ক্ষূদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের আদিবাসী নয়।   আদিবাসী ও উপজাতি বিতর্কের কারণ কি?
Related imageক্ষূদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের আদিবাসী নয়।
আদিবাসী ও উপজাতি বিতর্কের কারণ কি?

উপজাতি এবং আদিবাসী। আদিবাসী বলতে ইংরেজিতে Aboriginals বা indigenous people-ও বলে। উপজাতি হলো Tribe এটা উপনিবেশিক শব্দ। আমাদের দেশে বাঙালি মূলধারার বাইরে যারা আছে তারা আদিবাসী নয়। তাদের আমরা উপজাতি বলতেও নারাজ। বরং তাদেরকে বলা যেতে পারে ethnic বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী । নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী বা ‘এবোরিজিন্যালস’রা হচ্ছে ‘কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the soil।’ প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…’ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, খর্বাকৃতির স্ফীত চ্যাপ্টা নাক কুঁকড়ানো কেশবিশিষ্ট কৃষ্ণবর্ণের ‘বুমেরাংম্যান’রা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী বা যথার্থ এবোরিজিন্যালস। তারা ওখানকার ভূমিপুত্রও বটে। ঠিক একইভাবে মাউরি নামের সংখ্যালঘু পশ্চাৎপদ প্রকৃতিপূজারী নিউজিল্যান্ডের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সেখানকার আদিবাসী। আমেরিকার বিভিন্ন নামের মঙ্গোলীয় ধারার প্রাচীন জনগোষ্ঠী যাদেরকে ভুলক্রমে ‘রেড ইন্ডিয়ান’ (উত্তর আমেরিকা) বলা হয় এবং সেন্ট্রাল আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় ইনকা, আজটেক, মায়ান, আমাজানসহ আরো অসংখ্য ক্ষুদ্র বিল্প্তু কিংবা সঙ্কটাপন্ন (Extinct or Endangered Groups) জনগোষ্ঠীকে সঠিক ‘এবোরিজিন্যালস’ বলে চিহ্নিত করা যায়।

তথাকথিত সভ্য সাদা, ইউরোপীয় নতুন বসতি স্থাপনকারী অভিবাসীরা (A New Settlers and Immigrants) ঐসব মহাদেশের আদিবাসীদের নির্মম বিদ্বেষ, হিংস্র প্রবঞ্চনা, লোভ আর স্বার্থপর আগ্রাসনের দ্বারা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোসহ সেন্ট্রাল ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ব্রিটিশ, স্প্যানিশ, ফরাসি, পর্তুগীজ প্রভৃতি উপনিবেশবাদী শক্তি বিগত ৩/৪টি শতক ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে জাতিগত নির্মূল তৎপরতার মাধ্যমে (Ethnic Cleansing) এসব মুক্ত স্বাধীন আমেরিকান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোকে পৃথিবী থেকে প্রায় নির্মূল করে দিয়েছে। আজ ঐ শ্বেতাঙ্গ মার্কিন, ব্রিটিশ, অস্ট্রেলীয় এবং ইউরোপীয় তথাকথিত সুশিক্ষিত, ধ্বজাধারী সাবেক উপনিবেশবাদীদের নব্য প্রতিনিধিরা তাদের নব্য উপনিবেশবাদী অর্থাৎ তথাকথিত মুক্ত অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা পশ্চাৎপদ রাষ্ট্রসমূহের জন্য ‘আদিবাসী সংরক্ষণ’ (Conservation of Aboriginal)-এর ধুয়া তুলে তাদের অর্থের মদদপুষ্ট এনজিও এবং মিশনারী চক্রের সুনিপুণ প্রচারণায় ও ষড়যন্ত্রে উপজাতিগুলোর জন্য মায়াকান্না শুরু করেছে। আরম্ভ করেছে ভয়ানক সূক্ষ্ম সম্প্রসারণবাদী ষড়যন্ত্র আর আধিপত্যবাদী চাণক্য চাল।

এসব উপজাতি, আদিবাসী কিংবা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর এই মায়াকান্নার পেছনে মূলত ভূ-রাজনৈতিক, সামরিক, ভূ-অর্থনীতিক এবং সর্বোপরি আধিপত্যবাদী স্বার্থই প্রবলভাবে কাজ করছে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় প্রকৃত আদিবাসীদের তারা যেখানে গণহত্যা, জাতিগত নির্মূলসাধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছে। সেখানে তারা এখন ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন সম্ভাবনাময় স্বাধীনচেতা উঠতি শক্তি বিশেষ করে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে এসব উপজাতি (Tribal) ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার পক্ষে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন, জাতিসত্তার বিকাশ, আদিবাসী সংরক্ষণ’ ইত্যাদির কথা বলে ভাষাগত, বর্ণগত, ধর্মগত, সাংস্কৃতিক বিভাজন ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার প্রেক্ষাপট তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদীদের ঐ হীন চক্রান্তের ফলশ্রুতিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ইত্যাদি এককালীন ঔপনিবেশিক শক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ও আজ্ঞাবহ জাতিসংঘের (ইউএনও) সহযোগিতায় বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার যৌক্তিক সার্বভৌম অঞ্চল তিমুর দ্বীপের পূর্বাঞ্চলকে (ইস্ট-তিমুর) বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। ইস্ট-তিমুরের এই বিচ্ছিন্নতার পেছনে আসলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র কাজ করেছে এবং এখানেও আদিবাসী, উপজাতি ইত্যাদি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে সর্বনাশা খ্রিস্টবাদী এনজিও চক্র, মিশনারি গ্রুপ এবং তথাকথিত মানবাধিকার সংরক্ষণ (Human Rights Activists) চক্র। এশিয়ার উদীয়মান ব্যাঘ্র (Emerging Tiger of Asia) ২০ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপের কাছের দক্ষিণেই হালকা জনসংখ্যা অধ্যুষিত শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান অধ্যুষিত অস্ট্রেলিয়াসহ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং অস্ট্রেলিয়া এই কৌশলগত ও অবস্থানগত দুর্বলতাকে চিরতরে দূর করাতেই খ্রিস্টবাদী পরাশক্তিসমূহ জাতিসংঘকে ব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে স্বাধীন করে দেয়।

আর ঐ একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশেও একই খ্রিস্টবাদী সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের আধিপত্যবাদী ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে (Geo-Political and Strategical Interests) সংরক্ষণ ও চরিতার্থ করার জন্য তাদের সেই কৌশলকে বাস্তবায়িত করতে চাচ্ছে। এ জন্য তারা বেছে নিয়েছে দেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা, মার্মা, ত্রিপুরা, মগসহ বিভিন্ন বসতি স্থাপনকারী উপজাতীয় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোকে। একই সাথে এই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও তাদের অর্থপুষ্ট এনজিও চক্র বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন : সিলেটের খাসিয়া, মণিপুরী, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের গারো, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুরের বনাঞ্চলের কুচ রাজবংশীয় বহিরাগত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে এদেশের আদিবাসী বলে প্রচার-প্রপাগাণ্ডা চালাতে শুরু করেছে এবং এর মাধ্যমে এদের এসব সংশ্লিষ্ট বৃহদায়তনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ভূমিপুত্র (Son of the Soil) বলে প্রতিষ্ঠিত করার এক হীন চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

যদিও নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত যে বাংলাদেশে বসবাসরত কোনো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়। বরং তারা পার্শ্ববর্তী কিংবা বিভিন্ন দূরবর্তী স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানা স্থানে অভিবাসিত হয়ে ক্রমে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করে আসছে।
কিন্তু কোনোক্রমেই বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, খাসিয়া কিংবা কুচ রাজবংশীয় সাঁওতালরা এদেশের আদিবাসী হতে পারে না।

তাহলে বাংলাদেশে আদিবাসী কারা?

বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরা। কারণ তারাই প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড (proto Astroloid) নামের আদি জনধারার অংশ বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে অনেক জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি-প্রমাণও রয়েছে।
প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড ধারার বাঙালি নামের বাংলাদেশের এই আদিবাসীরা যদিও একটি মিশ্র বা শংকর জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত সেখানে ককেশীয়, মঙ্গোলীয়, অস্ট্রিক জাতিধারার সাথে ভেড্ডাইট, নিগ্রোয়েড, দ্রাবিড়ীয় এবং অন্যান্য বহু জানা-অজানা আদি জনধারার সংমিশ্রণ ও নৃতাত্ত্বিক মিথষ্ক্রিয়া সাধিত হয়েছে। তবুও যেহেতু এসব জনগোষ্ঠীর এদেশে সুস্পষ্ট অস্তিত্বের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে অনুদঘাটিত ও অজানা এবং স্মরণাতীতকালের হাজার হাজার বছর আগে থেকে এদের পূর্বপুরুষরা এই নদীবিধৌত পলল সমভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করেছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই একমাত্র তাদেরকে অর্থাৎ বাঙালিরাই Son of the Soil বা আদিবাসী বলা যায়। বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষকবৃন্দই এ ব্যাপারে একমত।

এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো যে আদিবাসী নয় এর প্রমাণ কি?

বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয় তার প্রমাণ প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ RHS Huchinson (1906) T H Lewin (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা (১৯৯৬), J. Jaffa (1989) এবং N Ahmed (1959) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে পাওয়া যায়। তারা সবাই একবাক্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়দের নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত হয়ে অভিবাসিত হবার যুক্তি-প্রমাণ ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

খোদ চাকমা পণ্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা ‘অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগং’এ লিখেছেন, ‘তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ তিনশ; বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর দিকে রাঙামাটি এলাকায়।’ এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। একথা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে। তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনার বা পরিস্থিতির কারণে আশপাশের দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো এবং কুকিরা মূল ‘কুকি’ উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমারা আজ থেকে মাত্র দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লেউইন-এর মতে,

“A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago from Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate”. (Lewin, 1869, p. 28)।
পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন : জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা।

ব্যোমরা মায়ানমার-চীন পর্বত থেকে নিয়ে তাশন পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে। খ্রিস্টান মিশনারি তৎপরতার ফলে এদের অধিকাংশই বর্তমানে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। লুসাইরাও এখন অধিকাংশই খ্রিস্টান। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য একটি বড় জনগোষ্ঠী মুরং। এদের বেশির ভাগই এখন পর্যন্ত প্রকৃতি পূজারী এবং এদের কোনো ধর্মগ্রন্থও নেই (Bernot, 1960) চাকমারা এখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও ভাষার দিক দিয়ে তারা ত্রিপুরা, মারমা বা অন্য যে কোনো পার্বত্য জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এদের ভাষা এখন অনেকটা বাংলা ভাষার কাছাকাছি। মারমা (মগ)গণ আরাকানী বর্মীয় উপভাষায় কথা বলে এবং ত্রিপুরাগণ ত্রিপুরি তিব্বতিধর্মী উপভাষায় কথা বলে। বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের ধর্মপ্রচারের জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত-সংলগ্ন মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরার বেশিরভাগ উপজাতীয় জনগোষ্ঠী খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ঐ অঞ্চলে ঐসব বিচ্ছিন্ন ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্টধর্মের ছত্রছায়ায় একত্রিত করে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে ভারত-বাংলাদেশের এই পার্বত্য ভূ-রাজনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্বাংশের যুক্তরাষ্ট্রে ও পাশ্চাত্য শক্তি ইসরাইলের মতো একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
শুধুমাত্র ভাষাতাত্ত্বিক বিবেচনায়ই নয়, বরং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখেও দেখা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল এবং বিস্তর অনৈক্য বর্তমান। এদের এক একটি জনগোষ্ঠীর বিবাহরীতি, আত্মীয়তা সম্পর্কে (Keen-ship Relations), সম্পত্তির মালিকানা বণ্টনরীতি এবং উত্তরাধিকার প্রথা, জন্ম ও মৃত্যুর সামাজিক ও ধর্মীয় কৃত্যাদি বা অন্যান্য সামাজিক প্রথা এবং রীতি এক এক ধরনের এবং প্রায় প্রত্যেকটি আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত (Denise and Bernot, 1957)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব জনগোষ্ঠীগুলোর প্রায় সবাই যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং হিংস্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরাতন বসতি স্থান থেকে এখানে পালিয়ে এসেছ। নতুবা, এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণকারী হিসেব এদেশে প্রবেশ করেছে (Hutchinson, 1909, Bernot, 1960 and Risley, 1991)। বর্তমানেও এদের পরস্পরের মধ্যে প্রচুর রেষারেষি এবং দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে বলে জানা যায় (Belal, 1992)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের জনসংখ্যার বণ্টনচিত্রও সমান নয়। এরা গোষ্ঠী ও জাতিতে বিভক্ত হয়ে সারা পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করে। তবে কোনো কোনো স্থানে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মিশ্র জনসংখ্যা দৃষ্টিগোচর হয়। চাকমারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের চাকমা সার্কেলে কর্ণফুলী অববাহিকা এবং রাঙামাটি অঞ্চলে বাস করে। মগরা (মারমা) পার্বত্য চট্টগ্রামে দণিাংশের বোমাং এবং মং সার্কেলে বাস করে। ত্রিপুরা (টিপরা)গণ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলে অর্থাৎ চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল সকল স্থানেই ছড়িয়ে থাকলেও নিজেরা দল বেঁধে থাকে। ম্রো, খ্যাং, খুমী এবং মুরং বোমাং সার্কেলের বাসিন্দা।

বাংলাভাষী বাঙালি অভিবাসীরা সারা পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও এদের বেশিরভাগই দলবদ্ধভাবে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রামগড় প্রভৃতি শহরাঞ্চলে বসবাস করে। বাকি বাঙালি জনসংখ্যা এখানকার উর্বর উপত্যকাগুলোর সমভূমিতে গুচ্ছগ্রামে বসাবস করে থাকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের বাদ দিলে এখন আসে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট-মৌলভীবাজারের খাসিয়া, মণিপুরী, পাত্র (পাত্তর) গোষ্ঠীর কথা। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চলের গারোদের কথা এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর-দিনাজপুরের কুচ রাজবংশী সাঁওতাল, ওরাও ও মুণ্ডাদের কথা। এদের সবাই সংখ্যার দিক বিচারে খুব নগণ্য ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রামণিত যে, সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া, মণিপুরী ও পাত্ররা তৎকালীন বৃহত্তর আসামের খাসিয়া জয়ন্তী পাহাড়, মণিপুর, কাঁচাড় ও অন্যান্য সংলগ্ন দুর্গম বনাচ্ছাদিত আরণ্যক জনপদ থেকে যুদ্ধ, আগ্রাসন, মহামারী এবং জীবিকার অন্বেষণশোন সুরমা অববাহিকায় প্রবেশ করে ও সিলেটের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করে। নৃ-বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক জ্ঞানের সকল বিশ্লেষণেই এরা উপজাতীয় এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বৈ আর কিছুই নয়। এরা কোনো বিবেচনায়ই সিলেটের আদিবাসী হতে পারে না। এরা আদি আরণ্যক পার্বত্য নিবাসের (আসাম, মণিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি) আদিবাসী হলেও যখন স্থানান্তরিত হয়ে নতুন ভূখণ্ডে আসে সেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে সমান্তরালভাবে থাকতে পারে। কিন্তু কখনো তারা নতুন জায়গায় আদিবাসী হতে পারে না।

ঠিক একইভাবে, ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট অঞ্চল) এবং টাঙ্গাইল অঞ্চলের (মধুপুর) গারো সিংট্যানেরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের পরে এদের অনেকে তাদের আদিনিবাস ভারতের উত্তরের গারো পাহাড়ে ফিরে গেলেও বেশ কিছুসংখ্যক গারো ও সিংট্যানরা বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলে রয়ে গেছে। গারোদের আদি নিবাস ভারতের গারোল্যান্ড। কোনোক্রমেই ময়মনসিংহ কিংবা টাঙ্গাইলের আদিবাসী হতে পারে না। আরো বলা যায়, মাত্র ব্রিটিশ শাসনামলে আজ থেকে ৬০-৭০ কিংবা একশ’, সোয়াশ’ বছর আগে সিলেটের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং উত্তর সিলেটের কোনো কোনো নিচু পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বর্তমান ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ মালভূমি অঞ্চল যেমন ছোট নাগপুরের বীরভূম, সীঙভূম, মানভূম, বাকুড়া, দুমকা, বর্ধমান প্রভৃতি অঞ্চল যা তৎকালীন সাঁওতাল পরগণাখ্যাত ছিল সেসব অঞ্চলে গরিব অরণ্যচারী আদিবাসী সাঁওতাল, মুণ্ডা, কুল, বীর, অঁরাও, বাউরী ইত্যাদি নানা নামের কৃষ্ণকায় আদিম জনগোষ্ঠীর মানুষকে শ্রমিক হিসেব স্থানান্তরিত করে অভিবাসী হিসেবে নিয়ে আসে।

