সেই শ্রেণীর সকলেই মুসলমান হইয়া যাইতো (ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা-১০)।
বর্তমানে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে যারা নিম্ন বর্ণের হিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয় তাদের ৮০% হচ্ছে বৈষ্ণব ব্যাকগ্রাউন্ড, আর বৈষ্ণব মতবাদের একটা বড়ো অংশই এসেছে বৌদ্ধ ধর্ম থেকে (ড. মু’মিন চৌধুরী,প্রাগুক্ত,পৃষ্ঠা ৩১১, ৩১৪)।
ব্রাম্মণ্যবাদের সাথে মুসলমানদের দ্বন্ধের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও হৃদয়বিদারক উদাহরণ হচ্ছে ১৭৫৭ সালে
Image result for à§§à§­à§«à§­ব্রাম্মণ্যবাদের সাথে মুসলমানদের দ্বন্ধের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও হৃদয়বিদারক উদাহরণ হচ্ছে ১৭৫৭ সালে

ব্রাম্মণ্যবাদের সাথে মুসলমানদের দ্বন্ধের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও হৃদয়বিদারক উদাহরণ হচ্ছে ১৭৫৭ সালে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সাথে ইংরেজদের আঁতাতে বাংলায় সাড়ে পাঁচশত বছরের স্বাধীন বাঙ্গালী মুসলিম শাসনের পতন এবং জঘন্য বিদেশী শাসক কর্তৃক উপনিবেশের শুরু।

যখন সিরাজ উদ দৌলাকে কিভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে এই নিয়ে প্রতিরাতে সলা-পরামর্শ চলতেছিল তখন নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র পরামর্শ দিলেন, “ইংরেজদের সঙ্গে একযোগে কাজ করা হউক, আমি কালীঘাটে মায়ের দর্শনকামনায় প্রায়ই কলকাতায় যাইয়া থাকি।তাহারা মান্য, বদান্য, বুদ্ধিমান, রণনিপুণ, তাহাদিগের সঙ্গে যুদ্ধ লাগাইয়া আমরাই দাবার চাল চালিব, শেষ পর্যন্ত নবাব আমাদের হাতে কলের পুতুলের মত থাকিবেন, আমরাই যুদ্ধ চালাইব; ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’-নীতি অবলম্বন করিলে কেহ আমাদিগকে সন্দেহ করিতে পারিবে না, অথচ অভীষ্টসিদ্ধি অতি সহজেই হইবে, মীরজাফরকে আমরা নবাব করিব” (দীনেশ চন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, পৃষ্ঠা ৮৭২)।