একইভাবে যুদ্ধ, মহামারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং জীবিকার সন্ধানে রাজমহলের গিরিপথ ডিঙ্গিয়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে (রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর) বাসবাস শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা থেকে দক্ষিণের রংপুর-দিনাজপুরের নদী অববাহিকামণ্ডিত সমভূমিতে নেমে বসবাস শুরু করে কুচ ও রাজবংশী জনগোষ্ঠী। এরা সকলেই তাদের মূল নিবাসের আদিবাসী হিসেব বিবেচ্য হলেও কোনো যুক্তিতে তাদের নতুন আবাসস্থল বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলগুলোর আদিবাসী বা ভূমিপত্র হিসেব চিহ্নিত হতে পারে না।

উল্লেখ্য, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সাথে ও স্থানীয় অন্যান্য বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে কুচ রাজবংশীদের অনেকে সমসংস্কৃতিকরণ প্রক্রিয়ার (Acculturation Process) মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতে একীভূত (Assimilated) হয়ে গেছে। এটা দোষের কিছু না বরং ভালো। মানবিক বিবেচনার মহানুভবতায় এদেশে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, অধিকার ও স্বীয় জাতি, ভাষা, ধর্ম তথা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের পূর্ণ অধিকার এবং সম্মান নিয়ে সবাই স্বকীয়তায় সমান্তরাল চলতে পারে বা মিশে যেতে পারে। কিন্তু কোন্ বিবেচনায় ক্ষূদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের আদিবাসী নয়।



বাঙালীরাই এদেশের আদিবাসী
Related imageবাঙালীরাই এদেশের আদিবাসী

ভারতীয় উপমহাদেশে নেপাল ছাড়া অন্য কোন দেশে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কোন আদিবাসী নেই। ভারত, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে আছে ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, উপজাতি। এসব ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও উপজাতীয়দের আদিবাসী ঘোষণার জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি তৎপরতা লক্ষণীয়। এবারও অনুরূপ তৎপরতা প্রতীয়মান। যদিও ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনকালে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) নিজেদের উপজাতি হিসেবে স্বীকার করেই চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেছে।
কিন্তু বর্তমান চাকমা সার্কেল চীফ যিনি চাকমা রাজা নামে পরিচিত- দেবাশীষ রায় কয়েক বছর আগে আকস্মিকভাবে চাকমা উপজাতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবি উত্থাপন করেন। এ দাবির সঙ্গে দেশীয় বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ সমর্থন যোগাচ্ছেন। ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে আদিবাসী ফোরাম। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘আদিবাসী মন্ত্রণালয়’ করার দাবিও তোলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সাহায্য সংস্থা উপজাতীয়দের ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।
কিন্তু সরকার পক্ষে ২০১১ সালের ২১ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আদিবাসী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে এই বলে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মূল ভূখ-ের অধিবাসী নয়। বরং বাংলাদেশের ১৫ কোটি (ওই সময়) জনগণের সকলেই বাংলাদেশে আদি এবং প্রাচীন ভূখ-ে শাশ্বতকাল ধরে বসবাস করার সুবাদে এদেশে আদিবাসী। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী আদিবাসী হলে অবশিষ্ট জনগণ বিদেশী হিসেবে পরিগণিত হবে বলে মত ব্যক্ত করা হয়; যা কখনও হতে পারে না।
ওই সভায় বলা হয়, বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বা উপজাতি কর্তৃক নিজেদের আদিবাসী হিসেবে দাবি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিতর্কের সৃষ্টি করছে। যাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আদিবাসী শব্দটির ভুল ব্যবহারের ফলে শব্দটির সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভৌগোলিক অখ-তার ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সভায় উল্লেখ করা হয়, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ যে এ ভূখণ্ডে আদিবাসী (ফার্স্ট নেশন) হিসেবে চার হাজার বছর ধরে বসবাস করছে।
অন্যপক্ষে, ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্র, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমন ঘটেছে ১৭২৭ সাল থেকে। তখন হতে তারা ওই অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে বসবাস করে আসছে। সঙ্গত কারণে তারা আদিবাসী নয়। প্রয়াত বোমাং সার্কেলের চীফ তথা বোমাং রাজা অং শু প্রু চৌধুরী ৯৬ বছর বয়সে স্বীকার করেছেন তারা আদিবাসী নন বরং প্রায় ৩শ’ বছর ধরে এদেশে বসবাস করে আসছেন।
জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ফোরামসমূহে আদিবাসী (ইনডিজেনাস) ও উপজাতি (ট্রাইবাল) জনগোষ্ঠীর সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইনডিজেনাস পিপলস হচ্ছে তারাই যারা যুগ যুগ ধরে বর্তমান আবাসভূমিতে বাস করে আসছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ার এবোরিজিন্স। এ বিবেচনায় জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষে এদেশে উপজাতি গোষ্ঠীকে ইনডিজেনাস বা আদিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত না করে ট্রাইবাল বা এথনিক মাইনরিটি গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। জাতিসংঘ ফোরামে ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশও তাদের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের কখনও ইনডিজেনাস হিসেবে আখ্যায়িত করে না।
বাংলাদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ উপজাতি সম্প্রদায় এখন নিজ নিজ ধর্ম-সংস্কৃতিতে অবস্থান না করে অনেকেই খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। প্রসঙ্গত, প্রায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি ক্ষুদ্র উপজাতীয় সম্প্রদায়ের বসবাস। এরমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে রয়েছে ১২টি উপজাতীয় সম্প্রদায়। এগুলো হচ্ছেÑ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, পাংখোয়া, চাক, খুমী, খিয়াং, লুসাই, তংচংগা, বম এবং রিয়াং; সিলেট অঞ্চলে রয়েছে মনিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা, পাত্র, হাজং; ময়মনসিংহ অঞ্চলে রয়েছে গারো, কুকি ও রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে রয়েছে সাঁওতালসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতীয়রা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে সক্ষম হলে আন্তর্জাতিক সমাজের সমর্থন নিয়ে সরকারের ওপর ক্রমাগত অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে এর অবস্থান ঘোষণা করেছে; যা ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস হিসেবে ঘোষিত। উপজাতীয়রা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন নিয়ে এরা কাক্সিক্ষত পথে এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি পার্বত্য জেলাগুলো থেকে বাঙালীদের উচ্ছেদ এবং পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে। এরা পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নতাবাদের আন্দোলনে যে তৎপর হবে না তা কি নিশ্চিত বলা যায়?
সরকারী মতে, দেশের অধিকাংশ উপজাতীয় সম্প্রদায়ের বিশাল জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যে খ্রীস্টান হয়ে গেছে। চাকমাদের মধ্যে খ্রীস্টানদের সংখ্যা কম হলেও মারমাদের অনেকেই এবং গারো, কুকি, লুসাই, পাংখো, মনিপুরী ও সাঁওতালদের বড় একটি অংশ খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় অংশের অবস্থাও অনুরূপ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী উপজাতিরা খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষা নেয়ায় ইতোমধ্যে তারা তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।
গোয়েন্দা সূত্রে এমন তথ্যও রয়েছে, যেহেতু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং মিয়ানমারের একাংশ নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে ভারত-বাংলাদেশের এই পার্বত্যাঞ্চল ভূরাজনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেহেতু বিদেশী নানা চক্র পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীদের আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে ওই অঞ্চলকে ‘খ্রীস্টান রাষ্ট্র’ গঠনে তৎপর রয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ান এবোরিজিন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, জাপানের আইনু, রাশিয়ার মেনেড, ফ্রান্স ও স্পেনের বাসকু, আরবের বেদুইন প্রভৃতি জনগোষ্ঠী প্রাচীনকাল থেকে আদিবাসী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক অতি সাম্প্রতিক সময়ে চালু হয়েছে। ভারতে এ জাতীয় নৃগোষ্ঠী ও উপজাতীদের তফসিলী সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী বলে স্বীকৃতি রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে তাদের সকল জাতিসত্তাকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
ইনডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন-১৯৫৭ (নং-১০৭) সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭ দেশ এটি রেটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশও রেটিফাই করেছিল। পরে কনভেনশন ১৬৯ পাস হওয়ার পর পূর্বোক্ত কনভেনশন ১০৭ তামাদি হয়ে যায়। বাংলাদেশ কনভেনশন ১৬৯ রেটিফাই করেনি। তাই এটি এদেশের জন্য পালনীয় নয়। লক্ষণীয় যে, এরই মধ্যে আটটি দেশ এ কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে, ইনডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন-১৯৮৯ (নং-১৬৯) পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২২টি দেশ এ কনভেনশন রেটিফাই করেছে। এ উপমহাদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোন দেশ এ কনভেনশন রেটিফাই করেনি।
অন্যদিকে, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক যে ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয় তাতে ভোটদানের সময় ১৪৩ দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪ দেশ বিপক্ষে, ১১ দেশ বিরত এবং ৩৪ দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোটদানে বিরতদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র।
বাঙালী ও বাংলা ভাষীরাই এদেশের সত্যিকারের আদিবাসী। এর পেছনে জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশের এ অঞ্চলে বাঙালীরা বসবাস করে আসছে ৪ হাজার বছরেরও আগে থেকে। বিক্রমপুর, ওয়ারি-বটেশ্বর, সোনারগাঁ কিংবা মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত নৃতাত্ত্বিক প্রমাণাদি বিষয়টি নিশ্চিত করে। নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দিবালোকের মতো স্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত যে, বাংলাদেশে বসবাসরত কোন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়। বিশ্বের তাবত শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষক এ ব্যাপারে একমত।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকান। ত্রিপুরাদের বসবাস ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এবং মারমারাও এসেছে মিয়ানমার (সাবেক বার্মা) থেকে। সে অর্থে তারা কেউ আদিবাসী নয়, বরং অভিবাসী। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানা স্থানে অভিবাসী হয়ে আনুমানিক সর্বোচ্চ ৫শ’ বছর থেকে এ ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে। তাই কোনক্রমেই এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি সদস্যরা আদিবাসী হতে পারে না। এর যথাযথ প্রমাণ রয়েছে প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ রবার্ট হেনরি ¯িœড হাচিনসনের বই ‘এ্যান্ড এ্যাকাউন্ট অব চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস (১৯০৬), ক্যাপ্টেন থমাস হার্বাট লেউইন (১৮৬৯) লেখা বই দি চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস এ্যান্ড ডুয়েলার্স দেয়ার ইন (১৮৬৯), অমরেন্দ্র লাল খিসা প্রমুখের লেখা গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে এর প্রমাণ মেলে যে, বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকিজাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই বহু পরে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী। কুকিদের পাশাপাশি অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্রো, খিয়াং, পাংখো জনগোষ্ঠীর সদস্য উল্লেখযোগ্য। এরা সর্বোচ্চ ৫শ’ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাস শুরু করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস হচ্ছে এরা সবাই যুদ্ধবিগ্রহ এবং হিংস্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরনো আবাসস্থল থেকে এ অঞ্চলে পালিয়ে এসেছে। এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণকারী হিসেবে এদেশে প্রবেশ করেছে। বিশিষ্ট চাকমা পণ্ডিত অমরেন্দ্র লাল খিসা ‘অরিজিন অব চাকমা পিপলস অব হিল ট্র্যাক্টস চিটাগং’ বইতে লিখেছেন, চাকমারা এসেছে তৎকালীন বার্মার মংখেমারের আখড়া থেকে। পরবর্তীকালে আরাকান এবং মগদের দ্বারা তাড়িত হয়ে তারা বান্দরবানে প্রবেশ করে। আরও পরবর্তী সময়ে উত্তরদিকে রাঙ্গামাটিসহ সন্নিহিত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষকদের মতে, এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী আখ্যা না দেয়ার যুক্তিতে রয়েছে, ইস্ট তিমুর, সাউথ সুদান, কাশ্মীর, চেচনিয়া, ফিলিপিন্সের মিননাউসহ পৃথিবীর আরও কয়েকটি স্থানের বিরাজমান পরিস্থিতি। তাদের মতে, ইউনাইটেড নেশন ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র ২০০৭ অনুযায়ী তাদেরকে আদিবাসী স্বীকৃতি প্রদান করলে সে অনুযায়ী ওই জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা প্রদান করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়ে যায়। বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষণার ধারা ৩০ অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখণ্ডে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজন যুক্তিগ্রাহ্য হবে। অন্যথায় যদি সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতি বা অনুরোধ জ্ঞাপন না করে।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীর ভূমি বা ভূখণ্ড ব্যবহারের আগে যথাযথ পদ্ধতি ও বিশেষ করে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি গ্রহণ করার বিষয়টি সে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে তাদের মতবাদও এক নয়। সবচেয়ে বড় উপজাতি চাকমারা পৃথক পৃথক জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মতবাদে বিশ্বাসী।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের সকল অঞ্চলের আদিবাসী বাঙালী। এদের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও রয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী বলে দাবিদাররা হঠাৎ করে আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টার নেপথ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে ফায়দা লোটার মূল কৌশল। এ কৌশলের ফাঁদে পা দেয়া ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক। আদিবাসী স্বীকৃতির বিপরীতে রয়েছে এদেশের ভৌগোলিক অখ-তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি ব্যাপকভাবে জড়িত। যেহেতু বাঙালীরাই এদেশের মূল আদিবাসী এবং উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা মূলত অভিবাসী। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী পার্বত্য উপজাতীয় অধিবাসীরা আদিবাসী নয় এবং তাদের আদিবাসীর স্বীকৃতি আদায়ের অপচেষ্টা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অখ-তাকে বিপজ্জনক করার একটি অপকৌশল মাত্র।
সাওতালরা আদিবাসী নয় ------------------
সাওতালরা আদিবাসী নয় ------------------

Image result for বন জঙ্গলসাঁওতালদের নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এসব আলোচনা যথেষ্ট ইতিহাসভিত্তিক হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। সাঁওতালদের বলা হচ্ছে, এ দেশের অন্যতম আদিবাসী (Aborigine)। কিন্তু সাঁতালরা এ দেশের ভূমিপুত্র নয়। তাদের বলতে হয় আগন্তুক উপজাতি (Tribe)। সাঁওতালদের লোককথায় বলে, তারা এসেছে, হিহিড়ি পিপিড়ি দ্বীপ থেকে। কিন্তু এই হিহিড়ি পিপিড়ি দ্বীপ ঠিক কোথায়, সেটা এখনো নির্ণয় করা যায়নি। সাঁওতালদের নৃতত্ত্বের বইয়ে সাধারণত স্থাপন করা হয় প্রোটো-অস্ট্রালয়েড মানবধারায়। প্রটো-অস্টোলয়েড নামটা দেন ড. বিরোজা শঙ্কর গুহ, ১৯৩১ সালের আদমশুমারির সময়। সে এ সময় ছিল কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরের নৃতত্ত্ব বিভাগের প্রধান।সে নামটা চয়ন করেন সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, হো, কোল, ভিল প্রভৃতি উপজাতিকে বর্ণনা করার জন্য। প্রটো-অস্টোলয়েড কথাটির বাংলা আমরা করতে পারি প্রায়-অস্ট্রালয়েড। এদের এই নাম দেয়া হয়েছে, কেননা এদের চেহারার সৌসাদৃশ্য আছে অস্ট্রেলিয়ার আদিম কালো মানুষদের সঙ্গে। অবশ্য পার্থক্যও আছে। যেমন অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীরা প্রটো-অস্ট্রোলয়েড মানবধারার মানুষদের চেয়ে দৌহিক উচ্চতায় হয় বেশি এবং ভুরুর হাড় হয় অনেক উন্নত। এদের কপালের মধ্যভাগ প্রটো-অস্ট্রোলয়েডদের তুলনায় বেশ কিছুটা নিচু। প্রটো-অস্ট্রোলয়েডদের গায়ের রঙ অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের মতোই কালো। মাথার চুল মোটা ও ঘন। তবে মসৃণ। নাকের অগ্রভাগ মোটা ও শোশতবহুল। কিন্তু চ্যাপটা নয়। মাথার আকৃতি লম্বা। নৃতত্ত্বে মানবধারা বিভাগের সময় মাথার আকৃতির ওপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়। লম্বা মাথা বলতে বোঝায় এমন মাথা, যার প্রস্থকে দৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করে ১০০ দিয়ে গুণ করলে দাঁড়ায় ৭৫ বা তার কম। মাঝারি মাথা বলতে বোঝায়, যাদের প্রস্থ হলো দৈর্ঘ্যরে শতকরা ৭৫ ভাগ থেকে ৮০ ভাগের মধ্যে। আর গোল মাথা বলতে বোঝায় সেই সব মাথাকে, যাদের প্রস্থ দৈর্ঘ্যরে শতকরা ৮০ ভাগ অথবা তার বেশি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের মাথা মধ্যমাকৃতির অথবা গোল। সাঁওতালদের মতো লম্বাকৃতি নয়। তাই সাঁওতালদের মতো মানুষের থেকে বাংলাদেশের মানবসমষ্টির উদ্ভব হতে পেরেছে, এ রকম সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে না। যেমন আগে অনেকে করতে।

১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে বর্ধমান জেলার পাণ্ডু রাজার ঢিবি এবং বিরভুম জেলার মহিষাদল নামক জায়গায় উৎখনন চালানো হয়। এর ফলে তাম্র-প্রস্তর যুগের এক উন্নত সভ্যতার আবিষ্কার হতে পেরেছে। এখানে পাথরের অস্ত্রের সাথে তামার জিনিস পাওয়া গেছে। তামার তৈরি জিনিসের মধ্যে পাওয়া গেছে মাছ ধরার বড়শি। যার সাহায্যে এই জায়গার এই সময়ের মানুষ মাছ ধরে আহার সম্পন্ন করত। মহিষাদলে একটা পোড়ামাটির পাত্রের মধ্যে কিছু কয়লা হয়ে যাওয়া ধান পাওয়া গেছে। রেডিও অ্যাকটিভ কার্বন-১৪ পদ্ধতিতে যার বয়স নির্ণিত হয়েছে ১৩৮০ থেকে ৮৫৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে। যার থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, এই সময় মানুষ ধানচাষ করে তা থেকে চাল উৎপাদন করে আহার করত। অর্থাৎ এদের জীবন ছিল আমাদেরই মতো মাছ-ভাতনির্ভর। মানুষ এই সময় এখানে মৃতদেহ সমাধিস্থ করত। শবদেহ শায়িত করত পূর্ব-পশ্চিমে। এসব মানুষের মাথার খুলি হলো মধ্যমাকৃতির। সাঁওতালদের মতো লম্বাকৃতির নয়। এদের মাথার আকৃতির সাথে সাদৃশ্য আছে বাংলাদেশের বিরাটসংখ্যক জনসমষ্টির মাথার। তাই ধারণা করা যায়, আমরা অনেকে বহন করছি এসব মানুষের জীবনধারাকে। এসব কবরে পাওয়া গেছে বৈশিষ্ট্যময় মৃৎপাত্র। যার অনুরূপ মৃৎপাত্র এখনো কিছু কিছু পরিদৃষ্ট হয়। আমাদের পত্রপত্রিকা পড়ে মনে হচ্ছে, সাঁওতালরা হলো এ দেশের আদিবাসী। আর আমরা হলাম পরদেশী। যেটা সত্য নয়।

ইংরেজি ভাষায় ট্রাইব শব্দটা একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। ট্রাইব কথাটার বাংলা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা হয়েছিল উপজাতি। বাংলায় উপজাতি বলতে বোঝায় এমন জনসমষ্টি, যারা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। যারা বাস করে সভ্যমানুষের কাছাকাছি। কিন্তু যাদের সভ্যতা পড়ে আছে প্রস্তরযুগের পর্যায়ে। যারা বাস করে দুর্গম পাহাড়ি ও আরণ্যক অঞ্চলে। যারা লাঙ্গল দিয়ে কৃষিকাজ করতে জানে না। যারা মাটিতে কাঠের খুঁটা দিয়ে গর্ত করে বীজ বপন করে চাষাবাদ করে। যাকে বলা হয় জুম অথবা ধাইয়া। এ ছাড়া এই চাষপদ্ধতির অন্য নামও আছে। তবে এসব মানুষ চাষাবাদের চেয়ে বন্য ফলমূল আহরণ ও পশু শিকার করে খেতেই বিশেষ অভ্যস্ত। এদের প্রত্যেকের একটি করে ভাষা আছে। কিন্তু ভাষাটা লিখিত নয়। সাঁওতালদের ধরা হয়েছে একটা উপজাতি। কেননা, এরা সবাই দেখতে একই রকম, একই ভাষায় কথা বলে এবং বাস করে একত্রে। এ ছাড়া এদের ধর্মবিশ্বাসও এক। অর্থাৎ উপজাতি বলতে এসেছে মানবধারা, ভাষা ও ধর্মবিশ্বাস প্রসঙ্গ।


উপজাতি ও জাতির মধ্যে পার্থক্য হলো, জাতির জনসমষ্টি হলো অনেক বেশি। ভাষা এক। কিন্তু একটি জনসমষ্টির মধ্যে থাকা সম্ভব একাধিক মানবধারার মানুষ। যেমন আছে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে। জাতি আর উপজাতিকে এক করে দেখা যায় না। একটি উপজাতি এসে বসবাস আরম্ভ করতে পারে একটি জাতির মধ্যে। যেমন সাঁওতালরা করছে আমাদের মধ্যে। সাঁওতালরা বাস করছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে। এদের নীলকর সাহেবরা নিয়ে আসে ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে মালদহের পূর্বাঞ্চলে নীলচাষ করার জন্য। সেখান থেকে এরা ছড়িয়েছে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায়। বিখ্যাত ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক জর্জ গ্রিয়ার্সন লিখেছেন সাঁওতালদের মালদহের পূর্বাঞ্চলে নিয়ে আসবার কথা (G. A. Grierson: Linguistic Survey of India, Vol 4, 1906. Page 30-33pp)।
সাওতালেরা নিরীহ নয় -----
Related imageসাওতালেরা নিরীহ নয় -----
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ১৮৫৫ সালে ৩০ জুন ঘটেছিল সাঁওতাল বিদ্রোহ। এতে অংশ নেয় প্রায় ৫০ হাজার সাঁওতাল। এই সাঁওতালরা যে কেবল হিন্দু সুদখোর মহাজনদেরই খুন করেছিল, তা নয়। খুন করেছিল বহু বাংলাভাষী নিরপরাধ হিন্দুকে। করেছিল তাদের বাড়িঘর লুট। বিদ্রোহ থামানোর জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনকে জারি করতে হয়েছিল সামরিক আইন। সৈন্যবাহিনীর গুলিতে মারা গিয়েছিল প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল। সেটা অনেক দিন আগের কথা।

তখন সবে পাকিস্তান হয়েছে। কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্রের নির্দেশে সাঁওতালরা করে নাচোল থানা অধিকার। তাদের লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলে একটা মুক্ত রাজ্য স্থাপন। সাঁওতালরা নাচোল থানা দখল করতে গিয়ে থানার দারোগা ও তিনজন কনস্টেবলকে মেরে ফেলে। এটা ঘটেছিল ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি। ঘটনাটিকে কোনোভাবেই একটা নিরীহ অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। ভারতের বিহারে ছোটনাগপুর ও সাঁওতাল পরগনায় সাঁওতালরা ১৯৬৭ সালে শিলিগুড়ির নকশালবাড়ির আন্দোলনের অনুকরণে ঘটায় অভ্যুত্থান। যেটা দমন করতে ভারতীয় সাধারণ পুলিশ এবং বিশেষ মিলিশিয়াকে চালাতে হয় গুলি। সাঁওতাল, পুলিশ ও মিলিশিয়া মিলে এ সময় মারা যায় প্রায় ছয় হাজার ব্যক্তি। এর মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায় না সাঁওতালদের নিরীহ সরল চরিত্রকে।


২০০০ সালের ১৫ নভেম্বর বিহার থেকে ছোটনাগপুর, সাঁওতাল পরগনা ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে পৃথক করে গঠন করা হয়েছে নতুন প্রদেশ ঝাড়খণ্ড। ভারতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সাঁওতাল বাস করে বর্তমান ঝাড়খণ্ড প্রদেশে। ঝড়খণ্ড প্রদেশে সরকারি ভাষা করা হয়েছে দেবনাগরী অক্ষরে লেখা বিশুদ্ধ হিন্দিকে। ঝারখণ্ডে সাঁওতাল, মুন্ডা, হো প্রভৃতি উপজাতি এখন হিন্দির মাধ্যমেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রহণ করতে চাচ্ছে বিদ্যা। বাংলাদেশে ঝাড়খণ্ডের তুলনায় সাঁওতালদের সংখ্যা নগণ্য।
চাকমারা ১৯৪৭ সালে ভারতের পতাকা উড়িয়েছিল
চাকমারা ১৯৪৭ সালে ভারতের পতাকা উড়িয়েছিল
Related image
বাংলাদেশে সাঁওতালদের পরে সবচেয়ে বড় উপজাতি হিসেবে ধরা হয় চাকমাদের। চাকমারা সবাই মঙ্গোলীয় মানবধারার মানুষ। তাদের দেখে এ দেশের বৃহত্তর জনসমষ্টি থেকে সহজেই পৃথক করে চিনতে পারা যায়। এ দেশে মঙ্গোলীয় মানবধারার মানুষের মধ্যে দু’টি উপধারা লক্ষ করা যায়। একটির মাথার আকৃতি হলো মাঝারি। আর অন্যটির মাথার আকৃতি গোল। মাঝারিদের বিশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা চলে গারো এবং খাসিয়াদের কথা। অন্য দিকে, গোল মাথার মঙ্গোলীয়দের বিশেষ দৃষ্টান্ত হলো চাকমা ও মারমারা। মঙ্গোলীয় মানবধারার গণ্ডের হাড় হয় উঁচু। এ জন্য তাদের মুখমণ্ডল দেখে মনে হয় সমতল। এ ছাড়া তাদের চোখের ওপরের পাতায় থাকে বিশেষ ধরনের ভাঁজ।

যে কারণে তাদের চোখ দেখে মনে হয় ছোট এবং বাঁকা। মঙ্গোলীয় মানবধারার মানুষের পুরুষের মুখে গোঁফ-দাড়ি হয় না বললেই চলে। যদিও মারমা ও চাকমাদের চেহারার মধ্যে যথেষ্ট সৌসাদৃশ্য আছে এবং যদিও তারা উভয়ই অতীতে এসেছে আরাকান থেকে। তবু তাদের মধ্যে সদ্ভাব নেই। মারমাদের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। যা তারা লিখে বর্মি অক্ষরে। কিন্তু চাকমাদের এখন আর কোনো নিজস্ব ভাষা নেই। বাংলাই হয়ে উঠেছে তাদের মাতৃভাষা। চাকমারা হয়ে উঠেছে শতকরা ষাট ভাগ শিক্ষিত। তাদের আর বলা চলে না একটা উপজাতি। মনোভাবের দিক থেকে তারা হয়ে উঠেছে হিন্দুভাবাপন্ন। যদিও তারা নিজেদের দাবি করে বৌদ্ধ। কিন্তু তারা একই সাথে আবার লক্ষ্মীপূজাও করে। তাদের তুলনায় মারমারা অনেক খাঁটি বৌদ্ধ। পার্বত্য চট্টগ্রাম একসময় ছিল একটি জনবিরল অঞ্চল। ১৯৪৭ সালে যখন পার্বত্য চট্টগ্রামকে র‌্যাডক্লিফ প্রদান করেন তদানীন্তন পাকিস্তানকে, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল শতকরা ২ ভাগের কাছাকাছি।
চাকমা নেতা স্নেহ কুমার ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাঙ্গামাটিতে উত্তোলন করে ভারতের অশোকচক্র সংবলিত ত্রিরংরঞ্জিত পতাকা। যেটাকে একুশে আগস্ট অস্ত্র হাতে বালুচ রেজিমেন্টের লোকদের গিয়ে টেনে নামাতে হয়েছিল। চাকমারা ভারতের পতাকা নামাতে চেয়েছিল না। মার্কিন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান মিশনারি রিচার্ড টিম কারিতাসের দ্বিমাসিক মুখপত্র বিনিময়-এর ১৩ বর্ষ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ সংখ্যায় লিখেছেন, র‌্যাডক্লিফ জিন্নাহ সাহেবকে সন্তুষ্ট করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে দিয়ে দেয় সাবেক পাকিস্তানকে। যেটা ছিল একটা চরম অবিচার। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম এমনিতেই আসেনি সাবেক পাকিস্তানে। জিন্নাহ এর জন্য ছেড়ে দিয়েছিল মুসলিম অধ্যুষিত পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলাকে।সে এটা করেছিল তদানীন্তন পূর্ববাংলার একমাত্র সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের কথা বিশেষভাবে বিবেচনা করে। এখন গুরুদাসপুরের মধ্যে যে ভারত অনেক সহজে কাশ্মিরে সৈন্য পাঠাতে পারছে। গুরুদাসপুর পেয়ে ভারত হয়েছে যথেষ্ট লাভবান। ফাদার টিম চেয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশ থেকে পৃথক হয়ে যাক। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের লুসাই ও বম উপজাতি ইতোমধ্যেই খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে। আরো অনেক উপজাতি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের লাগোয়া মিজরাম রাজ্যে মিজুরা সবাই গ্রহণ করেছে খ্রিষ্টধর্ম। উপজাতি নিয়ে রাজনীতি করতে দেখা যাচ্ছে বামপন্থীদের। আর দেখা যাচ্ছে বিদেশী খ্রিষ্টান মিশনারিদের।
রোহিংগা নামের উদ্ভব
Image result for বন জঙ্গলরোহিংগা নামের উদ্ভব

আরাকানের (রাখাইন প্রে) ইতিহাস থেকে জানা যায়, আরাকানের এক রাজা মেং সোআ মংউন ১৪৩০ সালে ব্রহ্মের রাজার সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পালিয়ে আসে গৌড়ের সুলতান জালাল আল দ্বীন মুহাম্মদ শাহর কাছে। তিনি আরাকানের রাজাকে যথেষ্ট সৈন্য দেন তার রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য। আরাকানের রাজা যুদ্ধে জিতে তার রাজ্য ফিরে পায়। নতুন রাজধানী হয়, যার নাম রোহং। আরাকানের রাজার সাথে গৌড় থেকে যে সেনাবাহিনী যায় ও থাকে রোহং-এ, তাদের বংশধরকে বলে রোহিঙ্গা। আরাকানের রোহং শহরের নাম থেকে উদ্ভব হয় রোসাঙ্গ নামের। বাংলা সাহিত্যে আরাকানকে উল্লেখ করা হয়েছে রোসাঙ্গ হিসেবে। আরাকানের রাজারা ধর্মে ছিল বৌদ্ধ। তাদের ভাষা ছিল আরাকানে প্রচলিত প্রাচীন বর্মি ভাষা। কিন্তু যেহেতু তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল গৌড়ের সাথে, তাই তারা বাংলাভাষা শিখত ও জানত। আরাকানের রাজসভায় তাই সপ্তদশ শতাব্দীতে হতে পেরেছে বাংলা ভাষার বিশেষ চর্চা। উদ্ভব হতে পেরেছে দৌলত কাজী, আলাওলের মতো কবির সপ্তদশ শতাব্দীতে। এখন রোহিঙ্গাদের আরাকান থেকে নিষ্ঠুরভাবে তাড়ানো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে চাকমা রাজনীতি নিতে পারে একটা ভিন্ন রূপ। সন্তু লারমাদের পক্ষে হাত মেলানো অসম্ভব নয় মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেখা উচিত হবে বাংলাদেশের উপজাতি রাজনীতিকে।
কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?
Related imageকি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

====================================
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা কমিয়ে আইন সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার।ঈসায়ী ১/০৮/২০১৬ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। ভেটিং শেষে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন নিয়ে আইনটি পাসের জন্য সংসদে যাবে জানিয়ে সচিব বলেন, “সংসদ যেহেতু দুই মাস পরে বসবে, তাই ইমারজেন্সি বিবেচনায় এটাকে অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্ত হয়েছে।”
১৯৯৭ সালের ২ রা ডিসেম্বর যে শান্তি চুক্তি হয় তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। কারন এ চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ বাংলাদেশের ৯৮ ভাগ মুসলমানের আশা আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়নি।
আগে কমিশন চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হত। আইন সংশোধন হলে চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সিদ্ধান্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে। চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্তে আর কোনো বিষয় চূড়ান্ত হবে না।তিন পার্বত্য জেলার বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী বাঙালীদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বের করার জন্য এটি একটি বড় ধরণের ষড়যন্ত্র। এই আইনের মধ্যদিয়ে পার্বত্য এলাকা বাঙালী মুক্ত করার জন্তু লারমার যে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা তা সহজ হয়ে গেলো।
এ আইন একটি কালো আইন, এই আইনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আপীল করা যাবে না। ঐ কমিশনের সদস্যদের মধ্যে কোন বাঙ্গালী প্রতিনিধি নাই । কমিশনের চেয়ারম্যান পদে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও সদস্য সচিব নিয়োগে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীল মধ্যে থেকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং বাকী সদস্যরা নৃগোষ্ঠীর সদস্য হতে নিয়োগ দেওয়া হবে ।এক্ষেত্রে পার্বত্য চট্রগ্রামের বাঙ্গালী কোন প্রতিনিধি না থাকাতে পার্বত্য চট্রগ্রামের ৫২% বাঙ্গালী জনগনের জন্য ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে না । বাঙ্গালীরা তাদের ভূমির অধিকার হারাবে ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬’ সংবিধানবিরোধী এবং সাংঘর্ষিক
১. তৃতীয় ভাগ , মৌলিক অধিকার , আইনের দৃষ্টিতে সমতায় বলা আছে “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী”। http://goo.gl/oo9SpH
২. তৃতীয় ভাগ , মৌলিক অধিকার , ধর্ম, প্রভৃতি কারণে বৈষম্য বলা আছে”কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না”। http://goo.gl/AhDMwL
দেখা যাচ্ছে সংবিধানের ধারা অনুযায়ী আইন সবার জন্য সমান থাকবে এবং কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না”।কিন্তু এ কালো আইনে সংবিধানের এসকল ধারাকে সম্পুর্ন অগ্রাহ্য করা হয়েছে যা অগ্রহণীয়।


তিন পার্বত্য জেলার জমি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত হতে পারে না। নাগরিক অধিকার সবার ক্ষেত্রে সমান।রাষ্ট্রসীমার মধ্যকার সমস্ত ভূমির মালিকানা রাষ্ট্রের। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় আইনেই বৈধ কিংবা অবৈধতা নির্ধারিত হয়।
"পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন" আদিবাসী বাঙ্গালী উচ্ছেদের হাতিয়ার
"পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন" আদিবাসী বাঙ্গালী উচ্ছেদের হাতিয়ার
Related image ***************************************************
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সংসদ অধিবেশন না থাকায় জরুরী বিবেচনায় মঙ্গলবার (৯ আগস্ট) আইনটির অধ্যাদেশ জারি করা হয়। গত ১ আগস্ট ‘পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬’ এর খসড়া অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। ৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতি এই আইনে সই করে এবং ৯ তারিখ গেজেট প্রকাশ করা হয়।
‘আগের আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানসহ অপর ২ সদস্য নিয়ে কোরাম হবে, নতুন আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যাসহ চারজন হলে কোরাম হবে।’
যার ফলে ভূমি কমিশনের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের হাতে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদ করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়ে যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা। আর কমিশনকে ব্যবহার করে সন্তু লারমা কোনো বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে তার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করলেও কোনো আইন-আদালত কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিকার করার ক্ষমতা থাকবে না।
ভূমি কমিশন আইনের ১৬ নং অনুচ্ছেদেই বলা আছে যে, ‘ধারা ৬(১)-এ বর্ণিত “কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী বলিয়া গণ্য হইবে, তবে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা বা যথার্থতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’
প্রথমত, এমন কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে এগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভূমির উপর পার্বত্য বাঙালিদের অধিকারকে খর্ব করে উপজাতীয়দের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।
দ্বিতীয়ত, অবশিষ্ট সুপারিশগুলো করা হয়েছে, যাতে ভূমি কমিশনের ওপর থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে আঞ্চলিক পরিষদ তথা জেএসএসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। বাংলাদেশ সরকারের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে যেসব সংশোধনী গৃহীত হয়েছে তাতে জেএসএসের উভয়বিধ সিদ্ধান্তই হাসিল হয়েছে।
প্রশ জাগে-
১. এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সভায় প্রথম দফায় ১৩টি এবং পরে ৬টি সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পরেও সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নেই তা কার্যকর করা যায়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে যে, আগে যেসব সংশোধনী দেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কার্যকর করা যায়নি, কোন বিবেচনায় এবার সেসব সংশোধনী সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে মান উত্তীর্ণ হয়ে গেল?
২. সংসদ বসতে দুই মাসের বিলম্ব দেখিয়ে তড়িগড়ি করে এটিকে অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্তটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। ধারণা করা যায়, কোনো একটি পক্ষ দ্রুততার সাথে সংসদকে পাশ কাটিয়ে সব কিছু করে ফেলার ব্যাপারে অতিউৎসাহী মনোভাব দেখাচ্ছে। এই দেশদ্রোহী কারা ?
৩. প্রধানমন্ত্রী সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেও যার বা যাদের পরামর্শে তিনি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ সংশোধন করছেন তারা এদেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কি অনুগত?
এ প্রস্তাবে কমিশনের চেয়ারম্যানের ক্ষমতাকে খর্ব করে উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের স্বেচ্ছাচারিতার নিকট ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কারণ চেয়ারম্যানসহ পাঁচজনকে নিয়ে কমিশন। ১. সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসর প্রাপ্ত বিচারপতি (চেয়ারম্যান), যিনি বর্তমানে একজন বাঙালি হলেও ভবিষ্যতে উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সদস্য হওয়া সম্ভব। ২. আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধি (অবশ্যই উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হবেন)। ৩. সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান (অবশ্যই উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হবেন)। ৪. সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ (অবশ্যই উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হবেন)। এবং ৫. চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (যিনি উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হওয়া খুব সম্ভব)। এই যখন কমিশনের অবস্থা তখন অধিকাংশের মতামত কোন দিকে যাবে- এটা কি সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভেবে দেখেছেন?
ভূমিকমিশনের অধিকাংশ সদস্য উপজাতীয়, অন্যদিকে পার্বত্য বাঙালিদের পক্ষ থেকে কোনো সদস্য সেখানে নেই। তার উপর কমিশনের সকল পর্যায়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা, কর্মচারীও যদি উপজাতীয় হয় তাহলে সেই কমিশন থেকে পার্বত্য বাঙালিরা সুবিচার আশা করতে পারে-এটা কি ভাবা যায়?
বর্তমানে এমনকি পরিবেশ তৈরি হলো, তার ব্যাখ্যা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা দরকার। কেননা রাষ্ট্রীয় সম্পদের মালিক সরকার নয়, মূল মালিক এই দেশের ২০ কোটি জনগণ। গনতন্ত্রের সংজ্ঞামতে সরকার জনগনের গোলাম, মালিক হল জনগণ। মালিককে না জানিয়ে গোলাম কোন কিছু করতে পারেনা। যে করে সে গাদ্দার। অতএব, তাদের সম্পদ অন্যকারো হাতে ছেড়ে দেয়ার ব্যাখ্যা জানার অধিকার দেশের জনগণের আছে।
স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বশীলতার কারণে বাঙালি ছেলেদের প্রতি পাহাড়ি মেয়েদের ঝোঁক
Image result for বন জঙ্গলস্ত্রীর প্রতি দায়িত্বশীলতার কারণে বাঙালি ছেলেদের প্রতি পাহাড়ি মেয়েদের ঝোঁক

কিছুটা নেতিবাচক চোখে দেখলেও সমকালীন বিশ্ব প্রেমের সম্পর্কের ব্যাপারে অতটা খড়গহস্ত হয়নি, ভালোবাসার কারণে যতটা নিপীড়নের শিকার পাহাড়ি মেয়েরা।
জানা গেছে, স্ত্রীর প্রতি শতভাগ দায়িত্বশীলতার কারণে বাঙালি ছেলেদের প্রতি পাহাড়ি মেয়েদের ঝোঁকের কথা পার্বত্য এলাকায় এখন একরকম পরিচিত বিষয়। সুযোগ পেলেই বাঙালি ছেলেদের প্রেমে হাবুডুবু খায় পাহাড়ি মেয়েরা। নিজের সমাজ, সংস্কৃতি এবং পৈতৃক ধর্ম বিসর্জন দিয়ে প্রিয়তমের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয় তারা। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় কথিত আঞ্চলিক সংগঠন এবং সন্ত্রাসীরা।

এসব পাহাড়ি নারীদের চাওয়া এবং পাওয়ার মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে ভিলেনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় পার্বত্য অঞ্চলের সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর নেতারা। নিজেদের জাত রক্ষার নামে পাহাড়ি এবং বাঙালি উভয় পরিবারের ওপর চালায় অবর্ণনীয় নির্যাতন, কখনো কখনো বিবাহিত তরুণীকে অপহরণ করে নিয়ে দল বেঁধে ধর্ষণ করে এবং মিথ্যা জবানবন্দি গ্রহণ করে। এমনকি হত্যার হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করে। এসব বাধা উপেক্ষা করে পাহাড়ি তরুণীরা বাঙালি ছেলেদের বিয়ে করেই চলেছে। শত বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে দিন দিন পাহাড়ি নারী এবং বাঙালি পুরুষের মাঝে বিয়ের প্রবণতা বাড়ছেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাহাড়ি নারীরা রাত-দিন পরিশ্রম করে সংসারের ঘানি টানে। আর পুরুষরা ঘুরে বেড়ায়, মাতাল হয়ে পড়ে থাকে, ঘরে বসে হুক্কা টানে। ঘরে-বাইরে সব কাজ করে সংসার সামলায় উপজাতি নারীরা। পুরুষরা শুধুই আরাম আয়েশ করে। কেউবা সতিনের সঙ্গে নিজের সোনার সংসার ভাগ করতে বাধ্য হয়। তারপরও স্বামীর নানারকম নির্যাতনও সহ্য করতে হয় নারীদের।
অন্যদিকে বাঙালি ছেলেদের সঙ্গে বিয়ের পর সংসারের সব কাজ করে পুরুষরা, নারীরা শুধু সংসার গোছানোর সহজ কাজগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারে। সেই সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতিতে পরিচ্ছন্ন জীবনে উন্নত ভালোবাসা পেয়ে সুখী সংসার করে তারা। এসব খবর উপজাতি নারীদের কাছে ছড়িয়ে পড়ায় পাহাড়ের উপজাতি সব তরুণীর মনে মনে পছন্দের পুরুষ হয়ে উঠে বাঙালি তরুণরা। তাই ভালোবেসে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয় তারা।
কিন্তু পাহাড়ি কথিত আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর ছেলেদের মেয়েরা পছন্দ না করার কারণে সন্ত্রাসীরা ফুঁসে ওঠে। ভালোবাসা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়ে নারীদের ধর্ষণের জন্য ভিলেনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তারা। পুলিশ প্রশাসন কঠোর হয়েও তাদের দমন করতে পারছে না।
সূত্র জানায়, এর আগে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে ভালোবেসে এক বাঙালি ছেলেকে বিয়ের অপরাধে খাগড়াছড়ির গুইমারার এক মারমা তরুণী ও তার পরিবারকে নির্যাতন ভোগ করার পরও মোটা অংকের চাঁদা গুণতে হয়েছে। তাকে একটি কক্ষে বেঁধে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়।
২০১৫ সালের শুরুর দিকে ভালোবেসে চাকমা মেয়েকে বিয়ে করাই কাল হয় একটি প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকের স্টাফ ফটোগ্রাফারের ।
অপরদিকে ভালোবাসার মানুষকে ভুলে যেতে চাকমা নারীর (সাংবাদিকের স্ত্রীর) ওপর চলে নির্মম পাশবিকতা, যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হারা মানায়। ওই নারীকে তোলা হয় নিলামে, যা প্রচার ও প্রকাশ করা হয়েছে গণমাধ্যমে। কিন্তু তাকে রক্ষা করা যায়নি।
সবচেয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা ঘটনা ঘটে গত বছরের এপ্রিলে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালায়। উপজেলার এক ত্রিপুরা মেয়ে ভালোবেসে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার আহমদ কবীরের ছেলে আবদুল হান্নানের (২৪) সঙ্গে। ভালোবাসার টানে একদিন প্রেমিক হান্নানের হাত ধরে শহরের যাওয়ার সময় বাস থেকে নামিয়ে ত্রিপুরা মেয়ে ও বাঙালি হান্নানকে অপহরণ করে পিসিপির কর্মীরা।
অপহরণের পর ঘরে আটকে রেখে মেয়েটিকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে পিসিপির স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী। ধর্ষণের পর গভীর রাত পর্যন্ত মেয়েটিকে নিয়ে উল্লাস করে সন্ত্রাসীরা। পুরো গণধর্ষণের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করা হয়। এ ঘটনায় আটক ইউপিডিএফ সমর্থিত পিসিপির নেতা সজীব ত্রিপুরা (২২) প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানায়।
এভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি মুসলমান ছেলেদের বিয়ে করার কারণে মাটিরাঙা, রাঙামাটির কুতুবছড়ি ও রামগড়ের কয়েকটি ঘটনাসহ আরও অসংখ্য পাহাড়ি মেয়েকে অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন নারকীয় অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়েছে।
সম্প্রতি পাহাড়ি তরুণীদের নিজ জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের হাতে এরূপ নির্বিচারে গণধর্ষণের শিকার হওয়া নিয়ে গবেষণাধর্মী উপন্যাস বের করেন লেখিকা রোকেয়া লি। চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘ডুমুরের ফুল’ নামে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বইটি বের করার ফলে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়া হয় তাকে।
পাহাড়ি ছেলেরা ঠিকমতো লেখাপড়া করে না, কাজকর্ম করতে চায় না, তারা পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের সংগঠনে জড়িয়ে চাঁদা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে- তাই উপজাতি মেয়েরা পাহাড়ি ছেলেদের পছন্দ করে না। তাদের সঙ্গে বিয়েতে এ কারণেই আগ্রহও থাকে না।
কী আছে সংশোধিত ভূমি নিষ্পত্তি কমিশন আইনে
Related imageকী আছে সংশোধিত ভূমি নিষ্পত্তি কমিশন আইনে
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধনী) ২০১৬ অনুসারে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
কমিশনের পাঁচ সদস্যের মধ্যে আবশ্যিকভাবে উপজাতীয় তিনজন। তারা হল, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি ও সার্কেল চিফ বা তার প্রতিনিধি।
অন্যদিকে, বাকি দুই জন হচ্ছেন কমিশনের চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসারপ্রাপ্ত বিচারপতি(১) ও সদস্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার বা একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার,(১) যারা বাঙালি বা উপজাতি দুই হতে পারেন। ফলে কমিশনে আবশ্যিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ৫২ ভাগ বাঙালি জনগোষ্ঠীর কোন প্রতিনিধি রাখা হয়নি।
এছাড়া ভূমি কমিশন আইনের ধারা ৭(৫) সংশোধন করে ‘চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে’ এর স্থলে ‘চেয়ারম্যানসহ উপস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে’ বলে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাঙালিদের প্রতিনিধি না থাকার ফলে সংশোধনী আইনে উপজাতি নেতাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। যে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাঙালি স্বার্থ তথা জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হলেও তার প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
এ আইনে পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে। প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতি বলতে মূলত হেডম্যান, কারবারী ও সার্কেল চিফদের ব্যক্তি মতামত ও সিদ্ধান্তকে বোঝায়। যা একটি সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা।
এই পদ্ধতি থেকে নিরপেক্ষ মতামত প্রত্যাশা অসম্ভব। এই পদ্ধতি অনুযায়ী প্রশাসনিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি রিজার্ভ ফরেস্টসহ সরকারি বিভিন্ন স্থাপনার জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। ফলে সংশোধিত আইনের এ ধারাটি অপব্যবহার করে উপজাতিরা বাঙালিদের নিজেদের বসতভিটা ও জায়গা জমি হতে বঞ্চিত ও উচ্ছেদের পাশাপাশি ওইসব সরকারি স্থাপনাও উচ্ছেদ করতে পারবে। ফলে অখণ্ডতা হারানোর হুমকির মুখে পড়বে বাংলাদেশ।
সরকার ইতোপূর্বে যাদের রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বন্দোবস্ত দিয়েছে, সংশোধনী আইনে সেসব বন্দোবস্তকে অবৈধ বলে স্বীকার করে নিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলতে চেষ্টা করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল প্রকার ভূমির একচ্ছত্র মালিক হচ্ছে পাহাড়ি জনগণ। অপরপক্ষে বাংলাদেশ সরকার এবং সচেতন বাংলাদেশিরা মনে করেন, ভূমির মালিক পাহাড়ি জনগণ, বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশের আইন মাতাবেক মালিকানাপ্রাপ্ত অন্য সব নাগরিক।